১৪ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জয়িতা পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রত্যয়ী ডালিয়া

  • আল নাহিয়ান

অজানা এক আবর্তনে কাটে আমাদের সাদামাটা জীবন। নানা প্রতিকূলতার মাঝেও মনের ভেতর আমরা সুন্দর স্বপ্ন লালন করি। জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে সেগুলোর নিবিড় পরিচর্যা করি। কাক্সিক্ষত স্বপ্ন ধরা দিলে স্বস্তি অনুভব করি। এর অন্যথায় পৃথিবীর অবাঞ্ছিত বস্তুগুলোর সঙ্গে নিজের ঘনিষ্ঠ মিল খুঁজে বেড়াই।

জীবনের চরম বাস্তবতার কাছে আমরা অসহায়। কিন্তু এই রূঢ় সত্য আবার অনেক মানুষকে আত্মপ্রত্যয়ী করে তোলে। জীবনযুদ্ধে হার না মানা তেমনি এক প্রত্যয়ী নারীর প্রতিচ্ছবি মার্জিয়া শাইরিন ডালিয়া। জন্ম নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা থানায়। বাবা মুসলিম উদ্দিন খান। মা সাহেরা খানম। তারা তিন ভাই তিন বোন। শাইরিন মেজো। বড় বোন স্বনামধন্য একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা। বড় ভাই কৃষিকাজ করেন। মেজো ভাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা। ছোট দুই ভাই-বোন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যায়ে অধ্যয়নরত।

ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি শাইরিনের প্রবল ঝোঁক ছিল। তার এই আগ্রহ মা-বাবাকে মুগ্ধ করে। তাই লেখাপড়ায় তাদের কাছ থেকে পূর্ণ সমর্থন ও অনুপ্রেরণা পান। কিন্তু পড়াশোনার সাধ যতটা ছিল সাধ্যি ততটা তার পরিবারের ছিল না। পরিবারের আয়ের উৎস বলতে স্বল্প কৃষিজমি থেকে প্রাপ্ত সামান্য কিছু। তা দিয়ে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচই পুরোপুরি মিটত না। সন্তানের পড়াশোনার খরচ যেন পরিবারের কাছে গরিবের হাতি পোষার মতো। উপরন্তু আমাদের সমাজে মেয়েদের বেশিদূর পড়াশোনা করানোর ক্ষেত্রে রক্ষণশীল মনোভাব যে একেবারেই ছিল না বা নেই তা বলা যায় না। কাজেই দরিদ্রতাকে মোকাবেলা করে, পারিপার্শ্বিক রক্ষণশীল মূল্যবোধকে পাশ কাটিয়ে শিক্ষার মতো অতিপ্রয়োজনীয় অঙ্গনটিতে প্রবেশ করতে তাকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল। নওয়াগাঁও সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার প্রথম হাতেখড়ি। প্রাথমিকেই ভাল রেজাল্ট করে শিক্ষকদের নজর কাড়েন তিনি। প্রাথমিক শেষ করে মাধ্যমিকে ভর্তি হন বারহাট্টা পাইলট গার্লস হাই স্কুলে। সেখানেও তার ভাল ফলাফলের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে। অষ্টম শ্রেণীতে তিনি টেলেন্টফুলে বৃত্তি পান। দশম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত অবস্থায় বাবাকে হারান। এর মাঝেও মাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৯৯ সালে স্টারমার্ক পেয়ে এসএসসি সম্পন্ন করেন এবং ২০০১ সালে প্রথম বিভাগে এইচএসসিতে উত্তীর্ণ হন। ২০০৬ সালে ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজ থেকে ব্যবস্থাপনা বিভাগে স্নাতক এবং ২০০৭ সালে একই বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি।

স্নাতক ভর্তি হওয়ার পর আর্থিক সঙ্কট আরও চরমে ওঠে। তাই স্নাতক প্রথম বর্ষে থাকাকালে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে চাকরির আবেদন করেন। যথারীতি উপযুক্ত মেধার পরিচয় দিয়ে তিনি নিয়োগপ্রাপ্ত হন। যদিও তার স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার। কিন্তু এখন শিক্ষকতার পেশাই তার জীবনের আদর্শ। কেননা শিক্ষকরা সমাজের আলোর পথপ্রদর্শক, প্রগতিশীলতার মূর্ত প্রতীক। চাকরি পাওয়ার পর থেকেই তিনি নিজের পড়াশোনার খরচ চালানোর পাশাপাশি অন্য ভাই বোনদের পড়াশোনার খরচে সহায়তা করেছেন। এখনও করছেন। এছাড়াও পারিবারিক বিভিন্ন বিষয়ে তো প্রতিনিয়তই সহায়তা করেন। একদিন জীবিকার উদ্দেশ্যে এ পেশায় নিয়োজিত হয়েছিলেন। কিন্তু আজ তিনি এখানে শুধুমাত্র জীবিকা নয় জীবনের সার্থকতা খুঁজে পান।

শাইরিন ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ এবং রোকেয়া দিবস ২০১৩ উদযাপন উপলক্ষে ’জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ ’ কার্যক্রমের আওতায় শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে সফল নারী হিসেবে মনোনিত হন। কার্যক্রমটির উদ্যোক্তা ছিল মহিলা অধিদফতর এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়। প্রথমে তিনি উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে বিভাগীয় পর্যায়েও স্বীকৃতি পান।

আজকের এই অবস্থানে আসার পথে যাদের সহযোগিতা পেয়েছেন তাদের প্রতি তিনি চিরকৃতজ্ঞ। বিশেষ করে তার কোন এক আত্মীয়ের পরিবারের প্রতি যারা তাকে নিজের সন্তানের মতোই ¯েœহ করেন। যাদের কাছ থেকে চরম সঙ্কটের মুহূর্তগুলোতে অকৃত্রিম আন্তরিক সহায়তা ও মূল্যবান পরামর্শ পেয়েছেন। স্কুল কলেজের শিক্ষকদের অবদানের কথা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। তাদের মধ্যেও কিছু কিছু শিক্ষকের প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধাবোধ কাজ করে।

পেশাগত কারনেই কোমলমতি ছেলেমেয়েদের সান্নিধ্য পান তিনি। পাশে থেকে চেষ্টা করেন তাদের স্বপ্নগুলো বোঝার। সাহস করেন তাদের নিয়ে স্বপ্ন দেখার। পর্যাপ্ত সহায়তা ও যথাযথ দিকনির্দেশনা পেলে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিটি শিশু একেকটি উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে উঠবে বলে তার বিশ্বাস।

শাইরিন নিজেকে জানার চেষ্টা করেন। পাশাপাশি অন্যের রুচি ও মূল্যবোধকেও গুরুত্ব দেন। কোন শিশুই যেন শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত না হয় সমাজের কাছে এই তার প্রত্যাশা। তবেই এরা একদিন প্রগতিশীল ও দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে বাংলাদেশকে আরও উন্নত করে গড়ে তুলবে।