১৭ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গল্প ॥ বুকে রাখি পতাকা

  • আফরোজা পারভীন

এ বাড়িতে খাওয়া-দাওয়ার অনুষ্ঠান হচ্ছে। বড়লোকের বাড়িতে এ ধরনের অনুষ্ঠানকে বলে পার্টি। ক’দিন ধরে এই পার্টির খবরই চলছে। বয় বাবুর্চি সবাই তটস্থ। এদের মধ্যে সাহেব-মেমসাহেবের সবচেয়ে পিয়ারের যে লোক তার নাম হারুন। হারুন সুযোগ পেলেই সাহেব মেমসাহেবের কথাগুলো নিজের মুখে বসিয়ে বলে। সেদিনও বলছিল, সামনে বাড়িতে বিশাল পার্টি। অনেক লোক আসবে, বিশাল বিশাল লোক, নামী-দামী, মন্ত্রী-মিনিস্টার কেউ বাদ যাবে না। আর বাদ যাবেই বা কেন। আমাদের সাহেব কত বড় শিল্পপতি।

রুবিনা তিন বছর ধরে এ বাড়িতে কাজ করে। ও ঘর মুছতে মুছতে কান পাতে। হারুন বলে চলে,

: এর মধ্যে বেশ ক’জন মুক্তিযোদ্ধাও আছে। আহারে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান!

ও একটু মাথা নোয়ায়। সঙ্গে সঙ্গে অন্যরাও।

: কিন্তু শুনেছ হারুন ভাই, আজকাল নাকি অনেক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হয়েছে। টাকা দিয়ে সার্টিফিকেট কিনেছে। বড় বড় অফিসারদের সার্টিফিকেট বাতিল হয়েছে। পরাণ বলে।

: হ্যাঁ হ্যাঁ আমিও শুনেছি। মুক্তিযোদ্ধাদের নাকি এখন অনেক সুযোগ-সুবিধা। ভাতাও বাড়িছে। চাকরির বয়সও। তাই নাকি এসব আকাম-কুকাম হচ্ছে । মালি কুদ্দুস বলে।

ওদের এসব কথায় হারুন খানিকটা চুপসে যায়। তারপর বলে,

: অতশত তো জানিনে। তবে মুিক্তযোদ্ধাদের জন্য এদেশ পেয়েছি তা তো ঠিক? তা তো তোমরা মান?

: তা মানি, তা মানি। তবে অনেক সত্যিকার মুক্তিযোদ্ধা খেতে পায় না এটা ঠিক না।

: সেটা অন্য কথা। এবার তোমরা পার্টির কথা মন দিয়ে শোন। সব গণ্যমান্য লোক আসবে। মেমসাহেব মেনু ঠিক করে দিয়েছেন সেই অনুযায়ী রান্না হবে। মেহমানরা নাকি বাইরের খাবার খাবেন না। তাই স্পেশাল বাবুর্চি আসবে। মেমসাহেব বলেছেন সবাই যেন সেদিন খুব সতর্ক থাকে। যেন কাজ কামে কোন ভুল না হয়। সবাই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। ইউনিফর্মগুলো কেচে ধুয়ে ইস্ত্রি করে নেবে। আর মেহমানদের সামনে অহেতুক ঘোরাঘুরি করা যাবে না। যেমন নির্দেশ আসবে সেভাবেই আমরা কাজ করব। আমি তোমাদের সব বলে দেব।

বাগানের ঘাসপাতা ছেটে ডালপালা কেটে সাফসুতরো করা হলো। পুরোটা লন ভাসিয়ে দেয়া হলো সুগন্ধি গোলাপজলে। ঝকঝকে বাড়িতে আবার রং পড়ল। নতুনি ডিনার সেট কেনা হলো। আর সাহেব-মেমসাহেবের সোনাদানা কাপড়চোপড় কতটা কি কেনা হলো সেসবের হদিস ওরা পেল না। কোন বিয়েতেও এত খরচ হয় না যা একটা পার্টি উপলক্ষ্য করে হলো।

রুবিনা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে আর ভাবে, মেয়েটার পরনের শাড়ি ছিঁড়ে গেছে। গত শীতে শীতবস্ত্রের জন্য খুব কষ্ট পেয়েছে। কিনতে পারেনি। বস্তি ভাড়া, খাওয়া-দাওয়া, নাতির খরচের পর কাপড় কেনার পয়সা থাকে না। এ বাড়িতে ডাই হয়ে আছে অনেক কাপড়। মাঝে মাঝে ভাবে, মেমসাহেবকে বলবে। সাহসে কুলোয় না। থাক্ ছেঁড়া কাপড় আর শীত এখন গাসওয়া হয়ে গেছে।

দুই

বিশাল বাড়ি এদের। প্রচুর চাকর বাকর। মালি আছে দুজন। যেমন লোক তেমনই কাজ। প্রতিদিন বস্তা বস্তা কাপড় ধুতে হয়। রুবিনার কাজ কাপড় ধোয়া আর ঘর মোছা। কাপড় ধুতে ধুতে রুবিনার কোমর বেঁকে যায়। আর প্রতিদিনই মেমসাহেব বলেন,

: বুয়া কেমন কাপড় ধোও তুমি। পরিষ্কার হয় না।

রুবিনা ভয়ে ভয়ে থাকে। আজও প্রচুর কাপড় ধোয়া হয়েছে। রুবিনা ভেবেছিল আজকে একটা পার্টির দিন। আজ বুঝি কাপড় ধোয়া লাগবে না। কিন্তু আজ আরও বেশি কাপড় দিয়েছে মেমসাহেব। দিয়ে কড়া এলান জারি করেছে,

: বিকেলের মধ্যেই শুকনো কাপড় তুলে ফেলবে। যেগুলো শুকাবে না ছাদে থাকবে। তবে অবশ্যই ঠিক মতো ক্লিপ লাগাবে। বৃষ্টি বাদলের দিন। দেখ কাপড় উড়ে যেন কোনদিকে না চলে যায়।

ক’দিন ধরে রুবিনার কোমরে খুব ব্যথা। ও ব্যথা নিয়ে কাপড় ধোয়। অনেক কাপড়ের মধ্যে ও একটা জাতীয় পতাকা পায়। পতাকাটা দেখে ওর বুক শিরশির করে ওঠে। এমন দিনে মেমসাহেব পতাকা ধুতে দিয়েছেন কেন! ও পতাকাটা বুকে চেপে ধরে আনমনা হয়ে যায়।

স্বামী সালাম যুদ্ধ থেকে ফিরেছিল একটা বাঁশের মাথায় পতাকা উড়িয়ে। দূর থেকে ওকে দেখে ছুটে গিয়ে বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল রুবিনা। সালাম পতাকাটা খুলে ওর হাতে দিয়ে বলেছিল,

: খুব যতেœ রাখবি। বুক দিয়ে আগলে রাখবি। যুদ্ধ করে এ পতাকা ছিনিয়ে এনেছি। যুদ্ধে মারাও যেতে পারতাম।

সেই থেকে পতাকাটা বুক দিয়ে আগলে রেখেছে রুবিনা। সালাম চলে গেছে। কিন্তু পতাকাটা রয়ে গেছে। মাঝে মাঝে তোরঙ্গ থেকে বের করে দেখে পতাকাটা। খানিকক্ষণ বুকে চেপে রাখে আবার তুলে রাখে তোরঙ্গে। ওই পতাকাই যে রুবিনার কাছে স্বামীর গৌরবের চিহ্ন।

বালতি টানতে গিয়ে ওর কোমর বেঁকে যায়। অনেক কষ্টে একটা একটা করে বালতি ছাদে তোলে। কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে থাকে ছাদে। তারপর কাপড় মেলে দেয়। একটা একটা করে কাপড় মেলে আর ক্লিপ আটকায়। কিন্তু এত কাপড় পুরো ছাদ জোড়া তারেও ধরে না। ও পাতলা কাপড়গুলো অন্য কাপড়ের নিচে রাখে। পতাকাটা খুব যতœ করে ভারি একটা কাপড়ের নিচে রেখে ও ক্লিপ আটকায়। তারপর নিচে নেমে আসে।

সে তো সেই সকালের কথা। বিকেলে গিয়ে বেশিরভাগ কাপড় তুলে নিয়ে এসেছে রুবিনা। যেগুলো শুকায়নি সেগুলো জায়গা খালি হওয়ায় টান টান করে মেলে দিয়ে এসেছে। ভারি কাপড়ের নিচে থাকায় পতাকাটা শুকোয়নি। ওটাও মেলে ক্লিপ লাগিয়ে এসেছে রুবিনা।

বাগানে প্যান্ডেল করা হয়েছে। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট নামে একটা জিনিস আছে তারাই সব আয়োজন করেছে। সারাটা লনজুড়ে আলো, ফুল বেলুন আরও কত কি। অত সবের নাম কি রুবিনা জানে! ফুলগুলো ব্যাংকক থেকে আনা হয়েছে। ওই ফুলের পেছনেই নাকি লাখ লাখ টাকা খরচ করা হয়েছে। কি লাভ একটু পরেই তো ওগুলো শুকিয়ে যাবে! বড়লোকের ব্যাপার বোঝা ভার। অনেকদিন ধরে নাতিটা বেলুনের বায়না ধরেছে। কাজ থেকে ফেরার পথে রোজই ভাবে ওর জন্য বেলুন নিয়ে যাবে। কিন্তু বেলুনের দাম যা বেড়েছে। কিনব বললেই কেনা যায় না। আজ চারদিকে এত বেলুনের ছড়াছড়ি। রুবিনা ভেবেছে অনুষ্ঠান শেষ হলে হারুন ভাইকে বলে দু’চারটে বেলুন নাতিটার জন্য নিয়ে যাবে। আর মেয়েটার জন্য কিছু ফুল। মেয়েটা ফুল খুব ভালবাসে। কিন্তু জীবনে ফুল তো দূরের কথা, কিছুই পেল না ও। মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে জেনে জামাই রফিক ওকে বিয়ে করেছিল খুব আগ্রহ করে। ভেবেছিল আর কিছু না হোক মাসে মাসে শ্বশুর ভাতা তো পাবেন। কিন্তু বিয়ের পর যখন জানতে পারল শ্বশুর ভাতা পায় না, মুক্তিযুদ্ধ করলেও তার মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট নেই, গ্রামের মানুষ ওর বীরত্বের কথা জানে বলেই ওকে ‘মুক্তিযোদ্ধা সালাম’ বলে তখন থেকেই মন খারাপ হতে শুরু করল রফিকের। তারপর শুরু হলো নির্যাতন। আর একদিন এক বস্ত্রে ছেলেসহ মেয়েকে পাঠিয়ে দিল বাপ-মায়ের কাছে। সেই শোক কাটাতে না পেরে অসুস্থ বাপটা বিছানায় পড়ল। বিনা ওষুধ বিনা পথ্যে মারা গেল দ্রুত। সান্ত¦না এটাই যে, বেশিদিন তাকে ভুগতে হয়নি! রুবিনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

ড্রইংরুমও খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। বিশাল ড্রইংরুম। একপাশে বঙ্গবন্ধুর আবক্ষ মূর্তি। আর একপাশে জননেত্রীর ছবি। কেন? হারুন একদিন বলেছিল,

: সাহেব এমপি ইলেকশন করার চিন্তা করছেন। যে ভাল মানুষ, বিপুল ভোটে জিতবেন। তাই ঘরে বঙ্গবন্ধু আর নেত্রীর ছবি। ভাবছি স্যারকে বলব একটা পতাকা রাখতে।

: পতাকা কেন?

: আরে ওই পতাকাই যে আমাদের সম্পদ। টেলিভিশনে দেখোনি মন্ত্রীদের বাড়ির সামনে জাতীয় পতাকা থাকে।

: কিন্তু সাহেব তো মন্ত্রী না, দলের কোন নেতাও না।

: না তো কি, হবেন। প্রক্সি, বুঝেছ প্রক্সি

একে একে মেহমানরা আসছেন। এক একজনকে দেখে চমকে উঠছে রুবিনা। এদের প্রায় সবাইকে সে প্রতিদিন টেলিভিশনে বক্তৃতা করতে দেখে। এসব মানুষ এ বাড়িতে! সাহেব তো সত্যিই বড় মানুষ। লোকগুলোর বেশভূষা দামী। কেউ কেউ আবার লম্বা পাঞ্জাবি পরে এসেছেন, দু’একজন খদ্দরও পরেছেন। মহিলাদের গা ভর্তি গয়না। বেশির ভাগের শরীরেই মেদ থলথল করছে। অনেকে আবার খুবই রূপসী। সব বড়লোকের বউই কি এমন রূপসী হয়!

হারুন খুব ব্যস্ত। সমানে এদিক ওদিক পাঁক খাচ্ছে। রুবিনার পাশে এসে ব্যস্তভাবে বলে,

: এরা বড় সম্মানিত মেহমান। সমাজের উঁচুতলার লোক। কেউ কেউ মুক্তিযুদ্ধ করেছেন অস্ত্রহাতে, কেউ কণ্ঠযোদ্ধা, কেউ কলমযোদ্ধা। আবার অনেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মুক্তিযুদ্ধের জন্য কাজ করেছেন। এরা সবাই বড় মানুষ। এরা ছাড়াও আছেন বড় বড় ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, আমলা, সিনেমার লোকজন। যাকে বলে সব ধরনের বড় মানুষ।

আস্তে আস্তে রাত বাড়ছে। কারও যেন যাওয়ার তাড়া নেই। আড্ডা দিচ্ছে, তর্কাতর্কি চলছে, কিন্তু কয়েকটা কথা বার বার কানে আসছে রুবিনার। দেশ, মুক্তিযুদ্ধ, পতাকা, স্বাধীনতা, উন্নয়ন। দেশ নিয়ে এত ভাবে এরা!

মুরগির বড় বড় রান আর খাসির বিশাল রেজালা চিবাতে চিবাতে ওরা বলছিল মুক্তিযুদ্ধের কথা। এর আগে বিকেল থেকে ভাজাভুজি কাবাবের সঙ্গে সাবাড় হয়েছে বোতল বোতল লাল নীল পানীয়। তার কোনটার নাম সফট কোনটার হট।

এ বাড়ির সব গৃহকর্মীর ইউনিফর্ম আছে। রুবিনারও আছে। সেটাই পরেছে। সবাই আশা করেছিল বাড়িতে এত এত খরচ খরচা হচ্ছে তাহলে বোধহয় ওদের জন্য নতুন কাপড় আসবে। আসেনি। সবার অনুরোধে হারুন সাহস করে সাহেবকে বলেছিল। সাহেব নাকি বলেছেন,

: আমি ভেবেছিলাম দেব কিন্তু তোমাদের মেমসাহেব বললেন এত খরচের মধ্যে আবার বাজে খরচ করে লাভ কি। দেখছ তো কত কত খরচ!

আজ কারই বাড়ি যাবার অনুমতি নেই। যতক্ষণ পার্টি চলবে সবাইকে থাকতে হবে। কে জানে বাড়িতে মেয়েটা আর নাতিটা কি করছে। রুবিনার কাজ খাবারের ট্রে ধরে ধরে দরজা অবধি পৌঁছে দেয়া। খাবার দেয়া শেষ হয়েছে অনেক আগে। এখন ওর হাতে কোন কাজ নেই। একপাশে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে একটু ঝিমুনি আসে ওর।

হঠাৎ যেন নড়ে ওঠে পুরো প্যান্ডেল। সোঁ সোঁ আওযাজ ধেয়ে আসে। প্রবল বাতাস উল্টে দিতে চায় সামিয়ানা। মনে হয় এক মুহূর্তে সব ওলোট পালোট হয়ে যাবে। বাড়ির খোলা দরজা জানালাগুলো বাড়ি খেতে থাকে। প্যান্ডেল দুলতে থাকে। মেহমানরা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ড্রইংরুমের দিকে ছুটছে। ছুটছে সবাই। ছুটছে বেলুন ফুল ঝাড়বাতি। রুবিনাও। ছুটতে ছুটতে ও দেখে একটা পতাকা উড়ে আসেছে। দৌড়রত একজনের পা সে পতাকার উপর পড়তে উদ্যত হয়। হুমড়ি খেয়ে পড়ে রুবিনা।

: স্যার স্যার পা ফেলবেন না। ওটা পতাকা। আমাদের জাতীয় সম্পদ। যুদ্ধ করে ও পতাকা আমরা ছিনিয়ে এনেছি।

লোকটি এক মুহূর্ত দাঁড়ায়। চোখ-মুখে তুমুল বিরক্তি আপৎকালীন সময়ে বাধা দেয়ায়। তারপর প্রাণবাজি রেখে ছুটতে থাকে ড্রইংরুমের দিকে। রুবিনা পতাকাটা তুলে নিয়ে বুকে চেপে ধরে।