১৫ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যন্ত্রণাদায়ক পরমানন্দের কবি

  • সালাহ উদ্দীন

স্টিফেন মালার্মেকে ফ্রান্সের প্রতীকবাদী লেখকদের শিক্ষক ও আধুনিকতাবাদের অগ্রদূত বলা হয়। তাঁর কবিতার জটিল সাঙ্কেতিক তত্ত্ব তাঁকে সাধারণ মানুষ থেকে পৃথক করে রেখেছিল। কিন্তু তিনি তাঁর তৈরি বৃত্তের মধ্যে দারুণভাবে প্রশংসিত হয়েছিলেন। মালার্মে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে প্রতীকবাদী শিল্প আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে শিল্পকলার অগ্রগামী অনেক স্কুল শিল্পের ধারা, ভবিষ্যতবাদ, শিল্প ভাস্কর্য ও সাহিত্য, পরাবাস্তববাদী চিন্তা-চেতনা ইত্যাদি তাঁর প্রতীকবাদী ধ্যান-ধারণা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে তাঁর কবিতাগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বিশ্লেষণধর্মী এবং সঙ্গীত সৃষ্টির ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণাদানকারী। তাঁর মতে, ‘প্রতিটি আত্মাই সঙ্গীতপূর্ণ যার প্রয়োজন পুনর্নবীকরণ’। লক্ষ্যণীয় বিষয় যে, মালার্মের কবিতা সঙ্গীতপূর্ণ নমুনা সৃষ্টিতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। বিশেষত সুরকার ক্লাউডি ডিবুচি ও লাপ্রেস মিডি শক্তিশালী এবং আকর্ষণীয় প্রতীতিবাচক সুরে মালার্মের কবিতাকে ভিন্নভাবে ব্যক্ত করেছেন। সুরকার মরিস রেভেন ১৯১৩ সালে মালার্মের কবিতাকে ‘কুইজ পয়েমস ডি মেলার্মে’ নামে গানে রূপ দিয়েছেন। এ ছাড়াও আরও অনেক সুরকার মালার্মের কবিতাকে গানের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।

স্টিফেন মালার্মে ১৮৪২ সালের ১৮ মার্চ ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা নুমা মালার্মে একজন সরকারী কর্মকর্তা ছিলেন। মালার্মে ছোটবেলা থেকেই পারিবারিক জীবনে আর্থিকভাবে স্বাচ্ছন্দ্যে ছিলেন না। তাঁর স্কুল জীবন ছিল খুবই সাদামাটা। ১৮৪৭ সালে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি তাঁর মাকে হারান। ১৮৫৭ সালে তাঁর ছোট বোন ও ১৮৬৩ সালে তাঁর পিতা মারা যান। জীবনের শুরুতেই তিনি এক এক করে পরিবারের সদস্যদের হারিয়েছেন। পৃথিবীর কঠিন বাস্তবতা ও নির্দয় আচরণ থেকে বের হওয়ার ব্যাকুল আকাক্সক্ষা তাঁর মধ্যে জাগ্রত ছিল।

শিক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে ১৮৬২ সালের নবেম্বর মাস থেকে ১৮৬৩ সালের নবেম্বর মাস পর্যন্ত মালার্মে লন্ডনের একটি অখ্যাত স্কুলে পড়াশোনা করেন। তারপর ফ্রান্সে ফিরে এসে লিয়ন শহর সংলগ্ন টুরননে শিক্ষকতা শুরু করেন। যদিও শিক্ষকতার ওপর তাঁর অনাগ্রহ ছিল। কিন্তু জীবিকার তাগিদে টুরননে তিন বছর, তারপর বেসানকনে এক বছর, এভিগননে চার বছর এবং ফ্রান্সের বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতা করেন। তিনি ১৮৯৩ সালে শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেণ। কিন্তু ততদিনে মালার্মে ফ্রান্সের সাহিত্য সাময়িকীগুলোতে লেখালেখি করে দেশের প্রধান লেখক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন।

মালার্মে তাঁর প্রথম জীবনে সাহিত্যকর্মের ক্ষেত্রে শার্ল বোদলেয়ার দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত ছিলেন। বোদলেয়ারকে সাহিত্যে প্রতীকবাদ ধারা সৃষ্টির অগ্রদূত বলা হয়। উনিশ শতকের শেষে মালার্মে সাহিত্যে দূরদর্শন ধারা, কবিতা এবং অন্যান্য শিল্পকর্মের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে পরবর্তী শতাব্দীর শিল্প-সাহিত্যের শ্রীবৃদ্ধির জন্য অনুকরণীয় হয়েছিলেন। তাঁর শেষে দিকের অধিকাংশ কাজগুলো ছিল মূল বিষয় উদ্ভাবন, রচনার বিষয়বস্তু ও শব্দবিন্যাস ইত্যাদি অন্বেষণ করার সঙ্গে সম্পর্কিত। এ বিষয়গুলো ১৮৯৭ সালে তাঁর সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ লেখা ‘এ রোল অব দি ডাইস উইল নেভার এবোলিশ’ কবিতায় ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। অনেকে তাঁকে ফ্রান্স কবিতার ইংরেজী অনুবাদক হিসেবে অবোধ্য ভেবে থাকেন। তাঁর লেখাগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বহুমাত্রিক। তিনি কবিতায় শব্দের অর্থের চেয়ে ধ্বনিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। এ ধরনের স্বর বিষয়ক অস্পষ্টতার কারণে অনুবাদ সৃষ্টি ও শব্দের মূল অর্থ বিঘিœত হয়ে পড়েছিল।

ফ্রান্সের প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক জোরিস কার্ল হাইন্সম্যান মেলার্মের ধমনীতে প্রবাহিত অনুভূতির উত্তাপ সম্পর্কে এক পত্রে বলেছেন, ‘এগুলো ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম এবং যার গুণগত মান ছিল সমস্ত গদ্য-পদ্যের চেয়ে অনেক বেশি। ওই সবই চমৎকার শিল্পশৈলী যা নিজেই শান্ত-শীতল ইন্দ্রজাল দুর্নিবার উন্মাদক সুর সম্মোহক ভাব, স্পন্দিত আত্মা এবং যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্ফূরিত ¯œায়ুু যা তোমাকে প্রবলভাবে স্পন্দিত করে তোলে যন্ত্রণাদায়ক পরমানন্দে।’

বরেণ্য সমালোচক ও প্রাবন্ধিক রোনাল্ড বর্থেস ‘দি ডেথ অব দি অথার’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘মালার্মে সাহিত্য সৃষ্টির চেয়ে বরং একজন লেখকের স্বতন্ত্র মনোভাব উৎপাদন, স্থাপত্য চিত্রের বিনির্মাণ অনুসরণ করে ভাষাতত্ত্ব সংক্রান্ত পথ এবং উৎকৃষ্ট উদাহরণ সৃষ্টি, পদ বিন্যাসের দিকে নজর দেয়া, চিত্রি, শব্দ, শব্দার্থ বিদ্যা, ব্যাকরণ,এমনকি ব্যক্তিগত চিঠি এবং রচনার বিষবস্তু ইত্যাদি নির্গত হওয়ার উপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন”। জেকুইস ডেরিডা, জুলিয়া ক্রিস্টেভ এবং বিশেষভাবে জেকুইস লেকন ইত্যাদি তাত্ত্বিক ধারার লেখকরা মালার্মের জটিল কবিতার প্রতি অনুগত ছিলেন।

বলা হয়ে থাকে হাইপারটেক্স (মালটিমিডিয়া কমিউনিকেশন)-এর ধারণা মালার্মের বেশিরভাগ কর্ম দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। তিনি অভীষ্ট সাধনের লক্ষ্যে খুব সতর্কভাবে লেখায় অমিত্রাক্ষর শব্দ ব্যবহারের স্থান সৃষ্টি করেছিলেন এবং বহুমুখী অবোধ্য পাঠ্যাংশকে লেখায় স্থান দিয়েছেন। যা তাঁর ‘আন কু ডি ডেস’ কবিতায় খুব স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে।

১৮৬২ সালে তিনি যখন বিশ বছরের যুবক তখন ‘এপারিশন’ কবিতায় বলেছেন, মারিয়া জারহেড নামে একজন মেয়ে যিনি নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতে তাঁর স্ত্রী হবেন; মালার্মের সঙ্গে তিনি সাক্ষাত করতে এসেছিলেন। ওই কবিতার শেষ দিক রূপান্তরিত করে তিনি বলেছেন, তাকে মাতৃত্বরূপে তিনি অনেক আগ থেকেই স্মরণ করেছেন। তিনি লিখেছেন : সে আমার শৈশব স্বর্গীয় স্বপ্নের মাঝে/¯িœগ্ধ হাতের স্পর্শে ছড়িয়েছিল মাথার উপর / সুগন্ধি তারকার মতো শুভ্র বরফের থোকা।

মালার্মে ১৮৬৩ সালের ১০ আগস্ট তাঁর প্রেমিকা মারিয়া ক্রিস্টিনা জারহাডকে বিয়ে করেন। তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে ছিল। বিয়ের পর তাদের দুটি সন্তান জন্ম হওয়ায় তিনি চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়েন। এই প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও তাঁর সাহিত্য সাধনায় কোনো রকমের ছেদ পড়েনি। বাহ্যিক দিক থেকে মনে হয় তাঁরা খুব সুখী ছিল। ভালবাসার এ প্রচেষ্টাকে তিনি রূপান্তরিত আদর্শ বাস্তবতার ক্ষণস্থায়ী রূপ হিসেবে দেখেছেন। ১৮৬৩ সালে ‘লেচ ফেনিট্রিস’ (দি উইনডো) কবিতায় তিনি লিখেছেন, এটা সম্পূর্ণরূপে প্রকৃত এবং প্রবলভাবে উদ্গরিত হয়েছিল আদর্শের অভিমুখে ধাবিত হওয়ায় : আমি লেপ্টে থাকি ওসব জানালার সঙ্গে/যেখানে একজন তাকিয়ে থাকে অন্য জীবনের দিকে।

তাঁর একুশতম জন্মদিন পালনের এক মাসের মধ্যেই মালার্মের পিতা মারা যান। পিতার মৃত্যুর পর পরই তিনি ‘লেচ পেনিটেস’ (দি উইনডো) কবিতাটি লিখেন। এ কবিতার প্রথম অংশে তিনি বর্ণনা করেছেন প্রকৃত পৃথিবীর দুঃখ এবং কুৎসিতার সাথে আদর্শ পৃথিবীর সুখ সুন্দরের দ্বদ্ব। তিনি তাঁর কবিতার প্রথম অংশ বর্ণনা করেছেন এভাবে : তিনি দেখেন দিগন্ত বিস্তৃত আলো/সোনালী জাহাজগুলো হাঁসের মতো মনোরম/ এবং আরক্ত সুবাসিত দিগন্তের অনেক কিছু। এ কবিতার দ্বিতীয় অংশে তিনি রূপক অর্থে ব্যাখ্যা করে বলেছেন আদর্শ পৃথিবীতে ভালবাসা বেশি দিন অধীগত থাকে না। তাই তিনি লিখেছেন : আমার প্রতিবিম্ব দেখতে পাই প্রেতের মতো/শিল্প রহস্যেও ভেতর দিয়ে মনে হয় আমি যাচ্ছি মরে/স্বপ্নকে মুকুটে ধারণ করে আমি আবার জন্মাতে চাই/সুন্দর আবহ প্রবাহের দেশে।

তিনি প্রকৃত পৃথিবীর নিছক ঘটনাবলী নিয়ে কোন বর্ণনাত্বক কবিতা না লিখে অশরীরী পৃথিবীকে কবিত্বরূপে বর্ণনা করতে চেয়েছিলেন যা ছিল স্পষ্টত একটা অসম্ভব ব্যাপার। ‘লা আজুর’ গ্রন্থের শেষের দুটি কবিতায় এটি পরিষ্কারভাবে প্রতিভাত হয়েছে যে, মালার্মে আদর্শ পৃথিবী সম্পর্কে শিল্পানুগ কবিতা লিখতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁর ওই কবিতাগুলো তাকে ব্যর্থতার দিকে ধাবিত করেছিল এবং সেই পৃথিবীর আবেশ থেকে মালার্মেকে বিদায় করেছিল। ‘লা আজুর’ কবিতায় তাঁর চূড়ান্ত পরিণতির কান্নায় ধ্বনিত হয়েছিল ‘আমি আকাশ দ্বারা অধ্যুষিত আকাশ, আকাশ এবং আকাশ’। এ কথা সত্যি যে মালার্মে তাঁর পরবর্তী দুটি কবিতা ‘বিটারলি অয়ারি অব মাই ইলনেস’ এবং ‘ফ্লাওয়ারস’ নামক দুটি কবিতা লিখে নিজেকে বোধের আচ্ছন্ন জগত থেকে বের করে আনার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তিনি পুরোপুরিভাবে ওহা ত্যাগ করতে পারেননি। তার পরও তিনি উদ্দেশ্যহীনভাবে প্রকৃত পৃথিবীর আহ্বান করেছিলেন। তিনি একটা মধ্যপন্থা অবলম্বন করে তাঁর পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, ফুল, লেক এবং চন্দ্রকলা ইত্যাদি সম্পর্কে সাবলীলভাবে বর্ণনাত্বক কবিতা লিখে নিজেকে প্রবোধ দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তার এ নির্গমন ছিল সাময়িক। তিনি ব্যক্তিগত সত্যবৃত্তির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার কারণে সমালোচকগণ বিরূপভাবে তাঁর সমালোচনা করেছিল। এর এক মাস পর ‘সোপির’ নামক একটি কবিতা লিখে ‘লা আজুর’ কাব্যেও শেষ দুটি কবিতার মতো নিজের মতামত প্রকাশ করেন। বহুমাত্রিক মতাদর্শিক কারণের পরও সমালোচকরা তাঁর বিশাল কর্মকা- বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, আদর্শ পৃথিবী নির্মাণ করার চেষ্টা ছাড়া তাঁর কবিতার আর কোন বিকল্প ছিল না।

নিরপেক্ষভাবে বিচার করলে দেখা যায় যে, ১৮৬০ সালের প্রথম দিকে মালার্মের সাহিত্যকর্ম ছিল সাধারণ মানের। তিনি অবসর জীবনে কম লেখালেখি করলেও সেগুলো ছিল তার মূল কাজ ও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী প্রায় পঞ্চাশটি কবিতার ছোট একটি সঙ্কলন ‘লেছ পয়েছিস ডি এস মালার্মে’ ১৮৯৯ সালের প্রথম দিকে প্রকাশিত হয়। তিনি যদিও তাঁর কিছু কবিতা প্রকাশ করেননি কিন্তু পরবর্তী আধুনিক সংস্করণে বন্ধুদের কাছে লেখা তাঁর অনেক কৌতুকপ্রদ চিঠি ও মিত্রাক্ষর কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল।

১৮৮০ সাল থেকে প্রতি সপ্তাহের মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তিনি তাঁর বাসায় ‘মারদিস’ নামে একটা সাহিত্য আড্ডার আয়োজন করতেন। সেখানে তৎকালীন প্রথিতযশা সাহিত্যিক, চিত্রশিল্পী ও সঙ্গীতজ্ঞরা যোগ দিতেন। মূলত তিনি তাঁর অবসর জীবন সাহিত্য সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। এভাবে মালার্মে সাহিত্য দর্শনে নিজস্ব একটা বলয় সৃষ্টি করেছেন। মালার্মে সেখানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কিভাবে শব্দকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা যায় তার জটিল বর্ণনা করতেন। শ্রোতারা তাঁর বক্তব্য দৈববাণীর মতো শ্রবণ করতো। ওই সময়ের লেখকদের ওপর তিনি ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বাতীত শব্দ প্রয়োগÑ যার সঙ্গে মানুষের বিশ্বের সবকিছু সংস্পর্শহীন এবং মৈলিকত্ব শূন্য প্রকৃত পৃথিবীর মধ্যে সৌন্দর্য গুণের কোন ভিত্তি নেই। যার মধ্যে ব্যাপ্ত রয়েছে আড়ম্ভরপূর্ণ সৌন্দর্যের নিছকতা। তাই তিনি লিখেছেন, ‘বস্তু গঠনে আমরা নিছক ব্যর্থ, কিন্তু ¯্রষ্টা এবং আমাদের আত্মার উদ্ভাবনের ব্যাপারে উচ্ছ্বসিত। আমার উচ্ছ্বসিত বন্ধুরা, আমি স্থির দৃষ্টিতে ও পুরোপুরি সচেতনভাবে বস্তুর দিকে তাকিয়ে বলতে চাই ওহা অস্তিত্ববান। কিন্তু স্বপ্নের কোন অস্তিত্ব নেই তা জানা সত্ত্বেও ওহা অনিয়ন্ত্রিতভাবে স্বপ্নের দিকে ধাবিত। সময়ের শুরু থেকেই আমরা আত্মাকে বন্দক রেখে স্বর্গীয় গভীর আবেগজাতীয় অনেক কিছু প্রচার করতে শুরু করেছি। মহিমান্বিত বাহ্যিক রূপের অকার্যকর সত্যের সবই মিথ্যা’!

ঊনবিংশ শতাব্দীর কবিতা আন্দোলনের সদস্যরা বিশ্বাস করতেন, কবিতার কাজ হলো মনের ভাব ও ছাপকে আহ্বান করে মূর্ত বাস্তবতার বর্ণনা করা। কিন্তু মালার্মে তাঁর পূর্বসূরিদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। গতানুগতিক অস্তিত্বের ব্যাখ্যায় তিনি অসন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি অন্য সম্ভাবনা চিত্রিত করার চেষ্টা করেছিলেন, যা শুধুমাত্র অন্তরকে আহ্বান না করে বুদ্ধিবৃত্তিকেও আহ্বান করেছিল। তাই তিনি বলেছেন, ‘কবিতার কাজ হলো পারিপার্শি¦ক বস্তু ও শব্দাচ্ছন্নতাকে মুক্ত করা’। চার্লিস সডউইক ব্যাখ্যা করে বলেছেন : ‘মালার্মে বহিরস্ত ধারণা শক্তিকে অভিগমন করে আদর্শ পৃথিবীর লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেননি। বাস্তবতার বাইরে যদি কোন কিছুর অস্তিত্ব থাকত তাহলে মালার্মের পর্যালোচনায় অবশ্যই তার যুক্তি সংক্রান্ত ব্যাখ্যা থাকত।’ কবিতার মধ্যে সহজাত শুদ্ধতা ও পরিপূর্ণতা যা তিনি বিশ্বাস করেন, এ প্রচেষ্টাকে ভাষাগত সীমাবদ্ধতার কারণে অতিক্রম করতে না পেরে তিনি প্রায়ই উদ্ভাবনী শব্দ বিন্যাস, জটিল উপমা ও পরীক্ষামূলক মুদ্রণবিদ্যা দ্বারা কবিতা সৃষ্টি করে পাঠকের উপলব্ধিকে সংপ্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। মালার্মের সাহিত্য চর্চায় সারা জীবনের গোঁ ছিল যে, পাঠকরা প্রতীকের অর্থ বোঝার জন্য তাঁর দ্বারস্থ হয়ে কাজ করবে। সাহিত্য ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক তুষ্টিকে তিনি অবজ্ঞার চোখে দেখতেন এবং তার মধ্যে সব সময়ই কবিসুলভ অস্থির ভাব ছিল। তিনি মাঝে মাঝে বিষণœতা এবং সৃজনশীল বন্ধ্যত্বে ভুগতেন।

মালার্মে যদিও তাঁর লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন কিন্তু প্রতীকবাদী আন্দোলনে ও সমসাময়িক কবিতায় তাঁর উৎপাদিত তন্তু বুনন করেছিল অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকারু। কারণ এটি প্রদর্শন করেছিল তাঁর বিশ্বাস যা ব্যাখ্যাতীত কবিতায় সজ্ঞানে বর্ণিত হয়েছিল যথাযথ প্রতীক ভাষার মাধ্যমে। গাই মিসহার্ড বলেছেন, ‘মালার্মে ফ্রান্সের তিন শতাব্দীর যুক্তিবাদী অলঙ্কার শাস্ত্র এবং তার সঙ্গে সংযুক্ত রোমান্টিকতার বর্ম থেকে কবিত্ব ব্যঞ্জনাকে বিমুক্ত করেছিলেন। তিনি মনে করেন কবি ও লেখকদের কাজ হলো রহস্যময় পৃথিবীর পাঠোদ্ধার করা।’

তিনি এক ডজন গদ্য-পদ্যের বই ছাড়াও আরও অনেক গদ্য লিখেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা হলো : লা প্রেস মিডি আন ফন (১৮৭৬), লেচ মোটস এংলেইচিস (১৮৭৮), লেস ডি এক্স এনটিকুইস (১৮৭৯), পয়েসিস (১৮৮৭) এবং আন কো ডি ডেস জামাইস নেবোরিলা লি হেসার্ড (১৮৯৭)। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি ১৮৯৭ সালে ‘এ থ্রো অব দি ডাইস উইল নেভার এবোলিস চান্স’ নামে একটিা উল্লেখযোগ্য কবিতা লিখেন এটি যেমনিভাবে চরম মৌলিকত্বের দাবিদার তেমনি বিরূপ রূপেও সমালোচিত হয়েছিল।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে আধুনিকতাবাদের শুরুতে অগ্রগামী শিল্পীরা সাহিত্যের মানচিত্রহীন মেরুম-লে প্রায়ই একই রূপ দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিলেন। তাদের লক্ষ্য ছিল অনুক্ত শব্দ,অনুৎকর্ষ স্বরূপ এবং অশ্রুত শব্দের প্রকাশ ভঙ্গির অভিনব পরিম-ল সৃষ্টি করা। সুতরাং যৌক্তিকভাবে বলা যায়, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে চূড়ান্তরূপে শিল্পসম্মত সম্ভাবনার পতাকার দ- সর্ব প্রথম প্রোথিত করেছিলেন ফ্রান্সের প্রতীকবাদী কবি স্টিফেন মেলার্মে। এ মহান সাহিত্যিক ১৮৯৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ছাপ্পান্ন বছর বয়সে তাঁর বাসভবনে মারা যান।