১৩ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দেশ ও মানুষের শিল্পী

  • সাইফুদ্দিন সাইফুল

একজন কবি এবং একজন চিত্রশিল্পীর পার্থক্যটা শিল্পের জায়গা থেকে একেবারে অভিন্নরূপ। কবি কলম-খাতা আর শব্দের সমন্বয়ে সৃষ্টি করে কবিতা বা সাহিত্যকর্ম, আর শিল্পী রং তুলি ও ক্যানভাসের একত্রে নির্মাণ করে ছবি বা শিল্পকর্ম। পার্থক্যটা এই কবি শব্দে শব্দে গেঁথে কবিতা রচনা করে এবং শিল্পী রঙের মাধ্যমে চিত্র বা ছবি আঁকে। উভয়ের ক্ষেত্রে মূর্ত-বিমূর্ত অর্থাত সৃষ্টিশীলতার মূল ভাবের প্রকাশ ঘটে। মূলত, কবি ও শিল্পী দুজনেই স্রষ্টা অর্থাৎ নান্দনিকার্থে সুন্দর এবং সৃষ্টিশীল সত্তার অধিকারী। যেহেতু চিত্রকল্পই কবিতা সেহেতু বহুমাত্রিক শিল্পের নান্দনিকরূপের প্রকাশ চিত্রকলা। সাহিত্যের মতো চিত্রকলারও ভাষা ভাব ছন্দ রূপ রসের গন্ধ থাকে। বাংলার কৃতী সন্তান বিশ্বখ্যাত অদম্য চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের চিত্রকর্মে তারই প্রতিফলন ঘটেছে। চিত্রকলা এক্ষেত্রে মানুষের জীবনের কালের সমাজের প্রকৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে একজন কবি কিংবা শিল্পী সে তার চিন্তা-চেতনা ভাবনা বোধ বিশ্বাসকে কাব্য-শিল্পকর্মের মধ্যে প্রকাশের দ্বারা উপস্থাপন করে থাকে। সুলতান তার ছবিতে এটাই সার্থক করে তুলেছে।

আমরা জানি যে, জগদ্বিখ্যাত পাবলো পিকাসো ভ্যান গগের মতো মহান চিত্রশিল্পীদের পাশাপাশি বাংলা মায়ের কৃতী সন্তান বরেণ্য চিত্রশিল্পী সুলতানের নাম আজ বিশ্ববুকে বহুল প্রচারিত ও প্রতিষ্ঠিত। তিনি আবহমান বাংলার হাজার বছরের কৃষ্টি-কালচার ইতিহাস-ঐতিহ্য প্রকৃতির অপূর্ব রূপ ও প্রান্তিক মানুষের দৈনন্দিক জীবনের প্রতিচ্ছবি ক্যানভাসে একে বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছেন। আপন শিল্পসত্তাকে ও তার অদম্য সৃষ্টিশীলতাকে নিজ ঐকান্তিক চেষ্টা গভীর সাধনা এবং ভালবাসার পরশে প্রকাশ করেছেন। আর তাই তার প্রতিটা চিত্রকর্মে দৃষ্টিনন্দন শিল্পরূপ প্রকাশ পেলেও মূলত মানবিকতাই মুখ্য হয়ে উঠেছে। বিখ্যাত চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের চিত্রকর্মে মূর্ত-বিমূর্তের সমন্বয়ে শিল্পের আধুনিকতার প্রকাশ ঘটেছে। তিনি অবশ্যই একজন শিকড় সন্ধানীর পাশাপাশি আধুনিক চিত্রশিল্পী ছিলেন। তবে তার এই আধুনিকতা অন্যদের চাইতে আলাদা ও অনন্য। মানুষের জীবনের যে জয়গান, মানবিকতা ও চেতনাবোধ সেটাকে তিনি তার শিল্পচর্চা ও শিল্পকর্মে গুরুত্ব এবং অধিক স্থান দিয়েছেন। মূলত মানবিকতায় তার শিল্পকর্মে দিপ্ত-আলোর মতো চির উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

এসএম সুলতান বাংলার খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ প্রত্যহ রোদ-বৃষ্টিতে কষ্ট করা কৃষক-শ্রমিকের যাপিত জীবনের কঠিন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি তিনি তার শিল্পের নজর দিয়ে সৃজনশীলতার অপার রঙে মূর্ত-বিমূর্তকে ক্যানভাসের বুকে দক্ষতার সহিত নির্মাণ করেছেন। তিনি শিল্পকে করে তুলেছেন বিশ্বাসের প্রতিবাদের দ্রোহের জীবন নামের মহান সত্তার একান্তে চিত্ররূপ। প্রকৃতই একজন শিল্পীকে মানুষকে জীবনকে সমাজকে প্রকৃতিকে ও সমকালকে যেভাবে দেখা উচিত এবং আপন চিন্তা ভাব-ভাবনা উপলব্ধির আদলে চিত্রায়িত করা আবশ্যক তা আমাদের এসএম সুলতান তিনি তার চিত্রের ভেতরে অকপটে দক্ষতার সঙ্গে রং তুলির আচড়ে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। একজন শিল্পী হয়েও তিনি অনেকটা প্রতিবাদী ও বিদ্রোহী ছিলেন। গ্রামীণ জীবনে ও সমাজে বিদ্যমান অনেক অসঙ্গতি সুলতানকে তাড়িত করেছে। তার আঁকা অনবদ্য চিত্রকর্ম ‘চরদখল’ ও ‘হত্যাযজ্ঞ’ সেসবের প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছে। এখানে শিল্পী গ্রামীণ জীবনে সমাজে অর্থাৎ গ্রাম্য-প্রেক্ষাপটে অর্থনীতির যে চিরাচরিত বৈষম্য আর শ্রেণীদ্বন্দ্বের কঠিন বাস্তবতা তা শিল্পের রঙে প্রকাশ পেয়েছে। বিদ্যমান হয়ে আসা কাজেই এ কথা বলতেই হয় যে, তিনি সত্যিকারের একজন জাতশিল্পী। এ কথা দিবালোকের মতো সত্য যে, যে শিল্পী আপাদমস্তক শিল্পসত্তা ধারণ করে সেই শিল্পীর শিল্পকর্ম তাকেই প্রথমে প্রকাশ করে থাকে। আর তাই আমরা এসএম সুলতানের রং তুলির আঁচড়ে ক্যানভাসের বুকে ফুটে উঠতে দেখি মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তঝরা দিনের ও আত্মত্যাগের অসাধারণ যত বিচিত্রময় শিল্পময় নান্দনিক ও দৃষ্টিনন্দন ছবি। সুলতানের আঁকা ‘গণহত্যা ১৯৭১’ চেতনাধর্মী চিত্রকর্মটি অন্যতম এবং একাত্তরে ভয়ানক পেক্ষাপটের বাস্তব চিত্র। এখানে মানবতাবিরোধী জঘন্যতম ভয়াবহ গণহত্যার চিত্র এঁকেছেন।

এসএম সুলতানের অনেক চিত্রকর্মে কৃষকের যে পেশিশক্তির রূপ প্রকাশ পেয়েছে তা কর্মঠ কৃষক শ্রমিক খেটে খাওয়া মানুষের আত্মবিশ্বাসের প্রকাশমাত্র। কৃষক ফসল ফলায় শ্রম দেয় মাটির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং অন্যের স্বপ্নের স্বপ্নকে দৃঢ় করে। সুলতানের চিত্রকর্মে কৃষকের সেই মানবিক পেশিশক্তির মননশীল শিল্প অনেক বেশি ফুটে উঠেছে। শুধু তাই নয়, চিত্রকর্মও একটি প্রতিবাদের ভাষাও বটে। অন্যায় অনিয়ম কৃসংস্কার সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধেও চিত্রকর্ম যুগে যুগে সৃজনশীল প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছে। সুলতানের আঁকা ছবিতে সেসব খুনসুটি এতটুকু দূরে সরে যাইনি। বারংবার সাবলিল সহজ সরল হয়ে এসেছে। এখানেই সুলতান অনন্য ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। আসলে তিনি শেকড়ের শিল্পী, শেকড় সন্ধানী জ্ঞানী প-িত এবং বহুমাত্রিক শিল্পীমন নিয়ে বাংলার মাটিতে জন্ম নিয়েছিলেন। এ কথা আজ বলতে পারি যে, শিল্পী সুলতান তিনি তার বিশ্বাস ও আপন অনুভূতিগুলোকে রং তুলির আঁচড়ে দক্ষ কারিগরের মতো নিপুণ হাতের জাদুর ছোঁয়ায় ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন।

এসএম সুলতানের বৈচিত্র্যময় চিত্রকর্মে বাংলার মাটি বাংলার জল বাংলার পাখি বাংলার গাছ বাংলার খেটে খাওয়া কৃষক মেহনতী মানুষ এবং গ্রামীণ নারীকে খুব সচেতনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তার অনেক ছবিতে আমাদের গ্রাম-বাংলার সুডৌল ও সুঠাম গড়নের অধিকারী নারীদের তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি এই মহান প্রতিভাবান শিল্পীর আঁকা ক্যানভাসে আবহমান গ্রাম-বাংলার চিরাচরিত ঋতুবৈচিত্র্যের ও প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য-বৈভব দেখে যারপরনাই অবাক নয়নে মুগ্ধ বাংলার মানুষ। শিল্পী এসএম সুলতানের আঁকা অসংখ্য চিত্রে গ্রাম-বাংলার প্রতিচ্ছবি যেভাবে নান্দনিকভাবে ফুটে উঠেছে তা সত্যিই অবাক করে দেয়। গ্রামকে তিনি মায়ের মতো মমতাময়ী ¯েœহশীল করে উপস্থাপন করেছেন। গ্রামের রূপকে হরেক রঙের বাহারে একদম সত্যিকারের গ্রাম করে তুলেছে। চিত্রকলায় যে মূর্ত-বিমূর্তের বিষয়টি মুখ্য হয়ে ওঠে এবং তা মূর্তর ভেতর আর বিমূর্তর সাদৃশ্যতার সমন্বয়ে শিল্পরূপ প্রকাশ করে। আমরা শিল্পের সেই বহুমুখিতার গভীর বন্ধনটাই সুলতানের চিত্রকর্মে দেখতে পাই। সুলতানের আঁকা তার ‘গ্রাম্যপথ’ চিত্রকর্মটি গ্রামের পথের সৌন্দর্যকে তুলে ধরেছেন।

ব্যক্তি মানুষ হিসেবে সুলতান কতটা যে মানবিক এবং সহজ-সরল ও নিরেট অসাধারণ ভাল মানুষ ছিলেন তার জলন্ত বাস্তব প্রমাণ হলো বিভিন্ন পশুদের প্রতি তার নিঃস্বার্থ প্রেম ও ভালবাসা। পৃথিবীতে অনেক অনেক মানুষই আছে যারা কেউ কেউ কুকুর কিংবা বিড়াল অথবা পাখি বা অন্যান্য পশু-পাখি পোষে। কিন্তু একসঙ্গে বিভিন্ন পশু সম্পূর্ণ সন্তানের মতো করে আদর ¯েœহের পরশে কাছে রেখে পাশে শুইয়ে পরম বন্ধুর ন্যায় বসবাস করতে শুধুমাত্র শিল্পী এসএম সুলতানকেই আমরা দেখতে পাই। তিনি যেন একজন অলৌকিক জাদুকর মানুষ ছিলেন। তানা হলে এসব অবলা পশুগুলো কিভাবে একজন মানুষের সঙ্গে নিজেদের স্বজাতির মতো পাশাপাশি থেকেছে খেয়েছে এবং বসবাস করেছে। আসলে পশুদের প্রতি তার এই প্রেম দেখে সত্যিই যারপরনাই একেবারে বিস্ময়ে হতবাক হতে হয়। কুকুর-বিড়াল, শাপ, হনুমান-বানর, বিভিন্ন পাখি ও খরগোশসহ আরও অনেক ধরনের পশু নিয়েই ছিলো আমাদের প্রিয় মানুষ লালমিয়ার যাপিতজীবন।

সুলতানের অসাধারণ সব চিত্রকর্ম নিয়ে দেশে ও বিদেশের মাটিতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গাতে একক এবং যৌথভাবে প্রদর্শনী হয়েছে। এ সকল প্রদর্শনীতে বাংলার মাটি বাংলার রূপ বাংলার আকাশ বাংলার নদী গ্রাম কৃষক শ্রমিক সর্বোপরি মানুষের একান্তে রূপটাকেই তুলে ধরা হয়েছে। ভারতের সিমলায় ১৯৪৬ সালে কানাডিয়ান এক মহিলা হার্ডসনের সঙ্গে বন্ধুত্ব হওয়ার সুবাদে এবং তার উদ্যোগে সুলতানের চিত্রকর্ম নিয়ে প্রদর্শনী হয়। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের লাহোর ও করাচীতে প্রদর্শনী হয়। ১৯৫০ সালে লন্ডনে বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পীদের সঙ্গে তার চিত্রও প্রদর্শনী উদযাপিত হয়। আমেরিকাতেও তার চিত্রকর্ম নিয়ে প্রদর্শনী হয়েছে। ১৯৭৬ সালে ঢাকায় শিল্পকলা একাডেমিতে বাংলাদেশে প্রথম প্রদর্শনী হয়। এছাড়া ১৯৯৩ সালে ঢাকায় একক ও শেষ চিত্র প্রদর্শনী উৎসব করা হয়।

মা মাটি বাংলার কৃতী সন্তান বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী আমাদের লাল মিয়া (এসএম সুলতান) চিত্রশিল্পে আপন মেধা সৃজনশীলতার অনেক অনেক অবদান ও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। আর তাই যোগ্যতার মূল্যায়ন হিসেবে তিনি ‘একুশে পদক-১৯৮২, ‘রেসিডেন্সিয়াল আর্টিস্ট -১৯৮৪, ‘বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা-১৯৮৬, ও ‘চাঁদের হাট পদক-১৯৮৬, এবং ‘স্বাধীনতা পদক-১৯৯৩, ইত্যাদি পুরস্কার লাভ করেছেন। এছাড়া এই প্রতিভাবান সৃজনশীল ও মননশীল চিত্রশিল্পী তিনি দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও অনেক বেশি খ্যাতি ও সম্মানিত হয়েছেন এবং পুরস্কার পেয়েছেন। যেমন, ‘ম্যান অব এ্যাচিভমেন্ট (বায়োগ্রাফিক্যাল সেন্টার, নিউইয়র্ক), ‘ম্যান অব দ্য ইয়ার (ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, লন্ডন), ও ‘ম্যান অব এশিয়া (এশিয়া উইক পত্রিকা) ইত্যাদি সম্মাননা অর্জন করেছেন। সুলতানের এসব পুরস্কার তাকে যেমন সম্মানের আসনে বসিয়েছে তেমনি দেশ ও জাতির সম্মানকে অনেক উঁচুতে তুলে ধরেছে।

হতদরিদ্র জন্মদাতা পিতা শেখ মেছের আলী আর গর্ভধারিণী মাতা মাজু বিবির ঘর আলোকিত করে বিগত ১৯২৩ সালে আগস্ট মাসের ১০ তারিখে নড়াইল জেলার চিত্রা নদীর পাড়ে অখ্যাত গ্রাম মাছিমদিয়ায় আমাদের অতিব আপনজন শিল্পের অদম্য শিল্পচাষী এসএম সুলতান এই ধরাধামে বাংলার বুকে জন্ম গ্রহণ করেন। এই বহুমাত্রিক কৃতী চিত্রশিল্পী তিনি তার দীর্ঘ জীবনকাল শেষে ৭০ বছর বয়সে ১৯৯৪ সালে ১০ অক্টোবরে যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে না ফেরার দেশে পাড়ি দেন। নড়াইলে তার আড্ডাস্থল, শিল্প-সাধনার স্থান এবং যেখানে তিনি তার জীবনের সিংহভাগ সময় কাটিয়েছেন সেই চিত্রা নদীর পাড়ে সবুজ শ্যামল হরেক বৃক্ষে ছায়াঘেরা শিল্পীর বাড়ির ভেতরেই তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। আমাদের প্রিয় চিত্রশিল্পী মা মাটি বাংলা কৃতী সন্তান বিশ্বনন্দিত তারকা এসএম সুলতানের জয় হোক এবং তার চিত্রকর্ম হাজার হাজার বছর মানুষের অন্তরে বেঁচে থাকুক......

নির্বাচিত সংবাদ