১৪ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এমবিবিএস মেডিক্যাল ভর্তি কার্যক্রমে ট্রাইবাল কোটায় আসন বরাদ্দে অনিয়ম

এমবিবিএস মেডিক্যাল ভর্তি কার্যক্রমে ট্রাইবাল কোটায় আসন বরাদ্দে অনিয়ম

স্টাফ রিপোর্টার ॥ দু’ বছর ধরে এমবিবিএস কোর্সের মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় ন্যূনতম পাস নম্বর পেয়ে আসছে রিম্মিত আমুয়া চিরান। সে গারো ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠী(ট্রাইবাল) পরিবারের মেয়ে। ভর্তি পরীক্ষার মূল ফলাফল থেকে তৃতীয় মাইগ্রেশন পর্যন্ত চলে ‘ নন-ট্রাইবাল ’ শিক্ষার্থীদের ভর্তির সুযোগ প্রদান এবং ট্রাইবাল সার্টিফিকেট না থাকায় তাদের ভর্তি হতে না পারার খেলা। আশায় আশায় স্বাভাবিক নিয়মের দিকে তাকিয়ে থাকে রিম্মিত চিরান। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আন্তরিক হস্তক্ষেপে এক পর্যায়ে সে তার আসন পেয়েও যায়। কিন্তু ততক্ষণে ভর্তি হওয়ার নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে যায়। ভর্তি হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় সে। চলতি বছরেও সে একই পরিণতির মুখোমুখি হতে চলেছে। এভাবে প্রতি বছর এমবিবিএস মেডিক্যাল ভর্তি কার্যক্রমের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভুলের কারণে প্রকৃত টাইবাল শিক্ষার্থীরা তাদের জন্য বরাদ্দকৃত আসনে ভর্তি হতে পারছে না। শূন্য রয়ে যায় ট্রাইবাল কোটার আসন। অথচ কোনো শিক্ষাবর্ষেই ট্রাইবাল কোটায় (তিন পার্বত্য জেলা ব্যতীত) ভর্তি হওয়ার জন্য ন্যূনতম পাস নম্বর প্রাপ্য ৮ জন ট্রাইবাল শিক্ষার্থী পাওয়া যায় না। বিষয়টির সুরাহা চেয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বরাবর আবেদনপত্র জমা দেয়া হয়েছে। আর মন্ত্রনালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগকে বিষয়টি তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। কিন্তু গত বছরও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশে একই সমস্যা নিয়ে তদন্ত হয়, যার প্রতিবেদন এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এমবিবিএস কোর্সের মেডিক্যাল ভর্তি কার্যক্রমে ট্রাইবাল কোটায় (তিন পার্বত্য জেলা ব্যতীত) আসন বরাদ্দে অনিয়মের প্রতিবাদে অনুষ্ঠিত মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তারা এসব অভিযোগ করেন। বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠন(বাগাছাস), ঢাকা মহানগর শাখা এই কর্মসূচীর আয়োজন করে। বাগাছাস, ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি প্যাট্রিক চিসিম এর সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক জেউন্স ঘাগ্রা এর সঞ্চালনায় মানববন্ধন কর্মসূচীতে বক্তব্য রাখেন বাগাছাস কেন্দ্রীয় সংসদের সাংগঠনিক সম্পাদক ডেভিড চিরান, বাগাছাস ঢাকা মহানগর শাখার সহ সভাপতি সাইমন রিছিল ও রাইনাস দিও, সাংগঠনিক সম্পাদক সঠিক রুরাম, অর্থ বিষয়ক সম্পাদক সুপ্ত আজিম, বাংলাদেশ মারমা স্টুডেন্ট কাউন্সিলের সদস্য মং থিংওয়াং প্রমুখ

সমাবেশে ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন, প্রতি বছর একই অনিয়মের কারণে প্রকৃত ট্রাইবাল শিক্ষার্থীরা আসন প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। গত বছর আদিবাসী নেতৃবৃন্দের অভিযোগ দেয়ার প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য অধিদফতরকে বিষয়টি তদন্তের নির্র্দেশ দেয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয়। মন্ত্রণালয় বরাবর স্বাস্থ্য অধিদফতরের পাঠানো প্রতিবেদনে ট্রাইবাল কোটার (তিন পার্বত্য জেলা ব্যতীত) দু’টি আসন খালি রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। ততক্ষণে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হওয়ার নির্ধারিত তারিখ শেষ হয়ে যায়। আসন ফিরে পাওয়ার পরও ভর্তি হওয়ার সুযোগ হয়নি প্রকৃত ট্রাইবাল শিক্ষার্থীদের। ট্রাইবাল কোটায় সুযোগ পাওয়ার পরও কলেজে ভর্তি না হয়ে সময়ক্ষেপন করা ১১ জন শিক্ষার্থীর ট্রাইবাল সার্টিফিকেট চেয়ে সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর জেলা প্রশাসক বরাবর চিঠি দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদফতর। কিন্তু গত এক বছরেও তা পাওয়া যায়নি। বিষয়টি এখন পর্যন্ত অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এর মধ্যে আরেকটি এমবিবিএস কোর্সের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল বের হয়ে প্রথম মাইগ্রেশন পর্যন্ত হয়ে গেছে।

ট্রাইবাল কোটা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অনিয়মের চিত্র ও কৌশল তুলে ধরে সমাবেশে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে মোট ৪৫টি জাতিসত্বার প্রায় ৩০ লাখ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। সরকারিভাবে যারা ‘ক্ষুদ্র- নৃ গোষ্ঠী’ হিসেবে পরিচিত। তিন পার্বত্য জেলায় ১৩টি ভাষাভাষীর ১২টি জাতিগোষ্ঠীর বসবাস। বাকি ৩২টি জাতিগোষ্ঠী দেশের শেরপুর, জামালপুর, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইল, সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, গাজীপুরসহ রাজশাহী বিভাগের বেশ কিছু সংখ্যক জেলায় বাস করে, যারা সমতলের আদিবাসী বলে পরিচিত। এমবিবিএস মেডিক্যাল ভর্তি কার্যক্রমে কোটার ভিত্তিতে ভর্তি হওয়ার জন্য সমতলের আদিবাসীদের জন্য মোট ৮টি আসন রয়েছে, যা সরকারিভাবে ‘ ট্রাইবাল কোটা(তিন পার্বত্য জেলা ব্যতীত) ’ বলে উল্লেখ রয়েছে। এই কোটা সুবিধা নিতে হলে ভর্তি পরীক্ষার ফরম পূরণ করার সময় কোড নম্বর ‘ ৭৭ ’ টিক চিহৃ দিতে হয়। যারা এই কোড নম্বরে টিক চিহৃ দিবেন , তারাই ট্রাইবাল শিক্ষার্থী হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকেন। কিন্তু অবাধ স্বাধীনতা পেয়ে অনেক ‘ নন-ট্রাইবাল ’ শিক্ষার্থী ট্রাইবাল (তিন পার্বত্য জেলা ব্যতীত) শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত ‘ ৭৭’ কোড নম্বরে টিক চিহৃ ব্যবহার করে আসছে । কারণ বরাদ্দকৃত মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ ব্যতীত ‘ ৭৭ ’ কোড নম্বর ব্যবহারকারীর ‘ ট্রাইবাল সার্টিফিকেট ’ যাচাই বাছাই করার মাঝপথে আর কোন কর্তৃপক্ষ নেই। একজন শিক্ষার্থী যখন ভর্তির অনুমতি পেয়ে কোনো কলেজে ভর্তি হতে যায়, শুধু তখন ওই কলেজ কর্তৃপক্ষ দ্বারাই ট্রাইবাল সার্টিকেট যাচাই হয় । মেধাস্কোর ও মেধাস্থানের বিবেচনায় তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকার সুযোগে কোড নম্বর ‘ ৭৭’ ব্যবহারকারী অনেক ‘ নন-ট্রাইবাল ’পরীক্ষার্থী ট্রাইবাল কোটার আসন দখল করে নেয়। আবার ‘ ৭৭ ’কোড নম্বর ব্যবহার করে ফলাফলের ভিত্তিতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলেও ‘ নন-ট্রাইবাল ’ পরীক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট কলেজ কর্তৃপক্ষকে ট্রাইবাল সার্টিফিকেট দেখাতে না পেরে কলেজে ভর্তি হতে পারেন না। ভর্তি পরীক্ষার মূল ফলাফল থেকে তৃতীয় মাইগ্রেশন পর্যন্ত চলে ‘ নন-ট্রাইবাল ’ শিক্ষার্থীদের ভর্তির সুযোগ প্রদান এবং ট্রাইবাল সার্টিফিকেট না থাকায় তাদের ভর্তি হতে না পারার খেলা। ততক্ষণে ভর্তি হওয়ার নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে যায়। আর প্রকৃত টাইবাল শিক্ষার্থীরা পড়ে থাকে আলোচনার বাইরে। শূন্য রয়ে যায় ট্রাইবাল কোটার আসন। অথচ কোনো শিক্ষাবর্ষেই ন্যূনতম পাস নম্বর প্রাপ্য ৮ জন ট্রাইবাল শিক্ষার্থী পাওয়া যায় না। গত বছরও দু’টি আসন শূন্য রয়ে যায়। তদন্ত সাপেক্ষে নন-ট্রাইবাল শিক্ষার্থীদের চিহিৃতকরণ এবং প্রকৃত ট্রাইবাল শিক্ষার্থীদের সেই শূন্য আসনে ভর্তি হওয়ার সুযোগ দিতে সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা কামনা করেন আদিবাসী ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।