১৪ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রাইদের নানাবাড়ি

  • মীম নোশিন নাওয়াল খান

রাইদ ঘুম ঘুম চোখে হাতমুখ ধুয়ে নাস্তার টেবিলে এসে বসল। তার হাতে ফোন। এক হাতে সে খাবার খাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু মন পড়ে আছে ফোনের গেইমে।

রাইদ নানাবাড়িতে এসেছে তিনদিন হলো। এই তিনদিন ধরে সে ফোন নিয়েই পড়ে থাকে সারাদিন। ঘর থেকে এক পা-ও বের হয়নি কোথাও।

ছোট মামা বললেন, কী ব্যাপার রাইদ? তুই এতদিন পর নানাবাড়িতে এসেছিস, কই একটু ঘুরবি, তা না, সারাটা দিন ফোন নিয়েই পড়ে থাকিস!

রাইদ মামার কথা শুনতে পেল বলে মনে হলো না। গেইমেই ডুবে ছিল সে। ছোট মামা এবার তার কাঁধে ঝাঁকি দিয়ে আবার বললেন, কী রে? সারাদিন গেইম খেলার জন্য নানাবাড়ি এসেছিস?

এবার রাইদ ফোন থেকে মাথা তুলল। বলল, উফ! মামা! এখানে করার মতো কী আছে বলো তো? আমি তো গেইম খেলা ছাড়া করার মতো কোন কাজই দেখছি না।

ছোট মামা চোখ কপালে তুলে বললেন, বলিস কী রে? এত্ত কাজের মধ্যে তুই কোন কাজ দেখছিস না? তাড়াতাড়ি খেয়ে ওঠ তো, আমি তোকে দেখাচ্ছি এখানে কত্তকিছু করার আছে! পুকুরের নির্মল পানিতে সাঁতার কাটা কত আনন্দের, মাঠে ঘুড়ি ওড়ানো কত আনন্দের- তুই সেগুলো না করলে বুঝবি কিভাবে?

ছোট মামার কথা শেষ না হতেই আম্মু আঁতকে উঠে বললেন, না না! রাইদকে ওসব করতে নিস না। পুকুরে সাঁতার কাটবে মানে কী? ঠান্ডা লেগে যাবে তো! ও তো সুইমিং পুলের পানিতে সাঁতার কাটে। পুকুরের পানি বেশি ঠান্ডা। আর সুইমিং পুলের পানি তো পরিষ্কার। পুকুরের পানিতে কত রকম নোংরা। রাইদ অসুস্থ হয়ে যাবে। আর মাঠে ঘুড়ি ওড়াবে মানে? বাইরের কাদামাটি ধুলোবালির মধ্যে গিয়ে তো একদম অসুস্থ হয়ে যাবে। তার ওপর আবার রোদে ঘামবে। আর মাঠের মধ্যে কোথায় কী পোকামাকড় আছে, গর্ত আছে, কাঁটাকুটো আছে- শেষে বিচ্ছিরি অবস্থা হবে।

ছোট মামা তুড়ি মেরে আম্মুর কথা উড়িয়ে দিয়ে বলল, এগুলো কিচ্ছু হবে না বুবু। তুমি শুধু শুধু চিন্তা করো। এখানে যারা থাকে, তারা কি পুকুরে নামে না? মাঠে যায় না? কই তাদের তো কিছু হয় না! এভাবে ঘরে বসিয়ে রেখে তো ফার্মের মুরগি বানিয়ে ফেলবে ছেলেটাকে!

আম্মুর নিষেধ আর রাইদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও খাওয়া-দাওয়া শেষে ছোট মামা রাইদকে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে গেলেন। পুকুরপাড়ে এসে ছোট মামা বললেন, রাইদ বাবু, চলো, নেমে পড়ো!

রাইদ ভয় পাওয়া গলায় বলল, এখানে? কিন্তু এখানে তো কোন তল দেখা যাচ্ছে না। সুইমিংপুলে তো তল দেখা যায়। যদি ডুবে যাই?

ছোট মামা হেসে ফেললেন। বললেন, শোন, আমরা সাঁতার শিখি কেন জানিস? বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। পানির সঙ্গেই আমাদের জীবন। যে কোন সময় পানিতে কোন বিপদ হলে যেন জীবন বাঁচানো যায়, এজন্য আমরা সাঁতার শিখি। তল না দেখতে পেলে যদি সাঁতার কাটতে ভয় পাস, কখনও প্রয়োজন হলে নদীতে সাঁতার কাটবি কিভাবে?

ছোট মামা নিজে পানিতে নামলেন। রাইদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, আয়।

রাইদ তবুও আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর কাঁচুমাচু করে বলল, এই পানিতে কত্ত নোংরা আছে কে জানে!

ছোট মামা আবার হেসে ফেললেন। বললেন, তোদের ওই সুইমিংপুলের পানিতে কত মানুষ সাঁতার কাটতে গিয়ে কফ থুথু ফেলে জানিস? অসচেতন মানুষ কত আছে! আর এই পুকুরের পানি কিন্তু নোংরা না। এই পানি প্রাকৃতিকভাবেই পরিষ্কার হতে থাকে। এখন আয়, নাম।

রাইদ তবুও নামতে ভয় পাচ্ছিল। ছোট মামা এবার তাকে হাত ধরে টেনে নামিয়ে আনলেন। নামার সঙ্গে সঙ্গে পানির ঠান্ডা ঠান্ডা স্পর্শে রাইদ কেঁপে উঠল।

ছোট মামা বললেন, দেখ, কী সুন্দর একটা প্রাণ জুড়ানো শীতল অনুভূতি না? এটা তোর সুইমিংপুলে পাবি?

রাইদ এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে ফেলল। তারপর অনুভব করল, মামা একদম ঠিক বলেছেন। পুকুরের পানিতে কেমন যেন একটা প্রাণ জুড়ানো ভাব। সুইমিংপুলে সত্যিই সেটা নেই।

ছোট মামা বললেন, এবার চল, তুই আর আমি একসঙ্গে সাঁতার দেব, দেখি ওইপাড়ে কে আগে যেতে পারে। তারপর ঐপাড়ে ওই যে টুটুল গাছটা দেখছিস, ওটার ডালে উঠে সেখান থেকে লাফ দিয়ে পানিতে পড়ে সাঁতার দিবি।

রাইদ অবাক হয়ে বলল, গাছের ডাল থেকে লাফ দিয়ে পানিতে নামব?

ছোট মামা বলল, হ্যাঁ! নামবি। নেমেই দেখ একবার, কত্ত মজা! শহরে বন্দী থেকে তো গ্রামগঞ্জের এই চমৎকার জিনিসগুলো তোরা জানিসই না। ফার্মের মুরগি হচ্ছিস!

রাইদ আর ছোট মামা একসঙ্গে সাঁতার শুরু করল। প্রথমে একটু ভয় পেলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই রাইদ এত মজা পেয়ে গেল যে তার ইচ্ছে হলো সারাদিন পুকুরেই বসে থাকে। ঢাকায় তার প্রতিদিন সুইমিংপুলে গিয়ে সাঁতার কাটার অভ্যেস। কিন্তু সুইমিংপুলে এমন আনন্দ সে কখনোই পায়নি। চারপাশে গাছ, কখনও মাথার ওপর থেকে হলুদ পাতা পড়ছে পানিতে, পাখির কিচিরমিচির- এমন পরিবেশ যেন স্বর্গকেও হার মানিয়ে দেয়।

রাইদের মনে হলো, ফোনের গেইম আর তার শহুরে জীবন এগুলোর কাছে কিছুই না। আব্বু-আম্মু কেন তাকে এগুলো করতে দেয় না? কেন শুধু শুধু ভয় পায়?

রাইদ খুব আগ্রহ নিয়ে ছোট মামাকে জিজ্ঞেস করল, মামা, আমরা ঘুড়ি ওড়াতে যাব না?

ছোট মামা হো হো করে হেসে ফেললেন। বললেন, তুই ভেবে দেখ, ঘুড়ি ওড়াতে যাবি নাকি গেইম খেলবি।

রাইদ মাথা নেড়ে বলল, না না, গেইম খেলব না! ঘুড়ি ওড়াতে যাব।

তারপর একটু থেমে সে আবার জিজ্ঞেস করল, ছোট মামা, এখন ধান পাকার সময়, তাই না?

ছোট মামা বললেন, হ্যাঁ, হেমন্ত শুরু হলো তো। ধান পেকে গেছে। ধান কাটা শুরু হবে। আসার সময় দেখিসনি, মাঠভরা সোনালি ধান?

রাইদ বলল, হ্যাঁ, দেখেছি তো।

কথাটা বলেই রাইদ কল্পনায় ডুবে গেল। সে আর ছোট মামা সোনালি ধানক্ষেতের ভেতরের আইল ধরে নাটাই নিয়ে দৌড়াচ্ছে। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলার মধ্যে তার রঙিন ঘুড়ি উড়ছে। দুইপাশে সোনালি ধান যেন হেসে তাকে অভিবাদন জানাচ্ছে। রাইদের ইচ্ছে হলো, এই গ্রামেই সে থেকে যায়, যান্ত্রিকতা থেকে অনেক অনেক দূরে নির্মল সুন্দর এক পরিবেশে।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল এ্যান্ড কলেজ, একাদশ শ্রেণী, (ইংরেজী ভার্সন)

অলঙ্করণ : আইয়ুব আল আমিন