২৪ জানুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাহিত্য ও রাজনীতি

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার প্রেক্ষাপটে দেশের রাজনীতি যখন সরগরম তখন রাজধানীতে জমে উঠেছে ঢাকা লিট ফেস্ট। রাজনীতির সঙ্গে সাহিত্যের সরাসরি কোন সম্পর্ক আছে কিনা, সে বিতর্কে আপাতত না গিয়েও বলা যায় যে, সাহিত্য সবকিছুই ধারণ করে থাকে অবলীলাক্রমে। রাজনীতি, অর্থনীতি থেকে শুরু করে দেশ কাল ব্যক্তি ও সময়ের সঙ্গে আর্থ-সামাজিক অবস্থার নিত্য টানাপোড়েন, সুখ-দুঃখ-আনন্দ-বেদনা, প্রেম ও প্রকৃতি, হিংসা-বিদ্বেষ-জিঘাংসা এমনকি দাঙ্গা-হাঙ্গামা, যুদ্ধ-বিগ্রহ- এসবই অবলীলায় স্থান করে নেয় সাহিত্যে। তবে তা অবশ্যই শিল্পোত্তীর্ণ ও রসোত্তীর্ণ হয়ে ওঠা চাই। এর পাশাপাশি সাহিত্যে সমকালীন সমাজ বাস্তবতার প্রতিফলনও ঘটে বৈকি। তা না হলে বর্তমানে প্রায় বিশ্বব্যাপী নারী স্বাধীনতা ও আন্দোলনের দ্যোতক হিসেবে হ্যাশট্যাগ টু মি-ও কিভাবে সহজে স্থান করে নেয় ঢাকা লিট ফেস্টে! এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, শিল্প-সাহিত্য সমকালীন সমাজ দর্পণও বটে। পুলিৎজার বিজয়ী মার্কিন সাহিত্যিক এ্যাডাম জনসন, ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা ও অভিনেত্রী নন্দিতা দাস, প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক ও সাংবাদিক জেমস মিক, একাডেমি এ্যাওয়ার্ড বিজয়ী ব্রিটিশ অভিনেত্রী টিল্ডা সুইনটন, বলিউড সুঅভিনেত্রী মনীষা কৈরালার মতো স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রথিতযশা লেখক ও শিল্পীরা এবার অলংকৃত করেছেন ঢাকা লিট ফেস্টের জমজমাট আসর। এসবের মধ্যে দ্বিতীয় দিনের অধিবেশনে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত ‘ডিকোডিং দ্য বাংলাদেশ প্যারাডক্স’ শীর্ষক অধিবেশনটি সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। যেখানে বলা হয়েছে, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য নারীর ক্ষমতায়ন, বিদ্যুতের প্রাপ্যতা, তৈরি পোশাক রফতানি, রেমিটেন্স প্রবাহÑ এসবই দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন ও সমৃদ্ধি এনেছে। আয়বৈষম্য থাকলেও কমেছে দারিদ্র্য। নিশ্চিত হয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা।

ঢাকা লিট ফেস্টের এটি ৮ম আসর। বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতা ও বাংলা একাডেমির সৌজন্যে উত্তরোত্তর জনপ্রিয় এই উৎসবের পরিচালনায় সহযোগিতা করে থাকে স্থানীয় একটি গণমাধ্যম ও বাণিজ্যিক ব্যাংক। এর প্রিমিয়ার পার্টনার ঢাকার ভারতীয় দূতাবাস ও স্ট্রাটেজিক পার্টনার ব্রিটিশ কাউন্সিল। এ থেকে খুব সহজেই ঢাকা লিট ফেস্টের আন্তর্জাতিক চরিত্রটি হৃদয়ঙ্গম করা চলে। উদ্যোক্তাদের বক্তব্য থেকে জানা যায়, মূলত বিশ্বসাহিত্যের প্রতি আগ্রহী প্রজন্মের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম সৃষ্টি করাই এর অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। সে বিবেচনায় এর সাফল্য সম্পর্কে বেশ নিঃসংশয় হওয়া চলে বৈকি। এবারের উৎসবটি ইতোমধ্যে দেশী-বিদেশী প্রখ্যাত লেখক-পাঠক, অভিনেতা প্রকাশক ও শিল্পীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে। বাংলা একাডেমির সুপরিসর চত্বর ও মিলনায়তনগুলো যেন পরিণত হয় বিশ্বসাহিত্যের আঙ্গিনায়। গল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতা, চলচ্চিত্র, সঙ্গীত তথা সাহিত্যের নানা মাধ্যম নিয়ে চলা অধিবেশনের পাশাপাশি নাচ, লোকগান, লোকসঙ্গীত, বাদ্যযন্ত্রসহ বাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলাও উপভোগের অবারিত সুযোগ দেয় দেশী-বিদেশী শিল্পী-সাহিত্যিক, অনুরাগী ও দর্শকশ্রোতাকে। এতে করে বিভিন্ন দেশের মধ্যে শিল্প-সাহিত্যের আদান-প্রদান-ভাব বিনিময় যেমন হয়ে থাকে তেমনি গড়ে ওঠে মৈত্রী ও সম্প্রীতির সেতুবন্ধন। সত্য হলো এই যে, যে কোন দেশের শিল্প-সাহিত্য-চারুকলা ও সংস্কৃতি পারস্পরিক ভাব বিনিময় ও আদান-প্রদানের মাধ্যমেই সমৃদ্ধ ও আধুনিক হয়ে ওঠে। উপমহাদেশীয় শিল্প-সাহিত্যের কথা বাদ দিলেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রেও কথাটি সমভাবে প্রযোজ্য। অবশ্য কারও কারও মতে, এটি শুধুই এলিটদের উৎসব। এখানে একটি প্রশ্ন অনিবার্যভাবে না উঠে পারে নাÑ সাহিত্য কি আমজনতার জন্য, নাকি শুধু এলিট তথা সমাজের প্রাগ্রসর শ্রেণীর জন্য? এ নিয়ে বিতর্ক চলে আসছে দীর্ঘদিন থেকে এবং সমাজতান্ত্রিক সাহিত্য তথা গণসাহিত্যের প্রায় অবসানের পর এর কোন সহজ সদুত্তর পাওয়া মুশকিল। লিট ফেস্টে উচ্চারিত মন্তব্যও এ ক্ষেত্রে স্মরণ করা যেতে পারেÑ একজন লেখককে অবশ্যই সমাজসচেতন হতে হবে। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা না থাকলে ভাল লেখক, শিল্পী ও পরিচালক হওয়া যায় না। লিট ফেস্টের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে- বাংলাদেশের লেখকদের সঙ্গে বিদেশের লেখকদের জানাশোনার সুযোগ করে দেয়া এবং বিশ্ব অঙ্গনে বাংলাদেশের সাহিত্যকে তুলে ধরা। বিশ্বায়নের যুগে কূপম-ূক হয়ে ঘরে বসে থাকার সুযোগ নেই।

এই মাত্রা পাওয়া