১৮ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

‘ব্রিটিশ কারি’

এক সময়ে ইংরেজ উপনিবেশ বিশ্বব্যাপী সুবিস্তৃত হলেও এবং সেই সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত না গেলেও প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশ রন্ধন শিল্প বা কুলিন্যারি বলতে কিছু ছিল না। এমনিতে ইংলিশ ব্রেকফাস্ট সুখ্যাত হলেও লাঞ্চ ও ডিনারে সেদ্ধ খাবারই প্রচলিত ছিল প্রধানত। অধুনা ‘ব্রিটিশ কারি’ বলতে যা বোঝায় এবং যার সবিশেষ সুখ্যাতি রয়েছে ব্রিটেনসহ বিশ্বজুড়ে, তা মূলত বাংলাদেশীদের অবদান। সে দেশের কারি হাউসগুলো প্রধানত বাংলাদেশীদের পরিচালিত। মালিকানা থেকে শুরু করে শেফ বা বাবুর্চি এমনকি বয়-বেয়ারাও প্রায় সবাই মূলত বাংলাদেশী। ভারতীয় মালিকানায় কিছু হোটেল- রেস্তরাঁ থাকলেও ব্রিটিশ কারিতে ব্র্যান্ডিং ছাপ রয়েছে বাংলাদেশীদের। যে বা যারা কয়েক পুরুষ আগে ভাগ্যান্বেষণে পাড়ি জমিয়েছিলেন সে দেশে, তাদেরও আবার অধিকাংশই সিলেটী। কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তারা তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন ব্রিটেনের হোটেল-রেস্তরাঁগুলো। এর জন্য কম লাঞ্ছনা-গঞ্জনাসহ ত্যাগ-তিতিক্ষা করতে হয়নি বর্তমান প্রজন্মের পূর্ব পুরুষদের। এমনিতেই নাক উঁচু জাত বলে বিশ্বব্যাপী কুখ্যাতি রয়েছে ব্রিটিশদের। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ঔপনিবেশিক মনমানসিকতার। যে কারণে সেদেশের নাগরিকত্ব পাওয়া দুরূহ। ব্যবসা-বাণিজ্য তো ততোধিক দুঃসাধ্য। কেননা, দু’দুটো বিশ্বযুদ্ধ এবং সা¤্রাজ্য হারানোর পর ব্রিটিশ অর্থনীতি এমনিতেই দুর্বল ও রুগ্ন। বিশ্বমন্দা তো আছেই। এহেন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অভিবাসী বাংলাদেশীরা যে কি অপরিসীম পরিশ্রম ও ধৈর্যের বিনিময়ে সে দেশে গড়ে তুলেছেন ব্রিটিশ কারির রমরমা ব্যবসা-বাণিজ্য, যার সুখ্যাতি ও সমৃদ্ধির গল্প বর্তমানে বিশ্বজোড়া, তা ভাবতেও বিস্ময় জাগে বৈকি। লন্ডনের প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ানের ভাষ্যে জানা যায়, বাংলাদেশীদের নির্মিত ‘কারি শিল্প’ ব্রিটেনের অর্থনীতিতে রাখছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, বাজারমূল্যে যার পরিমাণ ৪ বিলিয়ন বা ৪০০ কোটি পাউন্ডের বেশি। ভাবা যায়!

এই কারি শিল্প ব্রিটেনে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের প্রধান অর্থনৈতিক মেরুদ-ও বটে। তবে রন্ধনশিল্পের এই স্বীকৃতি অর্জনের পথটি মোটেও মসৃণ ও সহজ ছিল না। ব্রিটিশ রসনায় ঝাল মোটেও রোচে না, অথচ বাংলাদেশী কারি, অধুনা যা ব্রিটিশ কারি হিসেবে ব্র্যান্ডিং পেয়েছে, মূলত ঝাল মসলানির্ভর। এই ঝাল বা হট রেসিপি শেষ পর্যন্ত জয় করতে সমর্থ হয়েছে সাহেবদের চিত্ত। বর্তমানে দলে দলে ব্রিটিশ আমজনতা তো বটেই, এমনকি খোদ প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রী-এমপি, বিরোধী রাজনৈতিক নেতা সর্বোপরি পর্যটকরা পর্যন্ত রাতদিন ঢুঁ মেরে থাকেন ব্রিটিশ কারির আস্বাদ নিতে। এসব হোটেল-রেস্তরাঁয় ঝাল মুরগি-মাটনের পোলাও-বিরিয়ানির পাশাপাশি এমন কি রুই- কাতল-বোয়াল-পাবদা মাছের আস্বাদ গ্রহণ করতেও পিছপা হন না সাহেব-মেমরা। ব্রিটিশ কারির এরকমই মাহাত্ম্য ও গৌরব যে, প্রতিবছর সেখানে অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে পালিত হয় ব্রিটিশ কারি এ্যাওয়ার্ড। ২০০৫ সাল থেকে প্রখ্যাত রন্ধনশিল্পী এনাম আলীর নেতৃত্বে পালিত হয়ে আসছে উৎসবটি। কারিশিল্পে অসামান্য অবদানের জন্য ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ স্বয়ং ২০০৯ সালে তাঁকে সম্মানিত করেন এমবিই খেতাবে। বর্তমানে ব্রিটিশ কারি এ্যাওয়ার্ড একটি গ্ল্যামারাস প্ল্যাটফর্ম, যা যুক্তরাজ্যের মূলধারার রাজনীতি, অর্থনীতি ও গণমাধ্যমের মধ্যে প্রবল একটি সম্প্রীতির সেতুবন্ধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।