২৪ জানুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রথম দিনেই সারাদেশে জমে উঠেছে আয়কর মেলা

প্রথম দিনেই সারাদেশে জমে উঠেছে আয়কর মেলা
  • রিটার্ন দাখিল করেছেন ৪৬ হাজার ৪০১ জন

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ প্রথম দিনেই সারাদেশে জমে উঠেছে আয়কর মেলা। উদ্বোধনের পর থেকে আয়কর রিটার্ন দাখিল ও ই-টিআইএন রেজিস্ট্রেশনের জন্য মেলায় ভিড় বাড়তে থাকে করদাতাদের। দুপুর না গড়াতেই করদাতাদের পদভারে মুখর হয়ে ওঠে বেইলি রোডের অফিসার্স ক্লাব প্রাঙ্গণ। মেলার প্রথমদিনেই সারাদেশে আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছেন ৪৬ হাজার ৪০১ জন। এছাড়া আয়কর আদায় হয়েছে ২১৮ কোটি ৪২ লাখ ৭৭ হাজার ৪৮ টাকা। মেলায় সেবা নিয়েছেন ১ লাখ ১৩ হাজার ৬৯৯ জন। যা গতবারের চেয়ে অনেক বেশি। ঢাকাসহ সকল বিভাগীয় শহর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও আয়কর মেলা জমে ওঠার খবর পাঠিয়েছেন জনকণ্ঠের স্টাফ রিপোর্টাররা। করদাতাগণ আয়কর মেলায় তাদের ২০১৮-১৯ করবর্ষের আয়কর রিটার্ন জমা দিতে পারছেন।

এর আগে মঙ্গলবার সকাল নয়টায় আনুষ্ঠানিকভাবে সপ্তাহব্যাপী আয়কর মেলার উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ওই সময় তিনি বলেন, জীবনমান উন্নত হচ্ছে বলেই এখন এ দেশের জনগণ কর দিচ্ছেন। মানুষ এখন লাইন ধরে কর দিচ্ছেন, এটাই এই সরকারের বড় সাফল্য। আগে ভয়ে কেউ কর দিতে সাহস পেত না, আর এখন স্বেচ্ছায় কর দিয়ে সম্মানিত হচ্ছেন। সবচেয়ে বড় বিষয় এ দেশের যুব সম্প্রদায় কর প্রদানে উৎসাহিত হচ্ছেন। তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর প্রদানে এগিয়ে আসছেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বিভিন্নভাবে দেশের প্রায় এক কোটি মানুষ কর দিচ্ছে। বর্তমানে অনেক ধরনের কর আছে, সবগুলো ধরলে এক কোটি মানুষ আজকে কর দেয় বলে এ ধরনের একটি তথ্য রয়েছে সরকারের কাছে। এটা অবশ্যই আমাদের কৃতিত্বের বিষয় যে, ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে এক কোটি করদাতা। তবে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের আমলে দেশের উন্নয়ন যেভাবে ধাবিত হচ্ছে, তাতে এক কোটি নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট নই।

মুহিত বলেন, এই এক কোটির সঙ্গে আরও কয়েক কোটি করদাতা যুক্ত হওয়া উচিত। অন্যত্র ৪ কোটি মানুষকে কর দেয়া উচিত। অর্থমন্ত্রী দাবি করেন, বর্তমান সরকারের সময়ে বিভিন্ন ধরনের নাগরিক সেবা বেড়েছে, মানুষের জীবনমানের প্রতিনিয়ত উন্নতি হচ্ছে। এখন বাংলাদেশের যেকোন জায়গায় আপনি ইচ্ছা করলে গাড়ি চালিয়ে চলে যেতে পারেন। এই সুযোগ ৩০ বছর আগেও ছিল না। এর ফলে অর্থনীতির গতি অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দেশের মানুষের মধ্যে বৈষম্য অনেক কমে যাচ্ছে। তিনি বলেন, বৈষম্য এখনও আছে, একেবারে দূর হয়নি। কিন্তু সেটা ব্যাপকভাবে কমে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এক সময় দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৭০ শতাংশ। তা এখন ২২ শতাংশে নেমে এসেছে।

প্রসঙ্গত, বর্তমানে সারাদেশে ৩৫ লাখ মানুষের আয়কর শনাক্তকারী নম্বর (টিআইএন) রয়েছে। তাদের মধ্যে আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন ২০ লাখ। আগামী দুই বছরে এই সংখ্যা বাড়িয়ে ৩৫ লাখ করার পাশাপাশি ই-টিআইএনধারীর সংখ্যা ৫০ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআর। দেশে এক সময় মাত্র সাত লাখ করদাতার কাছ থেকে আয়কর আদায় করা যেত। সেই সংখ্যা এখন বেড়ে ৩০ লাখের বেশি হয়েছে। কোন ব্যক্তি-করদাতার প্রতিবন্ধী সন্তান বা পোষ্য থাকলে প্রত্যেক সন্তান বা পোষ্যের জন্য তার করমুক্ত আয়সীমা ৫০ হাজার টাকা করে বাড়বে।

অর্থাৎ, কোন করদাতার একজন প্রতিবন্ধী সন্তান বা পোষ্য থাকলে তার করমুক্ত আয়সীমা হবে তিন লাখ টাকা। আর যাদের বার্ষিক আয় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার কম, তাদের কোন কর দিতে হবে না। অনুষ্ঠানের সভাপতি এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, দেশে আয়কর দেয়ার প্রবণতা বেড়েছে, কিন্তু তা এখনও জিডিপির ১০ শতাংশের কম। অথচ প্রতিবেশী দেশগুলোতেও এই হার ১৫ শতাংশ। তিনি বলেন, কর প্রদান এখন আর ভয়ের কোন কারণ নয়। ভয়ভীতির উর্ধে উঠে এসে মানুষ এখন কর দিচ্ছেন।

জানা গেছে, ঢাকাসহ সাত বিভাগীয় শহরে আয়কর মেলা চলবে ১৯ নবেম্বর পর্যন্ত। এছাড়া সব জেলা শহরে চারদিন এবং ৩২টি উপজেলায় দুই দিন মেলা হবে। পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ে ৭২টি গ্রোথ সেন্টারে’ একদিন ভ্রাম্যমাণ মেলা হবে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত মেলায় করদাতা, সম্ভাব্য করদাতা ও ভবিষ্যতের করদাতাদের জন্য ই-টিআইএন রেজিস্ট্রেশনের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি রিটার্ন গ্রহণ, কর পরিশোধ এবং কর বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। এবারের আয়কর মেলায় ঢাকার প্রতিটি কর অঞ্চলের জন্য পৃথক বুথ করা হয়েছে। করদাতাগণকে রিটার্ন পূরণে সহায়তা করার জন্য মেলায় হেল্প ডেস্ক খোলা হয়েছে। এছাড়া করদাতাগণ মেলায় স্থাপিত সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক বেসিক ব্যাংক লিমিটেডে তাদের আয়কর জমা দিতে পারবেন।

চট্টগ্রামে প্রথম দিনেই জমে উঠেছে আয়কর মেলা ॥ চট্টগ্রাম থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানান, সারাদেশের মতো চট্টগ্রামেও শুরু হয়েছে আয়কর মেলা। নগরীর জিইসি কনভেনশন হলে মঙ্গলবার সকালে সপ্তাহব্যাপী মেলার উদ্বোধন করেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন। প্রথমদিনেই করদাতা এবং আগ্রহীদের ভিড় পরিলক্ষিত হয়। একই ছাদের নিচে মিলছে আয়কর সংক্রান্ত সকল ধরনের সেবা। মেলায় কর বিভাগের কর্মকর্তারা এবং ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো।

চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন তার বক্তব্যে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা এবং উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে কর সংস্কৃতি গড়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। আয়কর মেলার উদ্বোধনী দিনে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য (কর আপীল ও অব্যাহতি) রওশন আরা আক্তার, কাস্টম এক্সাসাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট চট্টগ্রামের কমিশনার সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া, চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম, কর অঞ্চল-১ কমিশনার মোঃ মোতাহার হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক এমএ আক্কাস, ট্যাক্সেস আপীলাত ট্রাইব্যুনালের সদস্য সৈয়দ আবু দাউদ প্রমুখ।

আয়কর বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ করবর্ষে চট্টগ্রামে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৪ হাজার ৪শ’ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে আদায় হয়েছিল ১০ হাজার ১১২ কোটি টাকা। এরমধ্যে আয়কর মেলা ৩২ হাজার ৯৮৪টি রিটার্নের বিপরীতে আদায় হয় ৫২৯ কোটি ৭০ লাখ ৯৮১ টাকা। এবারের মেলায় আরও বেশি কর আদায় হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম আয়কর মেলায় একই ছাদের নিচে পাওয়া যাচ্ছে সকল ধরনের সেবা। বুথ স্থাপন করেছে সোনালী, জনতা ও বেসিক ব্যাংক। প্রথম দিনেই এই বুথ অভিমুখে করদাতাদের উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়। কর্মকর্তা কর্মচারীরা নিয়োজিত রয়েছেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে পে-অর্ডার প্রস্তুত কার্যক্রমে। মেলায় আগতদের মধ্যে একটি বড় অংশই তরুণ প্রজন্মের। তারা বিভিন্ন বিষয়ে জানবার চেষ্টা করছেন। অনেকেই সংগ্রহ করছেন নতুন টিআইএন নাম্বার। সাধারণ মানুষের মধ্যে করভীতি কমাতে এই উদ্যোগ গ্রহণ করে এনবিআর। প্রথম বছরে বিষয়টি অভিনব মনে হলেও ধীরে ধীরে আয়কর মেলা সাড়া ফেলতে শুরু করেছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের আয়ের উৎস খতিয়ে দেখার আহ্বান লিটনের ॥ রাজশাহী থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানান, সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের আয়ের উৎস খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের (রাসিক) মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। যারা সংসদ সদস্য নির্বাচন করতে মনোনয়নপত্র কিনেছেন, তাদের মধ্যে কতজন ইনকাম ট্যাক্স দেন, এটি খতিয়ে দেখতে কর বিভাগের কর্মকর্তাদের আহ্বান জানান লিটন। তিনি বলেন, ‘আসুন আমরা সবাই মিলে রাজশাহীকে গড়ি, দেশকে গড়ি, নিজ নিজ জায়গা থেকে অবদান রাখি, অবদান রেখে গর্ব করি আমি একজন ট্যাক্সদাতা, আমি দেশকে ট্যাক্স দেই। সেটা ৫ হাজার হোক, কিংবা ৫ লাখ বা ৫ কোটি। যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী এই গর্ব নিয়ে বাঁচতে চাই। এটিই হোক আজকের ব্রত, আজকের শপথ।’

মঙ্গলবার সকালে কর অঞ্চল রাজশাহী আয়োজিত কর মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, ১৮ কোটি মানুষের দেশে কেন মাত্র ৩৫ লাখ ট্যাক্সদাতা থাকবে ? কেন এটি এক কোটি ৩৫ লাখ হবে না, কেন এটি আড়াইকোটি হবে না ? উন্নত বিশে^ ৯৯ শতাংশ মানুষ ট্যাক্স দেয়, আমাদের তো ৯৯ শতাংশ মানুষের ট্যাক্স দেয়ার দরকার নেই, অন্তত ২৫ শতাংশ ট্যাক্স প্রদানকারী হোক।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের ট্যাক্স প্রদানের বিষয়টি খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়ে মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন বলেছেন, আওয়ামী লীগের ৪ হাজারেরও বেশি মনোনয়ন ফরম তুলেছেন, বিএনপি থেকে কত হাজার তুলবে, তাও জানা যাবে। দয়া করে যদি একটু খোঁজ নিয়ে দেখেন, তাহলে দেখবেন আমার বিশ^াস মনোনয়ন প্রত্যাশীদের ৫০ শতাংশেরও বেশি এক টাকাও ট্যাক্স দেন না। এদের ধরা দরকার। এখন সময় এসেছে এই সমস্ত দুরাচার অনাচার, জনবিশৃঙ্খলা, অনিয়ম, দুর্নীতি বন্ধ করার। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে সবদিকে আর নৈতিকতা হারিয়ে যাবে ? প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, দেশের উন্নয়ন হলেও আজকে তো নৈতিকতার দিকে উন্নয়ন হচ্ছে না। পরে কর মেলায় মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন নিজের ও তার সহধর্মীণী মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি সমাজসেবী শাহীন আকতার রেনীর ইনকাম ট্যাক্স প্রদান করেন। এরপর বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে কর মেলার উদ্বোধন করেন মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন।

এই মাত্রা পাওয়া