২৪ জানুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আবারও তাইজুলের স্পিন ভেল্কি

  • এনামুল জুনিয়র ও সাকিবের পর তৃতীয় বাংলাদেশী হিসেবে টানা ৩ ইনিংসে ৫ উইকেট

মোঃ মামুন রশীদ ॥ সিলেটে দেশের সবচেয়ে নয়নাভিরাম ভেন্যুতে সবার নজর নিজের ওপর কেন্দ্রীভূত করতে পেরেছিলেন তাইজুল ইসলাম। টেস্টে বাংলাদেশের বাজে হার এবং প্রকৃতির অপার নৈসর্গিক সৌন্দর্য থাকলেও এ বাঁহাতি স্পিনারের ঐন্দ্রজালে বিমোহিত হয়েছিলেন সবাই। ক্যারিয়ারে প্রথমবার উভয় ইনিংসে নিয়েছিলেন ৫ উইকেট। মিরপুর টেস্টে আগে ব্যাট করে বিশাল সংগ্রহ পাওয়ায় অনেকখানি ভারমুক্ত হয়ে বোলিং করতে পেরেছেন নাটোরের এ ২৬ বছর বয়সী। বাংলাদেশ দলও তার ওপর নির্ভর করেছিল। সেই আস্থার প্রতিদান দিয়ে আবারও ৫ উইকেট তুলে নিয়েছেন তিনি। ম্যাচের দ্বিতীয় দিনের শেষভাগে হ্যামিল্টন মাসাকাদজাকে শিকার করে শুরু, আর তৃতীয় দিনের শেষভাগে রেগিস চাকাভার উইকেট তুলে নিয়ে ক্যারিয়ারে ষষ্ঠবার ইনিংসে ৫ বা তার বেশি উইকেট নেয়ার কৃতিত্ব দেখালেন। মাঝে তিনি শিকার করেছেন ডোনাল্ড তিরিপানো, শন উইলিয়ামস ও সিকান্দার রাজার উইকেট। দেশের টেস্ট ইতিহাসে এনামুল হক জুনিয়র ও সাকিব আল হাসানের পর তৃতীয় বোলার হিসেবে টানা তিন ইনিংসে ৫ উইকেট শিকারের কীর্তিও গড়েছেন তিনি।

মিরপুর টেস্টে নামার আগে ২০ ম্যাচের টেস্ট ক্যারিয়ারে প্রথমবার উভয় ইনিংসে ৫ উইকেট শিকার করেছেন সিলেটে হওয়া সিরিজের প্রথম টেস্টে। ম্যাচেও প্রথমবার ১০ উইকেটের দেখা পেলেন। দুই ইনিংস মিলিয়ে তার ১৭০ রানের বিনিময়ে শিকার সংখ্যা ছিল ১১। ম্যাচে কোন বাংলাদেশীর ১০ বা তারচেয়ে বেশি উইকেট শিকারের সেটি সবেমাত্র পঞ্চম ঘটনা। তবে বোলিং ফিগারের শ্রেষ্ঠত্বে তাইজুলের অবস্থান মেহেদী হাসান মিরাজ ও এনামুল হক জুনিয়রের পরে। উভয়ে ১২ উইকেট করে শিকার করেছিলেন এক ম্যাচে। তবে ক্যারিয়ারে পঞ্চমবার ৫ উইকেট শিকারের মাধ্যমে প্রথমবার ম্যাচে ১০ উইকেট নেয়ার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন তাইজুল এবং বাকি দু’জনের চেয়ে ইকোনমি রেটেও ওপরে ছিলেন। এমন অসাধারণ নৈপুণ্যের পরও সিলেট টেস্টে দলকে জেতাতে পারেননি ব্যাটসম্যানদের চরম ব্যর্থতায়। ২০১৪ সালে টেস্ট ক্যারিয়ার শুরুর পর থেকেই এ ফরমেটের স্পেশালিস্ট স্পিনার হয়ে উঠেছিলেন তাইজুল। মাত্র ৮ মাস ক্যারিয়ার গড়াতেই ৩ বার ইনিংসে ৫ উইকেট নেন। এমনকি জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে ২০১৪ সালে ৩৯ রানে ৮ উইকেট শিকার করে দেশের পক্ষে সেরা টেস্ট বোলিং ফিগারের রেকর্ড গড়েন যা এখন পর্যন্ত অম্লান। তবে চতুর্থবারের মতো ইনিংসে ৫ উইকেট শিকার করতে তাইজুলকে লম্বা সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। ২০১৫ সালের এপ্রিলে খুলনায় পাকিস্তানের বিপক্ষে ৬ উইকেট নিয়েছিলেন প্রথম ইনিংসে। এরপর সাড়ে ৩ বছর ও ২৩ ইনিংস অপেক্ষার অবসান ঘটে এবার জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে চলমান টেস্টের প্রথম ইনিংসে। নেন ১০৮ রানে ৬ উইকেট। পঞ্চমবার ৫ উইকেট তুলে নিতে আর অপেক্ষায় থাকতে হয়নি। জিম্বাবুইয়ের দ্বিতীয় ইনিংসে আরও ভয়ানক হয়ে ৬২ রান দিয়ে নেন ৫ উইকেট। ক্যারিয়ারে প্রথমবার টানা দুই ইনিংসে ৫ উইকেট (এক ম্যাচে ১০) নেয়ার কীর্তি গড়েছিলেন।

ষষ্ঠবার ইনিংসে ৫ উইকেট নিতে বেশি অপেক্ষায় থাকতে হবে না সেটা বোঝাই যাচ্ছিল। কারণ, মিরপুরে দ্বিতীয় টেস্টেও তিনিই অন্যতম ভরসা। যেহেতু অন্যতম নির্ভরযোগ্য বোলার সাকিব অনুপস্থিত, তাই তাইজুলের জন্য সুযোগটা ছিল আরও উন্মুক্ত। আর মিরপুরের উইকেট বরাবরই স্পিনারদের উইকেট বিলিয়ে দিয়েছে উজাড় হাতে। দ্বিতীয় দিনের শেষভাগে ব্যাট করতে নামে জিম্বাবুইয়ে। পেসাররা দারুণ বোলিং করায় অবশ্য দিন শেষ হওয়ার কিছু আগে বোলিংয়ে এসেছিলেন তাইজুল। ৫ ওভার বোলিং করেই আতঙ্ক ছড়িয়েছেন মাত্র তিনটি মেডেনসহ ৫ রান দিয়ে তুলে নেন অধিনায়ক মাসাকাদজার গুরুত্বপূর্ণ উইকেট। তৃতীয় দিনের শুরুতেও তাইজুলই প্রথম আঘাত হানেন, ফিরিয়ে দেন নাইটওয়াচম্যান হিসেবে আগের দিন নামা তিরিপানোকে। এরপর একে একে উইলিয়ামস ও রাজাকে দ্রুত সময়ে বোল্ড করে সাজঘরে ফিরিয়ে দিয়ে বাংলাদেশকে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণে ফেরান। একেবারে শেষভাগে চাকাভার উইকেট তুলে নেন তিনি আর জিম্বাবুইয়ের ইনিংস শেষ হয়ে যায়। ১০৭ রানে ৫ উইকেট তুলে নেন তিনি। এজন্য অবশ্য ৪০.৩ ওভার বোলিং করতে হয়েছে তাকে। আগের ম্যাচের দুই ইনিংসে ৩৯.৩ ও ২৮.৪ ওভার বোলিং করে দিয়েছিলেন যথাক্রমে ১০৮ ও ৬২ রান। টানা তিনটি ইনিংসে ৫ উইকেট শিকারের এটি বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে মাত্র তৃতীয় ঘটনা। প্রথমবার টানা তিন ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন এনামুল জুনিয়র। তিনি ২০০৫ সালে সফরকারী জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে চট্টগ্রামে হওয়া প্রথম টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে ৬ উইকেট নেয়ার পর মিরপুর টেস্টের দুই ইনিংসে নিয়েছিলেন ৭ ও ৫ উইকেট। এরপর টানা তিন ইনিংসে ৫ উইকেট নেয়ার ঘটনা সাকিব ঘটিয়েছিলেন ২০০৮ সালে। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথম টেস্টে ব্লুমফন্টেইনে ১৩০ রানে ৫ উইকেট নেয়ার পর সেঞ্চুরিয়ন টেস্টে ৯৯ রানে ৬ উইকেট নেন। উভয় টেস্টে ইনিংস ব্যবধানে হেরে গিয়েছিল বাংলাদেশ, তাই দ্বিতীয় ইনিংসে বোলিং করার সুযোগ হয়নি সাকিবের। এর এক মাস পর ঘরের মাটিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মিরপুর টেস্টের প্রথম ইনিংসেই ৭০ রানে ৫ উইকেট তুলে নিয়েছিলেন সাকিব। সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি এবার তাইজুলও করলেন। সাকিবের অনুপস্থিতিটাই হয়তো তার সুযোগটা বাড়িয়েছে এমন কীর্তি গড়ার ক্ষেত্রে। তিনি বলেন, ‘উইকেট তেমন দ্রুততর হয়নি। গতকাল তীক্ষè বাঁক নিচ্ছিল, আজ সেটা ছিল না। আমি অনেক বেশি বোলিং করার সুযোগ পাচ্ছি। সাকিব ভাই থাকলে হয়তো আমার ওপর এত দায়িত্ব পড়ত না। আমি উপভোগ করছি।’ তাইজুল যে উপভোগ করছেন, তাতে বরং সুবিধাই হয়েছে বাংলাদেশের জন্য। সাকিবের অভাবটা অন্তত বোলিংয়ে সেভাবে অনুভব করছে না দল।

এই মাত্রা পাওয়া