১৮ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আয়কর মেলা

আয়কর প্রদানে বাংলাদেশের বহু মানুষের অনীহা একটি সর্বজনস্বীকৃত বিষয়। এ অনীহার জন্য দায়ী কিছুটা আয়কর ব্যবস্থাও। আয়কর বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হয়রানিও কম দায়ী নয়। সুনাগরিকরাও আয়কর প্রদানের বিদ্যমান পদ্ধতিতে অস্বস্তি বোধ করেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে আয়কর ব্যবস্থায় গতি আনার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হলেও পদ্ধতিগত জটিলতা এখনও পুরোপুরি দূর করা যায়নি। গত বছর আয়কর মেলার উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা বলেছিলেন, আয়কর রিটার্ন ফরমের অনেক কিছু তিনিও ভাল বোঝেন না। এ কারণে তাকেও মধ্যস্বত্বভোগী কর আইনজীবীদের শরণাপন্ন হতে হয়। অনেক সময় কর আইনজীবীরা কাগজপত্র ঠিক করতে কর অফিসের বাড়তি খরচের দোহাই দেন। প্রভাবশালী উপদেষ্টার দৃষ্টিতে কর প্রদানের পদ্ধতি কঠিন হলে সাধারণ করদাতাদের অবস্থা কী দাঁড়ায় তা সহজেই অনুমেয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান অবশ্য বলছেন, এর আগে আয়করের বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের ভয়ভীতি ছিল। মানুষ সহজে কর দিতে চাইতেন না। তাদের বিশ্বাস ছিল, কর দিতে এলেই এনবিআর কর্মকর্তারা ধরবেন, হয়রানি করবেন। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে বেশ কিছু উদ্যোগের কারণে করদাতাদের সেই মনোভাবের পরিবর্তন হয়েছে। ভয়ভীতি দূর হয়েছে। এখন অনেকেই স্বপ্রণোদিত হয়ে কর প্রদানে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। করদাতাদের সামাজিক মর্যাদা বাড়ানো হয়েছে। তাদের পুরস্কৃত করা হচ্ছে। এ কারণে কর প্রদানে সক্ষম এ রকম অনেক ব্যক্তি এখন এগিয়ে আসছেন। অবশ্য ২০০৮ সালে দেশে প্রথম আয়কর দিবস পালন শুরু হওয়ার পর বহু করদাতা কর বিষয়ে সচেতন এবং উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। আয়কর প্রদানের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। পাশাপাশি বেড়েছে আয়করদাতার সংখ্যাও। ২০১২ সালে দেশে আয়কর মেলা চালু হওয়ার পর প্রায় ৪৫ লাখ নাগরিক সেবা নিয়েছেন; যাতে এনবিআরের আয় হয়েছে সাড়ে দশ হাজার কোটি টাকার বেশি। মেলার প্রাঙ্গণে করদাতাদের ভিড় ক্রমশ উপচে পড়ার অবস্থা দেখা গেছে। মেলায় করদাতারা আয়কর রিটার্ন পূরণ করে জমা দেয়া ও প্রযোজ্য কর পরিশোধ করতে পারছেন। নতুন করে করের খাতায় নিবন্ধিত হয়ে কর শনাক্তকরণ নম্বর (ই-টিআইএন) নেয়াসহ সব ধরনের কর সেবা নেয়ার সুযোগ রয়েছে মেলায়। ঢাকাসহ অন্য বিভাগীয় শহরে এ মেলা চলবে সপ্তাহব্যাপী। আগামী দুই বছরে আয়কর রিটার্ন দাখিল করার সংখ্যা ৩৫ লাখে উন্নীত করার স্বপ্ন রয়েছে। বর্তমানে এই সংখ্যা ২০ লাখ। এ ছাড়া ই-টিআইএনধারীর সংখ্যা ৩৫ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৫০ লাখে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই মেলার মূল উদ্দেশ্য, করদাতা বাড়িয়ে দেশের উন্নয়নের জন্য সরকারের আয় বৃদ্ধি করা। গত কয়েক বছরে সরকারের আয় যেমন বেড়েছে তেমনি অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতায় এগিয়ে গেছে দেশ। আয় বাড়ায় নিজস্ব অর্থায়নে বাজেট প্রণয়নসহ পদ্মা সেতুর মতো বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। স্বীকার করতেই হবে, নাগরিকদের মধ্যে আয়কর দেয়ার প্রবণতা আগের চেয়ে বেড়েছে। তারপরও কর প্রদানের ব্যাপার জনগণের মধ্যে এখনও অনাগ্রহী হওয়ার কারণ খতিয়ে দেখা সঙ্গত। আয়কর বাড়ানোর জন্য এনবিআর এবং আয়করদাতাদের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক জরুরী। ভয়ভীতি দেখিয়ে আয়কর আদায়ের চেষ্টা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সফল হয় না। কর প্রদান পদ্ধতি আরও সহজ এবং যুগোপযোগী হলে করদাতার সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হবে। দেশের উন্নতি ও সমৃদ্ধির জন্য যা হবে ইতিবাচক। বাজেট বাস্তবায়ন করার জন্য করদাতার সংখ্যা বাড়ানোর বিকল্প নেই। এখন বিবেচ্য হওয়া উচিত কিভাবে করদাতার সংখ্যা বাড়ানো যায়। একালে রাষ্ট্রের আয়ের প্রধান উৎস হচ্ছে জনগণের দেয়া কর। আয়কর রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের ভূমিকা রাখে। দেশে করদাতাবান্ধব, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এর পরিধি বাড়াতে পুরো পদ্ধতিটি আরও সহজ করে আনা জরুরী। আয়কর মেলার তাৎপর্য অবশ্যই রয়েছে। এ থেকে সত্যিকারার্থে করদাতা সুফল যেন পায়, সেই আশাবাদ চিরায়ত।