১৮ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

উত্তরগণতন্ত্র ও আসন্ন নির্বাচন

  • অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান

ফিলিপ কটলার (Philip Kotler) আধুনিক মার্কেটিং-এর জনক। তিনি গত বছর ‘Democracy in Decline: Rebuilding Its Future’ নামে একটি বই প্রকাশ করেছেন। বইয়ে তিনি শিল্প-সাহিত্যের উত্তরআধুনিকতার (post modernism) মতো উত্তরগণতন্ত্রের কথা বলেছেন। আব্রাহাম লিংকনের গণতন্ত্রের সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য এবং জনগণের সরকার,’ সেই গণতন্ত্রের দিন আর নেই। কিংবা প্লেটোর গণতন্ত্রেরও ইতি ঘটেছে। প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নয়ন, বিশ^ায়ন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং কর্পোরেট পুঁজির প্রভাবসহ নানা কারণে গণতন্ত্র এখন তার সেই সনাতন সংজ্ঞার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বর্তমানে আমরা পোস্ট ডেমোক্রেসিতে অবস্থান করছি। কাজেই এখন সেই সনাতন গণতন্ত্রের অনেক অনুষঙ্গের কার্যকারিতা শেষ হয়েছে। সনাতন গণতন্ত্রে সভা, সমাবেশ, মিছিল, বিক্ষোভ, অবরোধের মতো কতগুলো কর্মসূচীর কথা বলা হয়ে থাকে। কিন্তু সেইসব কর্মসূচীরও কার্যকারিতা আর নেই। তবে গণতান্ত্রিক দেশে গণতন্ত্র চর্চার জন্য সভা, সমাবেশ, মিছিল করার সুযোগ দিতেই হবে। সভা-সমাবেশে নেতাকর্মীরা একত্রিত হন এবং বক্তব্য রাখেন। সমাবেশে বড়জোর কয়েক হাজার ও সর্বোচ্চ কয়েক লাখ লোক একত্রিত হতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তির সুবাদে সোশ্যাল মিডিয়া এবং গণমাধ্যমের ব্যবহার করে নেতাকর্মীদের বক্তব্য কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়। সমাবেশ করে বক্তব্য প্রচার করার চেয়ে মিডিয়াতে বলতে পারা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিরোধীরা ক্ষমতাসীন সরকারকে স্বৈরাচারী সরকার বলে আখ্যায়িত করে প্রকাশ্যে বক্তব্য রাখছে। এর মানে হলো ক্ষমতাসীন সরকারটি স্বৈরাচারী সরকার নয়। গণমাধ্যমে ক্ষমতাসীন সরকারকে স্বৈরাচারী সরকার বলতে পারার অর্থ সরকারটি স্বৈরাচারী সরকার নয়। বাংলাদেশেও স্বৈরাচারী সরকার বলা যায়। কিন্তু বিশ্বের কোন দেশে প্রকৃত স্বৈরাচারী সরকারকে স্বৈরাচারী সরকার বলার সুযোগ দেয়া হয় না। আমাদের দেশে বড় বড় সভা, সমাবেশ, হরতাল, অবরোধ, বিক্ষোভের মতো কর্মসূচীকে গণতন্ত্র বলা হয়। বর্তমানে গণতন্ত্র বলতেই বোঝানো হচ্ছে সভা, সমাবেশ আর নির্বাচন। কিন্তু আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সকল স্তরে যে গণতন্ত্র চর্চা হওয়ার কথা ছিল তা কিন্তু হচ্ছে না। বিভিন্ন স্তরে গণতন্ত্রের চর্চা না হওয়ার কারণে গণতন্ত্র এখন সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে মিটিং, মিছিল আর ভোটে। এক পক্ষ মনে করেন একটি সমাবেশ করা মানেই গণতন্ত্র আর অন্য পক্ষ ভাবছে সভা-সমাবেশকে ঠেকানোও গণতন্ত্র। আবার উন্নয়ন ও বিশ্বায়নের এই যুগে সমাবেশ করার লোক পাওয়াও খুব কঠিন এবং ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারপরও ছোট-বড় সকল দলকে সভা-সমাবেশ করতে দেয়া উচিত। যদি সভা-সমাবেশ করতে গিয়ে জনদুর্ভোগ, জনজীবন বিঘিœত এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি না ঘটে তাহলে সমাবেশ করতে দেয়া যায়। কিন্তু ২০১৫ সালের জানুয়ারির ৫ তারিখ থেকে মার্চের প্রায় ৩০ তারিখ পর্যন্ত তিন মাসব্যাপী দেশে অবরোধের নামে ধ্বংসযজ্ঞ, তা-বলীলা আমরা লক্ষ্য করেছি। দেশে মানুষ এখনও সেই ধ্বংসাত্মক কর্মকা- ভোলেনি। অবরোধ একটি সনাতন গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু অবরোধের নামে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা, রাস্তার গাছ কেটে ফেলা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জ্বালাও-পোড়াও কাম্য নয়। অবস্থাদৃষ্টে আমার মনে হয় আমাদের গণতন্ত্র চর্চার মধ্যে কতগুলো নতুন বিষয় লাগাতার অবরোধ, পেট্রোলবোমা ইত্যাদি প্রবেশ করেছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে নিয়েও ভয় রয়েছে। ঐক্যফ্রন্টে বিএনপি মূল দল, অন্যদের নেতা আছে, অনুসারী নেই। বিএনপি ঐক্যফ্রন্টেও আছে আবার ২০ দলীয় জোটেও আছে। সেখানে জামায়াত-শিবিরের অবস্থান কী? কাজেই তাদের সমাবেশের অনুমতি দেয়ার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সন্দেহের অবকাশ আছে। জাতীয় ঐক্যের মধ্যে জামায়াত-শিবির প্রবেশ করে সমাবেশের নামে বড় ধরনের অরাজকতা সৃষ্টির সুযোগ নিতে পারে। তবে পুলিশ প্রশাসনের দায়িত্ব হচ্ছে কোন দুষ্কৃতকারী এই রকম ঘটনা যেন না ঘটাতে পারে। এজন্য সার্বিক দায়িত্ব নির্বাচনকালীন সরকার তথা নির্বাচন কমিশনকেই নিতে হবে। সবাইকে সমান সুযোগ করে দেয়াও নির্বাচন কমিশনের কাজ।

যারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধু তথা বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের বিরোধিতা করেছিল তাদের আসলে রাজনীতি করার কোন অধিকার নেই। বাহাত্তরের সংবিধান এমন বিধান রেখেই করা হয়েছিল। কিন্তু সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সবার জন্য রাজনীতি উন্মুক্ত করা হয়। কিন্তু এর সঙ্গে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক হলো ধর্মাশ্রয়ী দলগুলো যারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, তাদের রাজনীতি করার সুযোগ করে দেয়া হয়। জামায়াতে ইসলামী আইডিএল নাম নিয়ে রাজনীতি শুরু করে, গোলাম আযমকে দেশে নিয়ে আসা হয়। জামায়াতে ইসলামী দলটিই আমাদের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। আমাদের সংবিধানের মূলনীতি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র এবং গণতন্ত্রের পরিবর্তন আনে সামরিক শাসকরা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জাতির মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন তৈরি হয়। কিন্তু আমি মনে করি এই জাতির বিভাজন শুরু হয়েছিল অনেক আগেই। ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই বাঙালীর বাঙালিত্বের বিরোধিতা ছিল। আমাদের ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা করা হয়েছিল। রবীন্দ্র সঙ্গীত, পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু করে বাঙালী অনুষঙ্গের সব কিছুর বিরুদ্ধে লোক ছিল। বাঙালিত্বের বিরুদ্ধে যেসব লোক ছিল তারা পরবর্তীকালে ’৭১ সালে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে সহায়তা করেছিল। আবার তারা সবাই ’৭৫-এর পর এক সঙ্গে ক্ষমতাসীন হয়। খন্দকার মোশতাক ঠিক একই ধারার। জিয়াউর রহমান তাদের রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন। সেই ধারারই ফসল বিএনপি। কিন্তু বিএনপি কী সেই ধারা থেকে সরে আসবে? বিএনপি হচ্ছে ধর্মাশ্রয়ী ভাবধারা, ভারত এবং হিন্দুদের বিরোধিতা, পাকিস্তানের সঙ্গে একাত্মতাবোধকারীদের একটি শক্তিশালী প্লাটফর্ম। কাজেই বিএনপি যদি সেই মেন্টাল সেট-আপ থেকে বেরিয়ে আসে তাহলে বিএনপির এখন যে অবস্থা সেটাও আর থাকবে না। তবে আওয়ামী লীগে কিছু সাম্প্রদায়িক লোক হয় তো ঢুকে গেছে। ধর্মনিরপেক্ষতায় পুরোপুরি বিশ্বাস করেন না এমন লোকও হয় তো আছে। কিন্তু দল হিসেবে কেবল আওয়ামী লীগেই লিখিতভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িক চেতনাসহ প্রগতিশীল মনোভাব বিদ্যমান, যা বিএনপির গঠনতন্ত্রে নেই। দুনিয়াতে যত সামরিক শাসক রাজনৈতিক দল তৈরি করেছিল তার কোনটি বেশিদিন টিকেনি। কিন্তু জিয়াউর রহমানের তৈরি এই বিএনপি দলটি ৩৫ বছর টিকে আছে একটি মতাদর্শের ওপর। আর সেই মতাদর্শ হচ্ছে ধর্মাশ্রয়ী বাঙালিত্ব ও ভারত বিরোধিতা এবং মুসলিম লীগ ঘরানার ভাবদর্শ ধারণ। এগুলো উপজীব্য করেই বিএনপি টিকে আছে। বিএনপিকে এই ভাবাদর্শ ধরেই টিকে থাকতে হবে। বিএনপি যদি ড. কামাল বা বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর মতো বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িকতা বা ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাদি বলা বা চর্চা শুরু করে তবে বিএনপি অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়বে।

লেখক : উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়