১৮ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পোলিশ দল দিকান্দার জিপসি সুরে মুগ্ধ শ্রোতা

পোলিশ দল দিকান্দার  জিপসি সুরে মুগ্ধ শ্রোতা
  • শুরু হলো ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত উৎসব

মনোয়ার হোসেন ॥ বিশাল প্রান্তরে বয়ে গেছে লোক ঐতিহ্যের প্রাণ প্রবাহ। লোকজগানের টানে সমাগম ঘটেছে বিপুলসংখ্যক সুররসিকের। সহজিয়া গানের সুরে আপ্লুত হয়েছে শ্রোতার অন্তর। শেকড়সংলগ্ন সেই মায়াবী সুরে ঝলমল করেছে উৎসব আঙিনা। অনাবিল আনন্দের হাতছানিময় সঙ্গীতায়োজনে রঙ্গিলা রূপ পেয়েছে যান্ত্রিক শহর ঢাকা। মাটির গানে পুলকিত হয়েছে অগণন সঙ্গীতানুরাগীর হৃদয়। দেশ-বিদেশের শ্রোতানন্দিত লোকসঙ্গীত শিল্পীদের পরিবেশনা ছড়িয়েছে মোহাচ্ছন্নতা। সুন্দরের ছবি এঁকে এভাবেই যাত্রা করল ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত উৎসব। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বনানীর বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে শুরু হলো তিন দিনের এই লোকগানের উৎসব। এদিন গান শুনিয়েছেন বাংলাদেশ, ভারত ও পোল্যান্ডের শিল্পীরা। প্রথম রাতে সব পরিবেশনাকে ছাপিয়ে জিপসি ধারার লোকজ সুরে অপার মুগ্ধতা ছড়িয়েছে পোলিশ লোকগানের দল দিকান্দা। মোহনীয় যন্ত্রসঙ্গীতের সঙ্গে অনবদ্য কণ্ঠসঙ্গীত আর নাচের মিশেলে দিকান্দার পরিবেশনাটি ছিল অনন্য। এছাড়া লোকগানের উৎসবে দৃষ্টিতে সুখ ছড়িয়েছে লোকজ সুরনির্ভর দেশের শিল্পীদের নৃত্য পরিবেশনা। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত চলে লোকজগানে সাজানো এ সঙ্গীতাসর। মেরিল নিবেদিত সান ফাউন্ডেশন আয়োজিত চতুর্থতম এ আন্তর্জাতিক সঙ্গীতায়োজনে অংশ নিচ্ছেন বাংলাদেশসহ সাত দেশের ১৭৪ জন কণ্ঠসঙ্গীত, যন্ত্রসঙ্গী ও নৃত্যশিল্পী।

বিকেল থেকেই সারি বেঁধে শ্রোতা প্রবেশ করেছে উৎসব আঙিনায়। পরের আখ্যানটি সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাতের। মৃত্তিকাসংলগ্ন গানে গানে দেশ-বিদেশের লোকঙ্গীত শিল্পীদের মনমাতানোর গল্প। শুরুতেই মঞ্চে আসে নৃত্যদল ভাবনা। দলপ্রধান সামিনা হোসেন প্রিমার পরিচালনায় এক মঞ্চে নাচ করে ৫৩ জন নৃত্যশিল্পী। প্রথমেই জনপ্রিয় লোকগান ‘সোহাগ চাঁদ বদনী ধ্বনি নাচো তো দেখি’ গানের সুরে নৃত্য পরিবেশন করে দলটি। এরপর ছিল রাঙ্গামাটি অঞ্চলের আদিবাসী নৃত্য পরিবেশনা। ভাবনার নাচ শেষ হয় রণনৃত্য রায়বেঁশে নৃত্য পরিবেশনার আশ্রয়ে।

তৃতীয় পরিবেশনায় মঞ্চে আসে পোল্যান্ডের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লোকগানের দল দিকান্দা। বলকান এবং জিপসির প্রভাবিত দলটির গানে শ্রোতারা খুঁজে পেয়েছে ইসরায়েল, কুর্দি, বেলারুশ, ভারতের লোকজ সুর। বেহালা, ট্রাম্পেট, পারকাশনের সঙ্গে ট্রাম্পেটের সুরে ইউরোপের প্রান্তিকজনের লোকগান ম্যাডিয়েভ্যাল এবং জিপসি ধারার গানে গানে শ্রোতাকে উন্মাতাল করে তোলে দলটি। কখনও চড়া সুর আবার কখনও কোমল সুরমাখা বাণীতে সঙ্গীতপিপাসুর কাছে গৌণ হয়ে যায় ভাষার দুর্বোধ্যতা। প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর দলটির গানের সমান্তরালে নাচের যুগলবন্দীতে পরিবেশনাটির আকর্ষণ বেড়ে যায় বহুগুণ। দিকান্দার একটি গানের বাণীতে উঠে আসে মেয়ের বিয়ের খুশিতে আনন্দ উদযাপনে বাবাকে শামিল হওয়ার আহবান। গায়িকা আনিয়া উইটযাক ভাঙা বাংলায় শ্রোতাদের প্রতি ভালোবাসা জানিয়ে বলেন, তোমারা বাংলাদেশীরা খুব ভাল। কথার পাশাপাশি উইটযাক গানে গানে বলছিলেন দুঃখ বেদনার কথা। আবার কখনও বলছিলেন, আমরা আমাদের পরিবারকে ভালবাসি। স্বামীকে, স্ত্রীকে, সন্তানদের ভালবাসি। এই ভালবাসার মধ্য দিয়েই আমরা বেঁচে থাকতে চাই, বাঁচি। আসুন সেই ভালবাসায় অবগাহন করি সুরে সুরে। তারপুরই আবার শুরু গান। দলপ্রধান আনিয়া উইটযাক গাওয়ার পাশাপাশি এ্যাকোর্ডিয়ান বাজিয়ে শোনান। দলটির অন্যদের মধ্যে কণ্ঠে ছিল কাসিয়া বগুশ, পারকাশনে ছিলেন দানিয়েল কাচমারযিয়েক, ক্লাসিকাল গিটারে পিওত্র রেইদাক, ডাবল বেসে যেগরযশ কলব্রেচকি, ট্রাম্পেটে সিমন বব্রস্কি এবং ভায়োলিনে ছিলেন আন্দ্রে ‘ফিস’ ইয়ারযাবেক।

দ্বিতীয় পরিবেশনা উপস্থাপন করেন মাতাল কবি রাজ্জাক দেওয়ানের শিষ্য নারায়ণগঞ্জের আবদুল হাই দেওয়ান। গুরুর কাছ থেকে হাফ মাতাল উপাধিপ্রাপ্তি এই শিল্পীর চড়া কণ্ঠের গানে রাঙিয়েছেন শ্রোতার মন। একতারা, দোতারার সঙ্গে বাঁশির শব্দধ্বনি তোলা সুরের সংযোগে ঝাঁকড়া চুল দুলিয়ে দুলিয়ে শিল্পী গেয়েছেন ‘বাজার ভাল না গো বন্ধু, বাজার ভাল না’, ‘মা গো মা জি গো জি/ পড়লাম কি রঙ্গে/ ভাঙ্গা নৌকা বাইতে আইলাম গাঙ্গে’, ‘তুই বড় রঙ্গিলা বাওয়াইরে, বাওয়াই কতই জাদু জানো’, ‘কোন বা দেশে রইলা দয়াল’, ‘বন্ধুরে তোর জ্বালায় বাঁচি না’, ‘তোমারও লাগিয়া রে বন্ধু’সহ একগুচ্ছ গান।

চতুর্থতম ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত উৎসবের উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন, ঢাকা ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী সৈয়দ মাহবুবুর রহমান ও গ্রামীণফোনের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা ইয়াসির আজমান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন আযোজক সান ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অঞ্জন চৌধুরী।

অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রকৃতিগতভাবেই বাংলার লোকসঙ্গীত যথেষ্ট সমৃদ্ধ ও ঐতিহ্যের দিক থেকেও অন্যদের তুলনায় বিশেষভাবে উন্নত। বর্তমান সময়ে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে লোকসঙ্গীত পেয়েছে নতুন মাত্রা। তাই দেশ ও দেশের বাইরে লোকসঙ্গীতকে ছড়িয়ে দেয়া এবং বাংলার তৃণমূল পর্যায় থেকে শেকড়ের শিল্পীদের তুলে আনার এক যুগান্তকারী সংযোজন ‘ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোকফেস্ট’।।

আসাদুজ্জামান নূর বলেন, মানুষ, প্রকৃতি, পৃথিবী, শেকড়ের রস এসবই আমাদের লোকসঙ্গীতের উপকরণ। লোকসঙ্গীতের এই উৎসবে তারুণ্যের স্রোত আমাকে অভিভূত করেছে। লোকসঙ্গীতের জয় হোক, তারুণ্য ও যৌবনের জয় হোক।

সাঈদ খোকন বলেন, বাংলাদেশের লোকসঙ্গীতের এই উদ্যোগ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ুক। লোকসঙ্গীতের মধ্য দিয়ে সারা বিশ্ব বাংলাদেশকে নতুন করে চিনুক এটাই এই উৎসবের কাছে আমার প্রত্যাশা।

অঞ্জন চৌধুরী বলেন, আমাদের লোকসঙ্গীত আমাদের ঐতিহ্য। আর এই ঐতিহ্যকে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দেয়ার দায়িত্বও আমাদের। আমাদের লোকগানের শিল্পীদের গান নানাভাবে বিভিন্ন মাধ্যমে পরিবেশিত হলেও তারা বঞ্চিত হয় সম্মানী থেকে। আমরা তাদের গানের সেই স্বত্বটা ফিরিয়ে দিতে চাই। আর সঙ্গীতের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা থেকেই তিনদিনের এই লোকসঙ্গীত উৎসবের আয়োজন।

উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা শেষে মঞ্চে আসেন ভারতের সাত্যর্কী ব্যানার্জী। ইউটিউব এবং এমটিভির কোক স্টুডিওয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে তিনি যে তুমুল জনপ্রিয়, তার প্রমাণ মিলল তার ঘোষণা হতেই। দর্শকদের হর্ষধ্বনির মধ্যেই তিনি প্রথমেই গেয়ে শোনান ‘আমার একলা নিতাই রে’। এর পর তিনি একে একে গেয়ে শোনান ‘দে দে পাল তুলে দে, আমি যাবো মদিনা’ ও ‘হেইয়ো হো’, ‘আমারে বাঙালী করেছো ভগবান’সহ কয়েকটি গান।

প্রথম দিনের শেষ পরিবেশনা নিয়ে মঞ্চে আসে ভারতের পাঞ্জাবের ওয়াদালি ব্রাদার্স। ভ্রাতৃদ্বয় গেয়ে শোনায়

‘তুঝে দেখা তো লাগা মুঝে অ্যায়সে, জ্যায়সে মেরি ঈদ হো গ্যায়ি’, ‘ম্যায় তো পিয়াসে ন্যায়না লাগা আয়ি’, ‘দামাদাম মাস্ত কালানন্দার’সহ কিছু গান। ওস্তাদ পূরণচন্দ্র ওয়াদালি ও পেয়ারেলাল ওয়াদালি ভ্রাতৃদ্বয় ভারতের সুফি সঙ্গীতের এক স্বনামধন্য নাম। পেয়ারেলাল ওয়াদালি গত ৮ মার্চ মারা যাওয়ার পরও দলটির নাম পরিবর্তন হয়নি। তার বদলে দলে যোগ দিয়েছেন পূরণচন্দ্র ওয়াদালি’র ছেলে ল²িণদার ওয়াদালি। তারা বুল্লে শাহ্, ফরিদ সাহেব জ্বি, শাহ্ হুসেইন জ্বি’র ভজন গেয়ে শ্রোতাদের মন জয় করেন।

আজকের উৎসবসূচি : আজ শুক্রবার উৎসবের দ্বিতীয় দিনের পরিবেশনা উপস্থাপন করবে লোকগানে বাংলার অহংকার মমতাজ এবং লোকগানের দল স্বরব্যাঞ্জো। এদিন আরো গাইবেন ভারতের দ্য রঘু দিক্ষিত প্রজেক্ট, যুক্তরাষ্ট্রের লস টেক্সমেনিয়াক্স এবং বাহরাইনের মাজায।

বরাবরের মতো এবারও ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত উৎসব সরাসরি সম্প্রচার করবে মাছরাঙা টেলিভিশন। এছাড়াও গ্রামীণফোনের অনলাইন ভিডিও স্ট্রিমিং সার্ভিস ‘বায়োস্কোপ লাইভ’-এ অনুষ্ঠানটি লাইভ দেখার সুযোগ থাকছে।