১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাদিয়া আফরিন ইবন নতুন উদ্যোক্তা

সমতাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে বাংলাদেশের নিরন্তর এগিয়ে যাওয়া দেশটির সবচেয়ে বড় অর্জন। সিংহভাগ জনগোষ্ঠী যদি সমৃদ্ধির অব্যাহত ধারায় সম্পৃক্ত হতে ব্যর্থ হয় তাহলে যথার্থ সাফল্য দৃশ্যমান হয় না। উন্নয়নের ক্রমবর্ধমান অভিগমনে নারীরা যেভাবে জোর কদমে প্রতিটি সূচকে তাদের অংশীদারিত্ব প্রমাণ করছে সেখানে পেশার ক্ষেত্রেও এসেছে সময়োপযোগী সংযোজন। যে শিক্ষকতা মহান পেশা হিসেবে সবচাইতে বেশি গ্রহণীয় ছিল দেশের এই অর্ধাংশের কাছে সেখানে যে কোন কর্মক্ষেত্রে নারীরা আজ যোগ্যতম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানেও নারীর অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। এক সময় সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানেও নারীদের সফল পদচারণা অর্থনীতির এই খাতকেও যথার্থ স্থানে নিয়ে গেছে। আর এখন নারীদের উদ্দীপ্ত চেতনায় এসেছে উদ্যোক্তা হওয়ার মতো অন্য রকম চ্যালেঞ্জিং কর্মপ্রবাহ। এমন একজন তৈরি হওয়া নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তার

সঙ্গে আলাপ চারিতায়- নাজনীন বেগম

সাদিয়া আফরিন ইবন। পিতা প্রাক্তন বিচারপতি কাজী এ.টি মনোয়ার উদ্দিন। মা আফরিনা মনোয়ার উদ্দিন সুগৃহিণীই নন আধুনিক সময়ের সঙ্গে তাল মেলানো একজন সফল নারীও। বাবা-মার তিন সন্তানের মধ্যে ইবন দ্বিতীয়। পারিবারিক নির্মল আবহে বড় হওয়া ইবন ছোট বয়স থেকে দেখেছে বিচারপতি বাবার পর্বতপ্রমাণ ব্যক্তিত্ব আর গাম্ভীর্য। কিন্তু মাকে চিনতে হয়েছে ভিন্নরূপে। মা সহজ, সরল, সদালাপিই শুধু নন নতুন সময়কে স্পর্শ করার একজন আধুনিক সময়ের পথিকও। বাবার সঙ্গে সেই ৭০-এর দশকে মা ইংল্যা-ে যান স্বামীর উচ্চশিক্ষার ডিগ্রী অর্জন করার লক্ষ্য নিয়ে। সে সময়ই মা গাড়ি চালানো শিখেছিলেন এবং বিদেশে চালাতেনও। এমন আধুনিক মায়ের মেয়ে ও অতি বাল্যকাল থেকে হরেক রকম ভাব কল্পনায় নিজেকে চালিত করার নেশায় মেতে উঠত। ফলে ছোট বয়স থেকে বিভিন্ন সুস্বাদু খাবার তৈরি করা ইবনের এক রকম সখই ছিল বলা যেতে পারে। তবে যা কিছুই করুক লেখাপড়ায় যোগ্য হতে না পারলে সমাজে নিজের অবস্থান শক্ত করা যাবে না। এই দৃঢ় বোধ ইবনকে তাড়িত করত। ফলে ভিকারুননিসা নূন স্কুল এ্যান্ড কলেজ থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করে বাণিজ্য বিভাগে। এরপর এশিয়ান ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ এবং এমবিএর ডিগ্রী অর্জিত হয়। ছোট কাল থেকে খাবার তৈরির পাশাপাশি ব্লক বাটিকের কাজ করেও ব্যক্তি জীবনের আশা-আকাক্সক্ষাকে ভরিয়ে তুলত। কারণ শুধু অর্থের জন্য ইবন নিজেকে নানারকম কাজের মধ্যে ডুবিয়ে রাখত না। কারণ সে আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের আদুরে কন্যা। সবই করত মনের তাগিদেই শুধু নয় নিজের দক্ষতা এবং ক্ষমতাকেও যাচাই করার মনোবৃত্তি নিয়ে। সাহসী, তেজী এবং স্বাধীনচেতা ইবন বরাবরই নিজের মতো করে যাপিত জীবনকে আনন্দময় করে তুলতে পছন্দ করত। প্রাতিষ্ঠানিক স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করা হলে কর্পোরেট জব করারও অদম্য বাসনায় একটি বেসরকারী সংস্থায় সিনিয়র সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে নিজের যথার্থ কর্মজীবনের শুভ সূচনা করে। ২০১০ থেকে-১৮ পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানে সফলতার সঙ্গে তার ওপর অর্পিত দায়িত্বকে সুষ্ঠুভাবে পালন করেও এক সময় নিজেকে অন্য অবস্থানে দেখার অভিপ্রায়ে প্রথম কর্মজীবনের অবসান ঘটায়। শুধু তাই নয় নতুন উদ্যোমে ব্যবসা বাণিজ্যের দিকে মনোযোগ দেয়। আর এখন থেকেই শুরু হয় তার অন্য এক জীবন লড়াই। অনিশ্চিত ব্যবসা বাণিজ্যের শুরুটা হয় অনেক ঝুঁকি আর আশঙ্কার মধ্য দিয়ে। নারী হিসেবে তো সেই শঙ্কা বেড়ে যায় অনেকখানি। তবে ইবন জীবনে যখন যাই করুন না কেন মা বাধাতো দেয়ইনি কখনও বরং সহযোগীর ভূমিকায় সব সময় পাশে দাঁড়িয়েছেন। মায়ের অকাতর স্নেহ আর অদম্য ভূমিকায় ইবনকে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে সবচাইতে প্রয়োজনীয় অবদানটি আগে দশ মাস দশ দিন যার জঠরে লালিত হয়েছিল তার কাছ থেকে। এমন অস্থির আর প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর কন্যাকে সামলানোর জন্য দরকার হয় ধীর, স্থির, ঠা-া মেজাজই শুধু নয়, এক অনমনীয় সহযোদ্ধার সার্বক্ষণিক সাহচর্য। এমন মা বাংলার ঘরে ঘরে থাকলে আমাদের পিছিয়ে পড়া মেয়েরা আরও তাড়াতাড়ি সামনে চলে আসত। এক প্রতিবেদনে উঠে আসে কন্যা সন্তানরা প্রথম নাকি নির্যাতন আর বঞ্চনার শিকার হয় গর্ভধারিণীর মায়ের কাছ থেকে। বিস্ময়কর হলেও এটাই সত্যি। শ্বশুরবাড়ি যাওয়া তো অনেক পরের ব্যাপার। কন্যাকে প্রথম পার্থক্যটি করা হয় তার ভাইয়ের সঙ্গে। শুধু তাই নয় পরের বাড়ি বউ করার লক্ষ্যমাত্রায় গৃহিণী করে তোলাও মায়ের অন্যতম দায়বদ্ধতা বলে অনেকেই মনে করেন। ব্যতিক্রমী কিছু মায়ের নজির সত্যিই আমাদের আশান্বিত করে যে মেয়েরা তাদের স্বাধীন মনোবৃত্তি নিয়ে বড় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

বর্তমানে ইবন মায়ের সর্ববিধ সহযোগিতায় নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে তার যে জীবনকে চালিত করছে সেখানে সে সফলভাবে এগিয়েও যাচ্ছে বলে অভিমত ব্যক্ত করে। তাঁর আকর্ষণীয় এবং নান্দনিক বস্ত্রসম্ভাব সবাইকে মুগ্ধও করে। বাহরি শাড়ি, থ্রীপিস, কুর্তি, ফতোয়ার হরেক রকম দর্শনীয় পণ্য সত্যিই নজর কাড়ার মতো। তার নিজস্ব শো-রুম বাসাতেই। অনলাইনেও এই কাপড় বিক্রির সমস্ত ব্যবস্থা সম্পৃক্ত করা আছে। শুরুতে ২/৩ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলেও এখন তা বেড়ে ১৩ লাখে পৌঁছেছে। তার এই নতুন ব্যবসাভিত্তিক কর্মজীবন সে উৎসাহ-উদ্দীপনা এবং আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করছে। আর এই নবতর উদ্যোগকে সে আরও সম্প্রসারিত করার দৃঢ় আশঙ্কা ব্যক্ত করে। জীবনটাকে দেখছে একেবারে নিজের মতো করে প্রচলিত ধারার কিছুটা ব্যতিক্রমেও। তবে অল্প বয়সের সেই সুস্বাদু খাদ্য আয়োজন আজও তার চেতনায় ভর করে আছে। পুনরায় সেই খাবারগুলোর আরও মান বৃদ্ধি করে সেখানেও নিজের কর্মক্ষমতাকে বিকশিত করতে চায় এই উদীয়মান নারী উদ্যোক্তা। বিচিত্র কর্মক্ষেত্রে নিবেদিত এই অসম সাহসী নারী উত্তরা লেডিস ক্লাবেও আনুষঙ্গিক ভূমিকা রেখে কাজের পরিধিকে সব সময় বাড়িয়ে যাচ্ছেন। এই নতুন উদ্যোক্তা আরও সফলতার সঙ্গে সামনে এগিয়ে যাক এই প্রত্যাশা সবার।