১৮ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শত বছরের প্যারামাউন্ট...

  • সুমন্ত গুপ্ত

ঐতিহ্য এবং ইতিহাসের দিক থেকে বিচার করলে কলকাতা শহরের গুরুত্ব চিরকালই অপরিসীম। এই শহরের অলিতে-গলিতে ঐতিহ্যবাহী এমন অনেক কিছু রয়েছে, যার গুরুত্ব এবং মর্যাদা বর্তমান যুগেও সমানভাবে বিদ্যমান। মধ্য কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে এমনই এক ঐতিহ্যবাহী শরবতের দোকান প্যারামাউন্ট কেএফসি, ম্যাকডোনাল্ডস, পিৎজা হাটের যুগেও যার চাহিদা বিন্দুমাত্র কমেনি আজও।

আজ আমি আর মায়ের কলকাতা ভ্রমণের তৃতীয় দিন সঙ্গে আমার বোন রোশনি। মামার বিটি রোডের বাসা থেকে বের হয়েছি ঘড়ির কাঁটাতে কলকাতা সময় বিকেল তিনটা। আকাশের মন ভাল নেই কিছু আগে কান্নাকাটিও করেছে তাই আমাদের ভ্রমণ পর্ব শুরু করতে কিছুটা বিলম্বই হলো। মামার বিটি রোডের বাসা থেকে বের হয়ে ট্যাক্সির জন্য অপেক্ষা করছি কিন্তু কোন ট্যাক্সির দেখা নাই। এই দিকে বেলা বয়ে যায় তাই অগত্যা আমাদের নতুন ভ্রমণ গন্তব্যে যাওয়ার জন্য বাসে উঠতে হলো। বাসে উঠে এত মানব জট দাঁড়ানোই দুষ্কর ঠিক আমাদের ঢাকার শহরের বাসের মতো। আমাদের অবশ্য বাসের জটে দাঁড়ানোর অভ্যাস আছে তাই আর আমাদের সমস্যা হলো না। ধীরে ধীরে বাসে মানুষের জট কমতে লাগল। তবে রাস্তায় অফিস ফেরত মানুষের জ্যামের জন্য বেশ সময় লাগল আমাদের গন্তব্যে পৌঁছতে। রোশনিকে বললাম আমরা কোথায় যাচ্ছি বললে না তো। ও বলল বলা যাবে না সারপ্রাইজ । আমরা কলেজ স্ট্রিটে এসে নামলাম। কলেজ স্ট্রিট আমাদের ঢাকার শাহবাগের মতো। সারা দিন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের ভিড় লেগেই থাকে বইয়ের দোকানগুলোতে। আমরা কলেজ স্ট্রিট পেরিয়ে এগিয়ে চলছি, নতুন পথ তাই রোশনিকে বললাম আমরা কোন্ পথে এগিয়ে যাচ্ছি ও বলল এটি বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে আমার পৌঁছে যাব আমাদের গন্তব্যে। বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিটের শেষ মাথায় দেখা পেলাম প্যারামাউন্ট শরবতের দোকানের। পুরনো আমলের ভবনের অবস্থিত অতি সাধারণ দোকান। ডেস্ক বেঞ্চ পাতা তবু ও মানুষের ভিড়। ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল এর ইতিহাস সমদ্ধ একটি বোর্ড। রোশনি বলল বাবার কাছে শুনেছি প্রায় ১০০ বছর আগে, বরিশাল থেকে কলকাতায় এসে শরবতের দোকান খোলেন প্রয়াত নীহার রঞ্জন মজুমদার। সেই দোকানের নাম ছিল প্যারাডাইস। ১/এ বঙ্কিম চ্যাটার্জী স্ট্রিট ছিল প্রথম ঠিকানা। খুব কম সময়ের মধ্যেই উত্তর কলকাতার বনেদী পরিবারের সিরাপ আর শরবত খাওয়ার নতুন ঠিকানা হয়ে উঠল এই প্যারাডাইস। আমজনতার মধ্যে তখনও দোকানে এসে শরবত খাওয়ার চল ছিল না। পরবর্তী কালে কলেজের ছাত্র থেকে বিপ্লবী যুবাদেরও আনাগোনা শুরু হয় প্যারাডাইসে। এমনকি বিপ্লবীদের গোপন নথিপত্রও আদান-প্রদান হতো এখানে। এর ফলেই তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের নজরে পড়ে গেল সংস্থাটি। নাম বদলিয়ে পাশেই ১/১/১ডি বঙ্কিম চ্যাটার্জী স্ট্রিটের ঠিকানায় শুরু হলো প্যারামাউন্টের যাত্রা। যা এখনও চলছে। ৯৭ বছর পার করে দোকান থেকে প্যারামাউন্ট হয়ে উঠেছে এক প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে এর কণর্ধার শ্রী মৃগেন মজুমদার, প্রয়াত নীহার রঞ্জন মজুমদারের উত্তরপুরুষ। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, মেঘনাদ সাহা, কাজী নজরুল ইসলাম থেকে শুরু করে সে সময়ের প্রায় সমস্ত মনীষীই এখানকার শরবতের স্বাদে মুগ্ধ হয়েছেন। সত্যজিৎ রায় যখন প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র ছিলেন, তখন তিনিও অনেকবার এই দোকানে এসেছেন। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ছিলেন বাঙালীদের মধ্যে ব্যবসার পথিকৃৎ। তিনি চাইতেন ব্রিটিশের গোলামি না করে বাঙালীরা ব্যবসায় আরও উদ্যোগী হন। তিনি নিজে যেমন বেঙ্গল কেমিক্যাল তৈরি করেছিলেন তেমনই অন্য উদ্যোগীদেরও সহায়তা করতেন। সেই সময়ে প্যারাডাইসের শরবতের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল। আচার্য রায়ের রেসিপিতে প্রথম বানানো হয় ‘ডাব শরবত’। যার মূল উপাদান ছিল ডাবের জল আর শাঁস। পাওয়া গেল সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে পুষ্টিকর পানীয়। এত বছর পেরিয়ে এসে এখনও প্যারামাউন্টের সুপারহিট আইটেম ডাব শরবত। কথা হলো প্যারামাউন্টের তৃতীয় প্রজন্মের বংশধর বৈশাখী সেনের সঙ্গে। আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি শুনে খুব খুশি হলেন। তিনি বললেন মূলত তিন রকম শরবত পাওয়া যায় এখানে। স্পেশাল ড্রিঙ্ক, ক্রিম বেসড ড্রিঙ্ক আর সিরাপ। স্পেশাল ড্রিঙ্কের মধ্যে পাওয়া যায় কোকো মালাই, পাইন্যাপেল মালাই, স্ট্রবেরি মালাই, রোজ মালাই, ভ্যানিলা মালাই, গ্রেপস ক্রাশ আর কোল্ড কফি। এ ছাড়া প্যাশন ফ্রুট আর ডাব শরবত ও ড্রিঙ্কের মধ্যে পড়ে। ক্রিম বেসড ড্রিঙ্কের মধ্যে রোজ, ব্যানানা, লেমন, অরেঞ্জ, পাইনএ্যাপেল, গ্রীন ম্যাঙ্গো, ভ্যানিলা উল্লেখযোগ্য। সিরাপের মধ্যেও পাওয়া যায়- রোজ, লেমন, অরেঞ্জ, গ্রীন ম্যাঙ্গো, লিচু এমনকি ট্যামারিন্ড বা তেঁতুলের সিরাপও পাওয়া যায়। এক গ্লাসের দাম ৪০ থেকে ১২০ টাকা মধ্যে। আমরা ডাবের শরবতও অর্ডার করি। ডাবের শরবত খেয়ে সত্যি তাক লেগে যায়। আহা! কী অসাধারণ স্বাদ! ডাবের জলের এ কী স্বাদ! সঙ্গে একটা বোর্ডে যেসব বিখ্যাত মানুষের পদধূলিতে ধন্য এই স্থান তাদের নামের তালিকা। আছে বিভিন্ন মণীষীর ছবি। টেবিলটপগুলো সেই সময়ের ইতালিয়ান মার্বেলের। সোমবার থেকে শনিবার সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকে প্যারামাউন্ট।