১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গোধূলিবেলায় সমুদ্র সৈকতে...

  • মোঃ মাসুদ হোসেন

শীতের পূর্বাভাসের নামই হেমন্ত! প্রকৃতির নিয়মে হেমন্ত নিয়ে আসে হিম হিম মৃদু কুয়াশার স্তর। আর এই মৃদু কুয়াচ্ছন্ন ভোরবেলা দুই বন্ধু মিলে রওনা দিলাম পর্যটন নগরী চট্টগ্রামের উদ্দেশে। ফোন দিলাম আমাদের আরেক বন্ধু চট্টগ্রামে অবস্থানরত বাপ্পীকে। মূলত আমরা তার দাওয়াতেই পর্যটন এই নগরীতে ভ্রমণ। ‘আনন্দ ভ্রমণ আর নিরাপদ জীবন’ বাংলাদেশ রেলওয়ে যোগাযোগ। এই চিন্তাকে মাথায় রেখে ভ্রমণের আগের দিন টিকেট সংগ্রহ করতে গিয়ে পড়তে হয়েছে স্মরণীয় এক বিরম্বনায়। টিকেটের জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আছি দীর্ঘক্ষণ। যাত্রাপথে প্রকৃতির মাঝে অনেক কিছুই শিক্ষা অর্জন করতে পারলাম। বাংলার অপরুপ সৌন্দর্য। তখন হেমন্ত ছিল, হেমন্তের স্নিগ্ধ এই সকালবেলায় কবি সুফিয়া কামালের একটি ছড়া মনে পড়ে গেল- সবুজ পাতার খামের ভেতর, হলুদ গাঁদা চিঠি লেখে, কোন্ পাথারের ওপার থেকে, আনল ডেকে হেমন্তকে?

যেতে যেতে জানালার ফাঁক দিয়ে পাহাড়ের মিলনমেলা দেখতে পেলাম। আরও একটা ঐতিহ্যের দেখা মিলল চলতি ট্রেনের মাঝে। চট্টগ্রামের মূল শহরে প্রবেশের আগেই সীতাকুণ্ড। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এ জায়গাটির গুরুত্ব অনেক। রামায়ণে বর্ণিত কাহিনীর অন্যতম পটভূমি সীতাকু-। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছেও এ স্থান কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এখানে রয়েছে একটি বৌদ্ধমন্দির। বৌদ্ধমন্দিরে গৌতম বৌদ্ধের পায়ের ছাপ রয়েছে। চন্দ্রনাথ মন্দিরটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীসহ সব মানুষের পছন্দের জায়গা। সেই সঙ্গে এই পাহাড়েই রয়েছে দেশের একমাত্র গরম পানির ঝরনা। চলতি পথে ক্ষণিকের এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখে হারিয়ে গেছি অজানা এক জগতে। ভালবাসতে শুরু করেছি বাংলার এই অপরূপ সৌন্দর্যকে। দীর্ঘক্ষণ এই সুন্দর জগতকে উপভোগ করার পর চলে এলাম আমাদের গন্তব্যে। ট্রেন থেকে নামার পর রিক্সা করে চলে গেলাম বন্ধু বাপ্পীর বাসায়। ওখানে ফ্রেশ হয়ে দেরি না করে তিন বন্ধু হাল্কা নাশ্তা করে লোকাল বাসে করে চলে গেলাম বাংলাদেশের দ্বিতীয বৃহত্তম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ওখানে গিয়ে বিমান দেখার জন্য টিকেট কেটে চলে গেলাম তিন তলায়। কিছুক্ষণ পর আকাশে দেখতে পেলাম ছোট্ট একটি বিমান ঘুরছে। আর এমন বিমান তো আমরা অহরহ দেখেই থাকি। ভাবলাম বিমানটি যদি নিচে নামত তাহলে সত্যিকারের বিমানের রূপ দেখতে পেতাম। যেই বলা সেই কাজ। কিছুক্ষণ পর ওই বিমানটিই খুব দ্রুত গতিতে বন্দরে নেমে আসল আর সেটিই বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইট। এত বড় বিমান জীবনে এই প্রথম বারের মতো দেখে ছবি তোলার লোভ আর সামলাতে পারলাম না আমরা কেউই। একটু পর দেখি আরেকটি বিমানের অবতরণ। এক এক করে অনেক বিমান অবস্থান নিয়েছে এই আন্তর্জাতিক বন্দরে। সময় স্বল্পতার কারণে চলে আসতে বাধ্য হচ্ছে আমাদের। এ রকম দৃশ্য দেখার সাধ কি আর মিটে? এখান থেকে বেরিয়ে একটি সিএনজি নিয়ে চলে গেলাম আমাদের মূল ভ্রমণ উদ্দেশ্য স্বপ্নের পতেঙ্গায়। এতদিন শুধু স্বপ্নই দেখে গেলাম।এবারা বাস্তবের পালা। সমুদ্রপ্রেমীদের কাছে দ্বিতীয় কক্সবাজার হচ্ছে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত। আর চট্টগ্রামের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র হচ্ছে এই সমুদ্র সৈকত পতেঙ্গা। আমরা ওখানে যেতে যেতে বিকেল গড়িয়ে গেল। সাগর পাড়ে গিয়ে দেখি পশ্চিম আকাশটা যেন লাল টিপ পরে বসে আছে। এ সময়ের সুন্দর এ দৃশ্য যে কোন পর্যটককে আকৃষ্ট করবে। সাগরের পানিতে গোসল আর দুষ্টমির কথা মাথায় রেখে বাড়তি জামা কাপড় নিয়েই রওনা দিয়েছি আমরা। সঙ্গে ছিল আনন্দ করার জন্য একটি ক্রিকেট বল। তিন বন্ধু নেমে পড়লাম সাগরের লোনা পানিতে। উপভোগ করলাম অফুরন্ত আনন্দ। সেই সঙ্গে ছিল অগণিত সেলফি। সাগরের পানিতে দুষ্টমি করতে করতে চারদিক অন্ধকার হতে থাকল আর প্রকৃতিও যেন নীরব ভূমিকা পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমরা আমাদের আনন্দকে বিদায় জানিয়ে তীরে উঠে ভেজা পোশাক পরিবর্তন করে ওখান থেকে যা জানতে পারলাম, বিকেল গড়াতে থাকলে জোয়ার আসতে শুরু করে। জোয়ার শুরুর আগে বাঁধ অনেকটা তলিয়ে যায়। তীরে এসে পড়ে ঢেউ। জোয়ারের সময় ঢেউয়ের আঁচড় যেন নয়নাভিরাম দৃশ্যের অবতারণা করে। আর এখানে সবচেয়ে ভাল লাগবে সন্ধ্যার পরিবেশ। সন্ধ্যার দিকে সূর্যাস্তের দৃশ্য মনকে আরও বেশি পুলকিত করবে। এটি পুরোপুরি একটি বালুকাময় সমুদ্র সৈকত। এ ছাড়া রয়েছে সমুদ্রে ঘুরে বেড়ানোর জন্য স্পিড বোট, সমুদ্র তীরেই ঘুরে বেড়ানোর জন্য সি-বাইক এবং ঘোড়া পাওয়া যায়। এ জন্য অবশ্য আপনাকে নির্দিষ্ট ভাড়া গুনতে হবে ঘণ্টাপ্রতি হিসেবে। সৈকতের বার্মিজ মার্কেট যে কোনো পর্যটককে টেনে নিয়ে যাবে প্রিয়জনদের জন্য কিছু একটা হলেও নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমরাও পছন্দমতো কেনাকাটা করে বিদায় নিলাম স্বপ্নের সেই সমুদ্র সৈকত পতেঙ্গা থেকে।

কীভাবে যাবেন : সড়কপথ, রেলপথ ও বিমান পথ তিনিটি মাধ্যমেই পতেঙ্গা আসা যায়। এ জন্য আপনাকে প্রথমে চট্টগ্রাম আসতে হবে। শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত। শহরের যে কোন স্থান থেকে রিজার্ভ সিএনজি নিতে পারেন।বাসের গায়ে লেখা দেখবেন ‘সি বিচ’ লেখা আছে। ওই সব বাসে উঠলেই আপনাকে নামিয়ে দেবে পতেঙ্গা সি বিচ গেটে।