১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সম্ভাবনার ফটিকছড়ি

  • শাহাব উদ্দিন মাহমুদ

(গতকালের পর)

ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থান ॥ ফটিকছড়িতে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার মতো রয়েছে বহু প্রাচীন স্থাপত্য। যেগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। ভিন্ন মাত্রার এসব পুরনো স্থাপত্য ও ভিন্ন কারুকার্যের এসব স্থাপনা দেখে সত্যিই মনকে জাগিয়ে তোলার অনুপ্রেরণা যোগায়। মাইজভান্ডার দরবার শরীফ শত বছরের ঐতিহ্য বহন করে চলছে। এখানে অত্যন্ত নজরকাড়া কারুকার্যে প্রখ্যাত অলি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (র), হযরত মাওলানা গোলামুর রহমান (র) ও বিশ্ব অলি শাহেন শাহ সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী (র)-এর মাজার শরীফ অবস্থিত। প্রতি বছর উরস শরীফে লাখ লাখ ভক্তের সমাগম ঘটে। এ ছাড়াও প্রাচীন নিদর্শনাদি ও প্রত্নসম্পদগুলোর মধ্যে কোম্পানি টিলা, আহসানউল্লাহ গোমস্তার মসজিদ, কোটেরপাড় বৌদ্ধবিহার, আবদুল্লাহপুর বৌদ্ধবিহার, নানুপুর কালীবাড়ি মন্দির ইত্যাদি। এ ছাড়া দু’শ’ বছরের অধিক পুরনো অসংখ্য মসজিদ ও ইসলামী স্থাপত্যসমৃদ্ধ শিল্পকলা রয়েছে।

মাল্টা চাষে বিপ্লব ॥ ফটিকছড়িতে মাল্টা চাষ করে দারুণ সাফল্য পেয়েছেন দাঁতমারা ইউনিয়নের নিচিন্তা গ্রামের মোহাম্মদ ইউনুছ। ফটিকছড়ির পাহাড়ী এলাকার জলবায়ু উষ্ণ, উর্বর মাটিতে মাল্টার ফলনও ভাল হয়। তাই ওই জনপদে মাল্টা চাষ করে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন আজ আর স্বপ্ন নয়, বাস্তব উদাহরণ। তার মাল্টা বাগানের উৎপাদন দেখে এলাকায় প্রায় আরও শতাধিক মাল্টা বাগান গড়ে উঠেছে। হেয়াকো-ফটিকছড়ি সড়কের গজারিয়া খালের পাশেই নিচিন্তা গ্রামে অবস্থিত তার সমন্বিত খামার ‘ইউনুছ এগ্রো ফার্ম।’ মাল্টার পাশাপাশি সেখানে তিনি চাষ করছেন উন্নত জাতের কমলা, আম, লেবু, কলা ও পেঁপে। রয়েছে হাঁস, কবুতর এবং ছাগলের খামার। পরীক্ষামূলকভাবে পালন করছেন টার্কি মোরগ। তার দেখানো পথে তৈরি হচ্ছেন নতুন নতুন কৃষি উদ্যোক্তা। সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান। ২০১৩ সাল থেকে তিনি মাল্টার চাষ শুরু করেছিলেন। হেয়াকো-ফটিকছড়ি সড়কের পাশে অবস্থিত তার মাল্টা বাগানের তিন দিকেই রয়েছে ছড়া। নিবিড় পরিচর্যা কৃষিবিদদের পরামর্শে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে এ বছর প্রায় ৩৫ টন মাল্টা উৎপাদনের স্বপ্ন দেখেন সফল এ কৃষি উদ্যোক্তা। যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৪৫ লাখ টাকা। দৃষ্টিনন্দন মাল্টা বাগানটি ফটিকছড়ি উপজেলার দাঁতমারা ইউনিয়নের রাবার বাগানের পাশে অবস্থিত। ইতোমধ্যে ইউনুছ মাল্টা চাষের জন্য ফটিকছড়ি উপজেলা পর্যায়ে উদ্যোক্তা ও সফল চাষীর পুরস্কার পেয়েছেন। বর্তমানে তাদের ৮ একরের বাগানে মাল্টা গাছ রয়েছে দুই হাজার। এর মধ্যে ফলন দিচ্ছে ৮০০টি গাছ। মাল্টা ছাড়াও তার বাগানে ১০০ কমলা গাছ, ১০০০ উন্নতজাতের কলাগাছ, ২৮০টি আম্রপালি আমগাছ ৩৫০টি লেবুগাছ রয়েছে। এ ছাড়া বরই (কুল), আখ, নারিকেলসহ বিভিন্ন ফলদ গাছ রয়েছে। যেগুলোতে ফলনও হচ্ছে। তার বাগানে উৎপাদিত মাল্টা গাছের মধ্যে সর্বোচ্চ একটি গাছে ১৯ হাজার টাকার মাল্টা বিক্রি হয়েছে। গড়ে একেকটি গাছ থেকে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকার মাল্টা বিক্রি হয় বছরে। প্রতি বছর বিদেশ থেকে মাল্টা আমদানি করার ফলে বিপুল অঙ্কের টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। তার মাল্টা বাগান বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি দেশের কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করেন তিনি।

প্রায় ২শ’ বছর পূর্বে ব্রিটিশ শাসনকালে সৌখিন ব্রিটিশরা এদেশে চা শিল্প গড়ে তুলেছিলেন। সেই সুবাদে পাহাড়বেষ্টিত বৃহত্তর ফটিকছড়িতে এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম কর্ণফুলী চা বাগান, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী অপরূপ দর্শনীয় স্থান রামগড় চা বাগানসহ ১৭টি চা বাগান এবং এসব চা বাগানকে কেন্দ্র করে উত্তর চট্টগ্রামের বৃহত্তম উপশহর ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র নাজিরহাট পর্যন্ত রেললাইন গড়ে উঠেছিল। কালের পরিক্রমায় রেল লাইনটি হেঁয়াকো পর্যন্ত সপ্রসার নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম-নাজিরহাট রেললাইন হেঁয়াকো পর্যন্ত সম্প্রসারণ করলে এতদঅঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পাশাপাশি পর্যটন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। স্বাধীন বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিক হিসেবে আমরা যখন দেখি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ঈর্ষণীয় সাফল্য বিশেষ করে জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, দারিদ্র্যের হার ৪০ থেকে ২২ ভাগে নামিয়ে আনা, শিক্ষার হার ৪৯ থেকে ৭২.৩ ভাগে উন্নীতকরণ, বিদ্যুত সুবিধার আওতায় ২৭ ভাগ থেকে ৯০ ভাগ জনগোষ্ঠীকে নিয়ে আসা, তথ্যপ্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে ১৩১ মিলিয়ন জনগোষ্ঠীকে ইন্টারনেট সুবিধার আওতায় আনা, মাথাপিছু আয় ১৬০৩ ডলারে উন্নীতকরণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম, রফতানি ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম, বৈশ্বিক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতি সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ৭.৬৫ শতাংশের ওপরে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। ফটিকছড়ি উপজেলা বাংলাদেশের বিচ্ছিন্ন কোন জনপদ নয় যে শেখ হাসিনার উন্নয়নের ছোঁয়া একেবারেই লাগেনি! তবে আয়তন ও জনসংখ্যা অনুপাতে কর্মসংস্থানের জন্য শিল্পাঞ্চল গড়ে ওঠেনি। ব্যক্তি মালিকানায় এগ্রোফার্ম চা, রাবার বাগান লিজ দিয়ে সরকার প্রতি বছর বিশাল অঙ্কের রাজস্ব আয় করলে ও সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা হতাশাজনক। বিস্তীর্ণ বনভূমি, কাঠ, চিমুতাং গ্যাসফিল্ডের গ্যাস, চা, চামড়া, বাঁশ, বেত, রাবারসহ বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর ফটিকছড়ির অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানা, বিসিক শিল্পনগরী ‘বিশেষ অর্থনৈতিক জোন, স্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে।

(সমাপ্ত)

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক

sumahmud78@gmail.com