১৮ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অবাধ সুষ্ঠু ভোটের জন্য আপনাদের সহযোগিতা চাই

  • সম্পাদকদের সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের মতবিনিময়

স্টাফ রিপোর্টার ॥ দুর্নীতির মামলায় বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়া কারাগারে। দলের গঠনতন্ত্র সংশোধন করে যাকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তিনিও দ-িত, পলাতক। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি ড. কামালের নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট আসন্ন সংসদ নির্বাচনে জিতলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন- রাজনীতির মাঠে এ নিয়ে বেশ ক’দিন ধরে এমন তুমুল আলোচনার মধ্যে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সঙ্গত কারণেই প্রশ্নের জবাবের অপেক্ষায় ছিলেন অনেকে।

শুক্রবার রাজধানীর হোটেলে লেকশোরে ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের সঙ্গে প্রিন্ট মিডিয়া সম্পাদকদের মতবিনিময়েও প্রশ্নটি উঠেছে। জবাবে ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মতামতের ভিত্তিতেই প্রধানমন্ত্রী নির্ধারণ করা হবে। সভায় অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য গণমাধ্যম সম্পাদকদের সহযোগিতা চান ড. কামাল। পাশাপাশি নির্বাচনে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে সম্পাদকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। বৈঠকে সাংবাদিকরা ঐক্যফ্রন্টকে নির্বাচনে থাকার পরামর্শ দিয়ে বলেন, গণতন্ত্রের স্বার্থে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টকে কোন অবস্থাতেই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো ঠিক হবে না। নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রয়োজনে সাক্ষাতেরও পরামর্শ দেন তারা।

মতবিনিময়কালে সন্ধ্যায় প্রথমে হোটেল থেকে বের হন আমাদের অর্থনীতি সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খান। তিনি জানান, মতবিনিময়ে বিডিনিউজের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী এ প্রশ্নটি করেন। খালিদী বলেছেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এ ধরনের জোট করে নির্বাচন করলে সরকার প্রধান কে হবেন সেটি আগে জনগণকে জানানো উচিত। কেননা জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। পছন্দ-অপছন্দের বিষয় রয়েছে।

জবাবে ঐক্যফ্রন্ট আহ্বায়ক ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল বলেন, ‘নির্বাচনে বিজয়ী হলে যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবে তদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতেই প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করা হবে। তিনি বলেন, বিজয়ী হলে জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বসেই ‘প্রধানমন্ত্রী’ পদের জন্য নেতা ঠিক করবে। বৈঠক থেকে বের হয়ে তৌফিক ইমরোজ খালিদী সাংবাদিকদের বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, আমি এ প্রশ্ন করলেও জবাব পাইনি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গণমাধ্যমের সম্পাদকদের সঙ্গে মতবিনিময় করলেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড. কামাল। এরপর ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সম্পাদকদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন ঐক্যফ্রন্ট নেতারা।

মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, হলিডে সম্পাদক সৈয়দ কামালউদ্দিন, সাংবাদিক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ, মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, নিউএজ সম্পাদক নুরুল কবীর, আমাদের নতুন সময়ের সম্পাদক নাইমুল ইসলাম খান, ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক জাফর সোবহান, দিনকাল সম্পাদক রেজোয়ান সিদ্দিকী উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়া বাংলাদেশ প্রতিদিনের আবু তাহের, বাংলাদেশের খবরের সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন, ইনকিলাবের মুন্সি আবদুল মান্নান, নিউজ টুডের মোসলেম উদ্দিন আহমেদ, ডেইলি স্টারের সাখাওয়াত হোসেন লিটন, যুগান্তরের মাসুদ করীম, সমকালের লোটন আকরাম, সাপ্তাহিকের গোলাম মোর্তজাসহ বিভিন্ন সংবাদপত্রের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা মতবিনিময়ে অংশ নেন। ভয়েস অব আমেরিকার আমীর খসর, রয়টার্সের সিরাজুল ইসলাম কাদির, এএফপির শফিকুল আলমও উপস্থিত ছিলেন মতবিনিময় অনুষ্ঠানে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন এ বৈঠকে বিভিন্ন বিষয়ে সাংবাদিকদের মতামত শোনেন এবং প্রশ্নের উত্তর দেন। তবে সভায় ঐক্যফ্রন্টের নেতারাও কম বেশি আলোচনায় অংশ নেন। তারা দেশের গণতন্ত্রের স্বার্থে চলমান আন্দোলনে গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করেন।

জোটের নেতাদের মধ্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, জেএসডির আসম আবদুর রব, তানিয়া রব, গণফোরামের মোস্তফা মহসিন মন্টু, সুব্রত চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার সুলতান মোঃ মনসুর আহমেদ উপস্থিত ছিলেন মতবিনিময়ে। এছাড়া গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি জাফরুল্লাহ চৌধুরী, বিএনপির আসদুজ্জামান রিপন, শামা ওবায়েদসহ ফ্রন্টের শরিক নেতারাও ছিলেন।

গত ১৩ অক্টোবর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর গণমাধ্যমের সম্পাদকদের সঙ্গে এই প্রথম বসলেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। নির্বাচন সামনে রেখে তার নেতৃত্বে গঠিত এই সরকারবিরোধী মোর্চায় বিএনপির পাশাপাশি জেএসডি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, নাগরিক ঐক্য, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়াও রয়েছে। এর আগে গত ১৮ অক্টোবর ঐক্যফ্রন্টের যাত্রা শুরু হয়।

মতবিনিময় শেষে ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য আমরা সম্পাদকদের পরামর্শ চেয়েছি। তারা বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দিয়েছেন। আমরা তাদের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেছি। তারা যৌক্তিক যে কোন বিষয়ে সহযোগিতা করবেন বলে জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, সম্পাদকরা বলেছেন, সরকারের যেমন কর্তব্য আছে, আমরা যারা নির্বাচন করতে যাচ্ছি, সেসব দলেরও কর্তব্য আছে পরিবেশ রক্ষা করার। অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন যেন হয়। অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে সতর্ক থাকতে হবে, যেন জনগণ সত্যিকার অর্থে নির্ভয়ে স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে এবং নির্বাচন যেন অবাধ এবং নিরপেক্ষ হয়। আজকের বৈঠক আমাদের জন্য খুব মূল্যবান বলে মনে করি। সরকারের যেসব বিষয় আমরা চিহ্নিত করেছি, সেসব ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে।’

প্রায় দু’ঘণ্টা সম্পাদকদের সঙ্গে এ মতবিনিময় পর্ব চলে। বিকেল সোয়া ৩টার দিকে এ মতবিনিময় শুরু হয়। সেখানে সম্পাদকরা বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন রাখেন। ঐক্যফ্রন্ট নেতারা সেসবের জবাব দেন। পরে ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে আলোচনা হয়েছে। বিজ্ঞ সম্পাদকরা যেসব মতামত দিয়েছেন, তা চলার পথে আমাদের কাজে লাগবে।

তিনি আরও বলেন, সম্পাদকরা বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিষয়ে আমরা তাদের থেকে জোরালো ভূমিকা ও সব রকমের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি। তারাও আমাদের অনেক বিষয়ের সঙ্গে যেমন একমত হয়েছেন, বেশ কিছু বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করে মতামত দিয়েছেন বলে জানান ফখরুল।

বৈঠক থেকে বেরিয়ে সাপ্তাহিক সম্পাদক গোলাম মোর্তুজা বলেন, ‘মতবিনিময় অনুষ্ঠানে অনেক সাংবাদিক পরামর্শ দিয়েছেন নির্বাচনে থাকতে হবে। নির্বাচনে সমান সুযোগ তৈরির করার জন্য প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট দেখা করতে পারে। দেখা করার সুযোগ আছে, বারবার যেতে পারবেন।’

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট জানিয়েছে, বিএনপিসহ তাদের অনেক নেতাকর্মী গ্রেফতার আছে ও গ্রেফতার হচ্ছে, সেগুলো যেন গণমাধ্যম তুলে ধরে, সে ব্যাপারে তারা সহযোগিতা চেয়েছে’ বলে জানান গোলাম মোর্তুজা।

তিনি বলেন, সম্পাদকরা বলেছেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট হয়তো অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে রয়েছে। কিন্তু তারা যেন শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকে। আগামীর বাংলাদেশের জন্য নির্বাচনে থাকাটা জরুরী। গণমাধ্যম বিশেষ কারও পক্ষে নয়, বরং প্রকৃত সত্য উপস্থাপনের চেষ্টা করবে।

সাংবাদিকদের নাইমুল ইসলাম খান বলেন, ‘মতবিনিময়ে আমার প্রশ্ন এবং বক্তব্য ছিল, ঐক্যফ্রন্টের যে জনসভাগুলো হয়েছে, সেখানে আমি দেখেছি যে, পবিত্র কোরান, বাইবেল, গীতা ও ত্রিপিটক পাঠ করা হয়। এছাড়া, বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতার বিষয়ে নিয়ে আলোচনা হয়। এগুলো তাদের ঐক্যবদ্ধ চিন্তার ফল কিনা? এগুলোতে সবাই একমত কিনা? এছাড়া, আমি উনাদের কাছে জানতে চেয়েছি, ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড এবং ২১ আগস্টের বিষয়ে কোন ঐক্যবদ্ধ চিন্তা আছে কিনা? আর এগুলো নির্বাচনের আগে আমাদের সামনে লিখিতভাবে উপস্থাপন করবেন কিনা?’

তিনি বলেন, ‘আমার আরেকটি প্রশ্ন ছিল, এই নির্বাচনের পর বাংলাদেশের জীবনে দুটি বিশাল উদযাপন আছে। একটি হচ্ছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী। আরেকটি হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী। নির্বাচনে বিজয়ী হোন বা পরাজিত হন, এই উৎসবগুলো সবাই মিলে পালন করবেন কিনা? এসব বিষয়ে তারা বলেছেন, এ বিষয়ে তারা তাদের অবস্থান পরিষ্কার করবেন।

আমাদের নতুন সময় সম্পাদক জানান, মতবিনিময় সভা ড. কামাল হোসেন ও মির্জা ফখরুলের বক্তব্যের মধ্যদিয়ে শুরু হয়েছে। নির্বাচন কীভাবে অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হবে, এ ব্যাপারে সাংবাদিকদের মতামত চেয়ে তারা বক্তব্যের সূত্রপাত করেন। তৌফিক ইমরোজ খালেদী বলেন, আমার মনে হয়, এই ঐক্যফ্রন্ট যদি বিজয়ী হয়, তাহলে তাদের প্রধানমন্ত্রী কে হবেন? এটা তাদের পরিষ্কার করতে হবে। কিন্তু সেটা তারা এখনও করেননি।’

বৈঠক সূত্র জানায়, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান জানতে চান জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকবে কিনা। ড. কামাল হোসেন উত্তরে বলেন, ‘নির্বাচন আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। আমরা সরে যেতে পারি না। নির্বাচনী প্রচারে কী প্রাধান্য পাবে, সভায় এমন প্রশ্ন উত্থাপিত হলেও সুনির্দিষ্ট কোন উত্তর আসেনি।

মতবিনিময় শেষে গণফোরামের নেতা জগলুল হায়দার আফ্রিক বলেন, ‘নির্বাচনে অনিয়ম বন্ধে গণমাধ্যমের সহযোগিতা চেয়েছি আমরা। তারা যেন লেখালেখি করে নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারেন, সে জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।’

জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ক্ষমতায় যেতে পারলে কী কী করবে, এমন প্রশ্নে আমরা বলেছি, ১১ দফা দিয়েছি। সেটা বাস্তবায়ন করা হবে। সুষ্ঠু নির্বাচন যেন হয়, তারা কীভাবে সাহায্য করবেন, তা আলোচনা করেছি।