২৪ জানুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ বিএনপি দু’দলকেই দিতে হচ্ছে বড় ছাড়

হাসান নাসির, চট্টগ্রাম অফিস ॥ চট্টগ্রামে জোট, মহাজোট সমীকরণে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগকে ছাড়তে হবে কমপক্ষে চারটি আসন। আর শরিকদের জন্য বিএনপিকে ত্যাগ করতে হবে অন্তত তিনটি আসন। জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হলেও দলটি চট্টগ্রামের ৩টি আসনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। ঐক্যফ্রন্টের শরিক দল গণফোরামের দাবি রয়েছে দুটি আসনের। এর বাইরে একই দলের নেতাদের মধ্যে মনোনয়ন লাভের প্রতিযোগিতাও রয়েছে। শেষ পর্যন্ত দলগুলোর মধ্যে আসন ভাগাভাগির চিত্র কেমন হবে, তা নিয়ে এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

আওয়ামী লীগকে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ছাড়তে হয়েছিল চারটি আসন। ১৪ দলীয় জোট এবং জাতীয় পার্টির সঙ্গে আসন সমঝোতায় আসনগুলো ছাড়তে হয়। তার মধ্যে মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ দুটি আসনও রয়েছে। দলের নেতাকর্মী এবং সমর্থকদের মনোকষ্ট থাকলেও কমপক্ষে আসনগুলো এবারও যে ছেড়ে দিতে হবে সে ব্যাপারে অনেকেরই সংশয় নেই। তার পরও নেতারা দলীয় ফরম ও কমিশনারের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করে যে যার মতো কেন্দ্রের আশীর্বাদ লাভের চেষ্টা করছেন।

চট্টগ্রামে বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ছেড়ে দেয়া আসনে যারা সংসদ সদস্য হয়েছেন তারা হলেন চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে তরিকত ফেডারেশনের সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভা-ারী, চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে জাতীয় পার্টির ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, চট্টগ্রাম-৮ (চান্দগাঁও-বোয়ালখালী) আসনে জাসদের মঈন উদ্দিন খান বাদল এবং চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসনে জাতীয় পার্টির জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। জাতীয় পার্টিসহ যুক্ত হয়ে মহাজোট হলে এবারও নিদেনপক্ষে এ আসনগুলো ছেড়ে দিতে হতে পারে। পাশাপাশি আরও একটি আসনে ভাগ বসাতে পারে জাতীয় পার্টি। চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনটি চাওয়া হতে পারে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রথম মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরীর জন্য।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হওয়ায় বিএনপির জন্য জটিলতা আরও বেড়েছে। কেননা, দলটি একই সঙ্গে ঐক্যফ্রন্ট এবং ২০ দলীয় জোট দুদিকেই রয়েছে। ফলে বিএনপিকেই এবার শরিকদের জন্য বেশি আসন ছাড়তে হতে পারে। আগে যেখানে শুধু জামায়াতের সঙ্গে বোঝাপড়ায় চলেছিল, এবার তা হচ্ছে না। ২০ দলীয় জোটের দুই শরিক দলের শীর্ষ নেতার বাড়ি চট্টগ্রামে। তারা হলেন চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব) সৈয়দ মোহাম্মদ ইব্রাহিম বীরপ্রতীক এবং চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ) আসনে এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব) অলি আহমেদ বীরবিক্রম। এছাড়া জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হলেও চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনটি তাদের সাবেক এমপি আ ন ম শামসুল ইসলামকে ছাড়তেই হবে।

বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে আসন ভাগাভাগি নিয়ে জটিলতা এখানেই শেষ নয়। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক দল গণফোরাম চোখ রেখেছে অন্তত দুটি আসনে। এলডিপি সভাপতি কর্নেল অলির আসনটি গণফোরাম চেয়েছে দলের কার্যকরি সভাপতি এ্যাডভোটে সুব্রত চৌধুরীর জন্য। ড. কামাল হোসেন যদি নির্বাচন না করেন তাহলে দলের কার্যকরি সভাপতির জন্য একটি আসনের দাবি বেশ জোরালো হয়ে দাঁড়ায়। চট্টগ্রাম-১৪ আসনে এই দুয়ের মধ্যে কে কাকে ছাড় দেয় সেটি এখন দেখার বিষয়। গণফোরাম চাইছে কর্নেল অলিকে পাশের আসনে সরিয়ে দিয়ে চন্দনাইশ আসনটি পেতে। এছাড়া চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনটি চায় গণফোরাম। সেখানে তাদের আগ্রহী প্রার্র্থী চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট জানে আলম।

চট্টগ্রামে এবার জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও জোট রক্ষায় বিএনপিকে সর্বোচ্চ ছাড় দিতে হতে পারে। চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে দীর্ঘদিন পর একটা সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাবেক চসিক মেয়র ও প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের। সাবেক হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম প্রয়াত হওয়ায় মীর নাসিরই আসনটি পেতে যাচ্ছেন এমন আলোচনা ছিল নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে। কিন্তু কল্যাণ পার্টিকে যদি একটি আসনও ছাড়তে হয়, তবে তা পার্টিপ্রধান মেজর জেনারেল (অব) ইব্রাহিমের হাটহাজারী ছাড়া আর কোন্টি হবে, সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ফলে দলের তৃণমূলে হতাশা রয়েছে।

চট্টগ্রাম মহানগরীর একটি আসনে মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে ধাক্কাধাক্কি চলছে বিএনপির কেন্দ্রীয় দুই নেতার। চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং-হালিশহর) আসনে দলের মনোনয়ন পেতে ফরম নিয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য অইমর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে (তৎকালীন চট্টগ্রাম-৯, বর্তমান চট্টগ্রাম-১০) নির্বাচন করেছিলেন নোমান। আমির খসরু বেছে নিয়েছিলেন বন্দর-পতেঙ্গা (তৎকালীন চট্টগ্রাম-১০, বর্তমান চট্টগ্রাম-১১) আসন। এ আসনটি বিএনপির ঘাঁটি তথা সবচেয়ে নিশ্চিত সিট মনে করা হয়ে থাকে। কিন্তু সেখানে তিনি বড় ব্যবধানে ধরাশায়ী হয়ে যান রাজনীতিতে নবাগত আওয়ামী লীগ প্রার্থী চট্টগ্রাম চেম্বার নেতা এমএ লতিফের কাছে। লতিফ আওয়ামী লীগের টিকেটে সংসদ নির্বাচিত হওয়ার পর দশ বছর ধরে এলাকায় ভর্তুকি মূল্যে ভোগ্যপণ্য বিতরণ এবং নানামুখী তৎপরতায় মাটি কামড়ে থেকে শক্ত ভিত্তি দাঁড় করিয়ে নিয়েছেন। অজ্ঞাত কারণে আমির খসরু এবার তার পুরনো বন্দর-পতেঙ্গা আসনে নির্বাচন করতে অনাগ্রহী। তিনি এবং নোমান দুজনই মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন চট্টগ্রাম-১০ আসনে। কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। আবদুল্লাহ আল নোমান জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি তার নিজ আসনে মনোনয়ন না পেলে নির্বাচনই করবেন না। শেষ পর্যন্ত ধানের শীষ প্রতীকে এ আসনের কে থাকছেন, তা সময়ই বলে দেবে।

এদিকে, নিবন্ধন হারানো জামায়াতে ইসলামীর চোখও রয়েছে চট্টগ্রাম-১০ আসনের ওপর। এ আসনে নির্বাচন করতে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন দলের কেন্দ্রীয় নেতা ও সাতকানিয়া থেকে নির্বাচিত সাবেক এমপি শাহজাহান চৌধুরী। জামায়াতও আসনটি পেতে চায়। তবে বিএনপির দুই হেভিওয়েট নেতাকে সরিয়ে জামায়াত মনোনয়ন পাবে এমন মনে করছেন না কর্মী-সমর্থক। জামায়াতে ইসলামী এতটাই প্রস্তুত যে, বিএনপির সমর্থন না পেলেও সেখানে নির্বাচন করতে পারে। এছাড়া দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালীকে টার্গেট করে দীর্ঘদিন ধরে সংগঠন গুছিয়েছে জামায়াত। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঠেকাবার আন্দোলনে বাঁশখালীতে জামায়াত-শিবিরের শক্তি সমাবেশ ছিল লক্ষণীয়। এ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে বার বার নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা সভাপতি জাফরুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বন ও পরিবেশমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছিলেন। কিন্তু এবার সেখানে বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ করছে জামায়াত। প্রার্থী হতে চান জামায়াত নেতা ও বাঁশখালী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোঃ জহিরুল ইসলাম। ২০ দলীয় জোটের সমর্থন না পেলে এ আসনে জামায়াত স্বতন্ত্র হিসেবে ভোটযুদ্ধে নামলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

এই মাত্রা পাওয়া