১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিজয়ের মাসে ওরা নির্বাচনে ভয় পায় ॥ নাসিম

বিজয়ের মাসে ওরা নির্বাচনে ভয় পায় ॥ নাসিম

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ দ্রুত জোটের প্রার্থী চূড়ান্ত করে মাঠে নামানোর তাগিদ দিয়েছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিক দলগুলো। একই সঙ্গে আসন বণ্টনের দ্রুত ফয়সালার অনুরোধ জানিয়ে জোট নেতারা বলেছেন, জোটভুক্ত নিবন্ধিত দলগুলো থেকে প্রার্থী করা না হলে তাদের নিবন্ধনও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে বিজয়ী করতে সারাদেশে নির্বাচনী প্রচারে নামতে মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিমকে আহ্বায়ক করে ২৪ সদস্যের একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করেছে ১৪ দল। জোট সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থীদের বিজয়ী করতে ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নামবে ১৪ দল। জোট প্রার্থীদের সমর্থনে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস থেকে সারাদেশে সব জেলা-উপজেলায় ‘বিজয় মঞ্চ’ করার সিদ্ধান্তও নিয়েছে কেন্দ্রীয় ১৪ দল।

শনিবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউর আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ১৪ দলের বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত হয়েছে। বৈঠক শেষে প্রেসব্রিফিংয়ে ১৪ দলের মুখপাত্র ও আওয়ামী লীগ সভাপতিম-লীর সদস্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে নির্বাচন চায় না। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি বিজয়ের মাসের নির্বাচনে পরাজয়ের ভয় করছে। বিজয়ের মাসে নির্বাচনে আতঙ্কিত ওরা হেরে যাওয়ার ভয়ে। বৈঠকে আমরা সবাই একমত হয়ে বলেছি, মনোনয়নের ব্যাপারে ১৪ দল নেত্রী শেখ হাসিনা যে সিদ্ধান্ত নেবেন, সবাই তা মেনে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে নির্বাচনে পরাজিত করব।

বৈঠক সূত্র জানায়, জোটের শরিক দলগুলোর নেতারা দ্রুত আসন বণ্টনের বিষয়টি ফয়সালার তাগিদ দিয়ে বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে স্বাধীনতাবিরোধীদের পুনর্বাসনের ষড়যন্ত্র চলছে। এই অপশক্তি মোকাবেলায় পক্ষশক্তি ১৪ দলকে দ্রুত প্রার্থী ঠিক করে নির্বাচনের মাঠে নামিয়ে দেয়া দরকার। অন্যথায় নির্বাচনের ফলে এর প্রভাব পড়তে পারে। বৈঠকে ১৪ দলীয় জোট প্রার্থীদের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ নির্বাচনী প্রচারের লক্ষ্যে একটি শক্তিশালী প্রচার টিম গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এসব টিম নির্বাচনের আগে সারাদেশে যথাসম্ভব আসনগুলোয় নির্বাচনী প্রচার চালাবেন।

বৈঠকে ন্যাপের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন বলেন, রাজনীতিতে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই-সংগ্রাম করেছি। নির্বাচনী লড়াইয়েও ১৪ দলের সব শরিকের অংশগ্রহণ থাকা দরকার। মূলধারার রাজনৈতিক দল হিসেবে ন্যাপ নির্বাচনে অংশীদারিত্ব চায়। প্রধানমন্ত্রী এটি বিবেচনায় নেবেন বলেই তাদের প্রত্যাশা। গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক ডাঃ শাহাদাৎ হোসেন বলেন, আশা করি প্রধানমন্ত্রী ও ১৪ দল নেত্রী শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচনের মনোনয়ন নির্ধারণের বেলায় আমাদের বঞ্চিত করবেন না।

জোটের শরিক সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া বলেন, ১৪ দলভুক্ত নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো এবারও কোন আসনে জোটের মনোনয়ন না পেলে তাদের নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন ঝুঁকিতে পড়তে পারে। কেননা নিবন্ধিত কয়েকটি দলের গত নির্বাচনেও কোন প্রার্থিতা ছিল না। গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ (আরপিও) অনুযায়ী পরপর দুটি নির্বাচন না করলে নিবন্ধন বাতিল হতে পারে। ২০০৮ সালের নির্বাচনেও এসব দল মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছিল বলে ক্ষোভ জানান তিনি।

জাতীয় পার্টির (জেপি) সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম মহাজোটে অন্তর্ভুক্ত হতে আগ্রহী অধ্যাপক ডাঃ বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারাসহ যুক্তফ্রন্টের দিকে মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ তোলেন। নির্বাচনে বিএনপির ‘রহস্যজনক অবস্থান’-এ উদ্বেগ জানিয়ে তিনি বলেন, সামগ্রিক পরিস্থিতি দেখে মনে হয়েছে, আগামী নির্বাচনে সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, বিএনপি নির্বাচনে আসায় অতীতে আমরা যেভাবে সংসদ কার্যক্রম চালিয়েছি, আগামীবার সেভাবে চালানো যাবে না। তাই সংসদে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের একসঙ্গে থাকা দরকার।

কমিউনিস্ট কেন্দ্রের আহ্বায়ক ডাঃ ওয়ােেজদুল ইসলাম খান একই মনোভাব ব্যক্ত করে বলেন, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ১৪ দলের ২৩ দফা পুনঃলিখন করে মানুষের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে। জোট-মহাজোটের সুযোগে স্বাধীনতাবিরোধী কোন ব্যক্তি যেন আমাদের মধ্যে ঢুকে পড়তে না পারেনÑ সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ১৪ দলের ঐক্য অটুট রাখার তাগিদ দিয়ে বলেন, নির্বাচন ও নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবেলা করা যায়- সেটাও চিন্তায় রাখতে হবে।

২৬ সদস্যের শক্তিশালী প্রচার টিম ॥ বৈঠকে ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিমকে আহ্বায়ক করে ১৪ দলের ২৪ সদস্যের একটি শক্তিশালী প্রচার কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি নির্বাচন আচরণ-বিধির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সারাদেশে ১৪ দল মনোনীত প্রার্থীদের পক্ষে নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করবে। কমিটির সদস্যরা হচ্ছেন- রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, দিলীপ বড়ুয়া, ফজলে হোসেন বাদশা, শিরীন আখতার, লুৎফর রহমান, শরীফ নুরুল আম্বিয়া, নাজমুল হক প্রধান, আমিনা আহমদ, ইসমাইল হোসেন, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, শেখ শহীদুল ইসলাম, ব্যারিস্টার আরশ আলী, ডাঃ শাহাদাত হোসেন, নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী, ড. সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরী, এ্যাডভোকেট এস কে শিকদার, মুহাম্মদ আতা উল্লাহ, জাকির হোসেন, রেজাউর রশীদ খান, ডাঃ ওয়াজেদুল ইসলাম খান, ডাঃ অসিত বরণ রায় এবং হামিদুল কিবরিয়া চৌধুরী।

বিজয়ের মাসে নির্বাচনে ভয় পায়Ñ মোহাম্মদ নাসিম ॥ বৈঠক শেষে প্রেসব্রিফিংয়ে ১৪ দলের মুখপাত্র ও আওয়ামী লীগ সভাপতিম-লীর সদস্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে নির্বাচন চায় না। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি বিজয়ের মাসের নির্বাচনে পরাজয়ের ভয় করছে। বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচন পেছানোর দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন তাদের অনুরোধে নির্বাচনের তারিখ একবার পরিবর্তন করল। আওয়ামী লীগ কিংবা ১৪ দল কেউ আপত্তি করেনি। এরপরও তারা আবারও আবদার করল। আসলে ডিসেম্বর মাসে তারা নির্বাচন করতে চায় না। আমাদের ধারণা, ডিসেম্বর মাস এলে তারা ভয় পায়, আতঙ্কিত হয় হেরে যাওয়ার ভয়ে।

নাসিম বলেন, বিজয়ের মাস এলে জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করে অপশক্তির বিরুদ্ধে। বাঙালী জাতির সব বিজয় এসেছে এই ডিসেম্বর মাসেই। আর ডিসেম্বর মাস এলেই কী কারণে যেন বিএনপি-জামায়াত জোট ভয় পায়। এ মাসটিতে তাদের একাত্তরের পরাজয়ের কথা মনে হয়। নয়াপল্টনে পুলিশের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, কেন পুলিশকে আক্রমণ করা হলো? এবারও দেখলাম বাঁশের লাঠি নিয়ে নারী-পুরুষ সবাই দাঁড়িয়ে আছে। তারা মনে হয় আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। তারপরও তারা এ ঘটনা নিয়ে মিথ্যাচার করে যাচ্ছে। এই যে তাদের আচরণ, এখনও তাদের চরিত্র পরিবর্তন হয়নি।

ড. কামাল হোসেনের সমালোচনা করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ড. কামালের কেন এত অধঃপতন হলো? জ্বালাও-পোড়াও ও পুলিশের ওপর হামলা হলো- তিনি একটা কথাও বললেন না। তিনি কি এতটাই বিক্রি হয়ে গেলেন অপশক্তির কাছে? এটা সত্যি দুঃখজনক। যারা এখনও ঠিক করতে পারেনি তাদের দলনেতা কে হবেন, তাদের কাছে জনগণ কী আশা করতে পারে?

বৈঠকের সিদ্ধান্ত তুলে ধরে ১৪ দলের মুখপাত্র বলেন, নির্বাচনী প্রচারের কাজে তার (নাসিম) নেতৃত্বে ১৪ দল গঠিত প্রচার টিম গ্রাম-গঞ্জে সভা-সমাবেশের মাধ্যমে জোট প্রার্থীর পক্ষে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে প্রচার চালাবে। আর বিজয় দিবস থেকে প্রতিটি জেলা-উপজেলায় ১৪ দলের ‘বিজয় মঞ্চ’ থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয়ের ইতিহাস তুলে ধরার পাশাপাশি জোট প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার চালানো হবে।

আগামী নির্বাচনে সব দল অংশ নেয়ায় তাদের স্বাগত জানিয়ে জাসদের সভাপতি তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিষয়ে মুখবন্ধের নীতিকে নিন্দা জানাচ্ছি। অপরাধীদের পক্ষে ওকালতি কিংবা তাদের হালাল করার চেষ্টা করবেন না। মীমাংসিত কোন বিষয় নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াবেন না। বাংলাদেশকে আর হত্যাকারী-আগুনসন্ত্রাসীদের হাতে যেতে দেয়া যাবে না।

এর আগে গণআজাদী লীগের সভাপতি এস কে শিকদারের সভাপতিত্বে বৈঠকে ১৪ দল নেতাদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন দিলীপ বড়ুয়া, নজিবুল বশর মাইজভা-ারী, ডাঃ ওয়াজেদুল ইসলাম খান, রেজাউর রশীদ খান, ফজলে হোসেন বাদশা, শিরীন আখতার, নাজমুল হক প্রধান, ডাঃ শাহাদাৎ হোসেন, শেখ শহিদুল ইসলাম, ইসমাইল হোসেন, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, সুজিত রায় নন্দী, ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া প্রমুখ।