১৮ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এবার ভোটের মাঠে প্রভাবশালী ১৭ শিক্ষক নেতা

এবার ভোটের মাঠে প্রভাবশালী ১৭ শিক্ষক নেতা

বিভাষ বাড়ৈ ॥ কেবল শ্রেণীকক্ষেই নয়, এবার নির্বাচনী মাঠেও নেমেছেন দেশের প্রভাবশালী শিক্ষক নেতারা। আছেন জনপ্রিয় সাধারণ শিক্ষকরাও। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রার্থী হতে মাঠে নেমেছেন অন্তত ১৭ জন শিক্ষক নেতা। যাদের অধিকাংশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে কিনেছেন মনোনয়নপত্র। গত কয়েক বছর ধরে নিজ এলাকায় কাজের মাধ্যমে ভাল অবস্থানও তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন বেশ কয়েকজন। একাধিক আসনে মনোনয়নও কিনেছেন কয়েকজন। শিক্ষক নেতাদের বাইরেও সারাদেশে বিভিন্ন দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে মনোনয়নপত্র কিনেছেন অন্তত অর্ধশত শিক্ষক। দুয়ারে কড়া নাড়ছে সংসদ নির্বাচন। অন্য পেশাজীবীদের সঙ্গে মনোনয়ন দৌড়ে তাই পিছিয়ে নেই শিক্ষকরা। আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের হয়ে ভোটের মাঠে রয়েছেন অনেক শিক্ষক। তারা নিজ নিজ দল থেকে মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদী। অবশ্য এই শিক্ষকদের বেশিরভাগই কোন না কোন শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। কেউ কেউ আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ পদেও আছেন। যারা পেশাগত আন্দোলন ছাড়াও নিজ নিজ নির্বাচনী আসনে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। ব্যানার-ফেস্টুনের মাধ্যমে এলাকার জনগণের কাছে নিজেদের পরিচয় ও অতীত কর্মকা- তুলে ধরছেন মনোনয়নপত্র কেনা শিক্ষক নেতারা।

মনোনয়নপ্রত্যাশী শিক্ষক নেতারা সকলেই বলছেন, জাতীয় সংসদে শিক্ষকদের দাবি তুলে ধরতেই নির্বাচন করতে চাই। সৎ মানুষ হিসেবে শিক্ষকরা এখনো সমাজে স্বীকৃত। শিক্ষকরাই রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ঠেকাতে পারবেন। সৎ মানুষ রাজনীতিতে আসুক এটি সবারই প্রত্যাশা, এ ক্ষেত্রে শিক্ষকরাই সবচেয়ে অগ্রগামী। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে চান সরকার সমর্থক প্রভাবশালী বেশ কয়েকজন শিক্ষক নেতা। যারা জাতির জনকের আদর্শ ও অসাম্প্রদায়িক, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের হয়ে রাজনীতি করে যাচ্ছেন বহুদিন ধরে। তারা শিক্ষার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় কাজ করতে চান তাদের প্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনার সমর্থন নিয়ে।

দেশের কারিগরি শিক্ষক সংগঠনগুলোর বৃহত্তর জোট বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ এম এ সাত্তার এবার নির্বাচন করতে চান লক্ষীপুর-৩ আসন থেকে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের এ সভাপতি ঢাকার এ আসনেও প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র কিনেছেন। ইতোমধ্যেই সাড়া ফেলেছেন গত সংসদ নির্বাচনের সময় বিএনপি-জামায়াত জোটের নাশকতার বিরুদ্ধে শত শত শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে নিয়ে রাজধানী জুড়ে প্রতিবাদী কর্মসূচী নিয়ে ব্যাপক আলোচনায় আসা এ শিক্ষক নেতা। প্রায় ৪০ বছর যাবত আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদে থাকা অধ্যক্ষ এম এ সাত্তার ইতোমধ্যেই লক্ষ্মীপুরের রাজনীতিতে ইতিবাচক অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। দেশের সবচেয়ে বড় ও নামী বেসরকারী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কর্ণধার এ শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ এম এ সাত্তার ট্রাস্টের মাধ্যমে কাজ করে ইতোমধ্যেই ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছেন।

জননেত্রী মনোনয়ন দিলে নির্বাচন করতে চাই মন্তব্য করে এ শিক্ষক নেতা বলেন, জাতির জনকের স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে জননেত্রীর কাছে থেকে কাজ করতে চাই। সিদ্ধান্ত নেবেন আমাদের নেত্রী। রাজধানীর তেজগাঁও কলেজের অধ্যক্ষ ও তেজগাঁও থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ মোঃ আবদুর রশীদ আওয়ামী লীগের হয়ে জামালপুর-৪ আসন থেকে মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির (বাকবিশিস) কার্যকরী সভাপতি। তিনি এর আগে একাধিক আসনে নির্বাচনী প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অধ্যক্ষ আবদুর রশীদ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য। এই শিক্ষক নেতাও বলছিলেন, নেত্রী যদি মনোনয়ন দেন তাহলে নির্বাচন করব।

আওয়ামীপন্থীদের আরেক শিক্ষক সংগঠন স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের (স্বাশিপ) সাধারণ সম্পাদক মোঃ শাহজাহান আলম সাজু। তিনি আওয়ামী লীগের হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন। তিনি ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সহসভাপতি ছিলেন, বর্তমানে আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও মানবসম্পদবিষয়ক উপকমিটির সদস্য।

শাহজাহান আলম সাজু বলছিলেন, আমি ছাত্রজীবন থেকেই ছাত্রলীগের সঙ্গে ছিলাম। কল্যাণ ট্রাস্টের সুবাদে শিক্ষকদের উন্নয়নে কাজ করেছি। এ ছাড়া এলাকার একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা আমি। রাস্তাঘাট, কালভার্ট-ব্রিজ নির্মাণে অনেক আগে থেকেই ভূমিকা রাখছি। ওয়ান-ইলেভেনে আমিই একমাত্র শিক্ষক নেতা যে শেখ হাসিনার মুক্তির জন্য সর্বপ্রথম রাস্তায় নেমেছি। আওয়ামী লীগ যদি আমাকে মনোনয়ন দেয় তাহলে আমি এই আসনটি উপহার দিতে পারব বলে শতভাগ আশাবাদী।

জাতীয় শিক্ষক-কর্মচারী ফ্রন্টের আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যক্ষ আসাদুল হক। তিনি আওয়ামী লীগের হয়ে কিশোরগঞ্জ-৩ আসন থেকে মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন। তিনি রাজধানীর তেজগাঁও মহিলা কলেজের সদ্য সাবেক অধ্যক্ষ ও বাংলাদেশ অবসর সুবিধা বোর্ডের সাবেক সদস্যসচিব।

আসাদুল হক বলেন, আমার আসনটি পর পর দুইবার মহাজোটের শরিক দল হিসেবে জাতীয় পার্টিকে দেয়া হয়েছে। এখন তৃতীয়বার দিলে এই আসনে আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব থাকবে না। আমি নিজে একজন মুক্তিযোদ্ধা। ৪২ বছর ধরে এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রেখে চলেছি। দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয় তাহলে এ কথা বলতে পারি, নৌকার বিজয় সুনিশ্চিত।

বিএনপিপন্থী শিক্ষক সংগঠনগুলোর বৃহৎ মোর্চা বাংলাদেশ শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মোঃ সেলিম ভূঁইয়া। তিনি ঢাকা-৪ ঢাকা-৫ ও কুমিল্লা-২ থেকে বিএনপির হয়ে মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন। তিনি বিএনপির গণশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক এবং রাজধানীর এ কে স্কুল এ্যান্ড কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ।

সেলিম ভূঁইয়া বলেন, ২০০৯ সালের নির্বাচনে আমি ঢাকা-৫ আসনে বিএনপির বিকল্প প্রার্থী ছিলাম। আমি যে তিনটি আসন থেকে মনোনয়ন ফরম তুলেছি, তা পাশাপাশি। এসব এলাকার অধিকাংশ বাসিন্দা কুমিল্লার। আমি নিজেও কুমিল্লার। ফলে দল আমাকে যে কোন আসন থেকে মনোনয়ন দিলে বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করতে পারব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর প্রফেসর ড. আবু ইউসুফ মো. আব্দুল্লাহ আওয়ামী লীগের হয়ে সাতক্ষীরা-৩ আসনে মনোনয়ন ফরম তুলেছেন। ড. আব্দুল্লাহ বর্তমানে নর্দান ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এ্যান্ড টেকনোলজি, খুলনার উপাচার্য। এ ছাড়া তিনি নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, নর্দান ইন্টারন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজসহ একাধিক স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা।

এ ছাড়া কুমিল্লা-৫ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে মনোনয়ন কিনেছেন শিক্ষক-কর্মচারী সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক মোহাম্মদ আলী। রাজশাহী-১ আসন থেকে আওয়ামী লীগের হয়ে সাবেক অধ্যাপক বজলার রহমান, রাজশাহী-২ আসন থেকে শফিকুর রহমান বাদশা, পিরোজপুর-১ আসন থেকে অধ্যক্ষ শাহ আলম, নেত্রকোনা-২ আসন থেকে মদনপুর শাহ সুলতান ডিগ্রী কলেজের শিক্ষক ওমর ফারুক, নেত্রকোনা-১ আসন থেকে সুসং ডিগ্রী কলেজের উপাধ্যক্ষ রেমন্ড আরেং, ময়মনসিংহ-৯ আসন থেকে অধ্যক্ষ সামছুল বারী মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন।

রাজধানীর জনতাবাগ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ জাকির হোসাইন বিএনপির হয়ে মেহেরপুর-১ আসন থেকে মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন। তিনি মেহেরপুর জেলা বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য। এ ছাড়া শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের অতিরিক্ত মহাসচিব ও বাংলাদেশ প্রধান শিক্ষক সমিতির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দলের আহ্বায়ক ও বিএনপির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক প্রফেসর এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বাগেরহাট-৩ আসন থেকে, জয়পুরহাট শহর বিএনপির সহসভাপতি, শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোট নেতা অধ্যক্ষ শামসুল হক জয়পুরহাট-১ আসন থেকে, দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সেক্রেটারি মনজুরুল ইসলাম দিনাজপুর-২ আসন থেকে, পিরোজপুর জেলা বিএনপির সেক্রেটারি ও শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের নেতা আলমগীর হোসেন পিরোজপুর-১ আসন থেকে বিএনপির হয়ে মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন।

ময়মনসিংহ-৪ আসনে বিএনপির মনোনয়ন চাইবেন অধ্যাপক আমজাদ হোসেন। তিনি শহর বিএনপিরও নেতা।

লক্ষ্মীপুর-১ আসনে বিএনপির মনোনয়নপত্র কিনেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জোবায়ের আলম নীলফামারী-৩, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দীন ভোলা-৪, আইন বিভাগের শিক্ষক ড. সেলিম মাহমুদ চাঁদপুর-১ আসন থেকে আওয়ামী লীগ থেকে প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

মনোনয়নপ্রত্যাশী শিক্ষকরা বলছেন, দেশের জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশই শিক্ষা পরিবারের সঙ্গে জড়িত। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মিলিয়ে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ সরাসরি শিক্ষা পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সে তুলনায় আইনসভায় শিক্ষক সমাজের প্রতিনিধিত্ব অনেক কম। তাই শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অধিকার থেকে শুরু করে শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়নে শিক্ষকদের মধ্য থেকে আসা সংসদ সদস্যরাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।