২৪ জানুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নির্বাচনী অলিম্পিয়াডের আড়ালে

  • জাফর ওয়াজেদ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সাপের খোলস থেকে বের হচ্ছে পাকিস্তানী হায়েনাগুলো। হত্যা, আগুন, সন্ত্রাস ও জঙ্গীপনায় মেতে ওঠার আয়োজন নিয়ে শশব্যস্ত তারা। নির্বাচনে হেরে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা দেখা গেলে তা বানচাল করার জন্য সন্ত্রাসের পথ বেছে নিতে পারে। কিংবা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য চোরাগোপ্তা হামলা চালানোর ষড়যন্ত্র পাকাতেও পারে। সুষ্ঠু, অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচন যাতে না হয় সেজন্য নানা কুপন্থা ও কুপথের লোকজন অসংযত কার্যক্রম যে চালাবে না তার নিশ্চয়তা নেই। ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নির্বাচন মেনে নিতে পারেনি যারা তারা তো চাইবে এমন উদাহরণ তৈরি করতে যাতে গলা হাঁকিয়ে বলতে পারে অনির্বাচিত সরকার ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। নানামুখী ষড়যন্ত্র আর চক্রান্তের জাল ইতোমধ্যে বোনা হয়ে গেছে। এখন বাস্তবে তা কার্যকর করার কৌশল অবলম্বন করবেন। দেশবাসী দেখতে চায় অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। এ জন্য সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত দল চাইবে না কোন স্বাভাবিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। তারা অতীতে নির্বাচন বর্জন করে মানুষ হত্যায় মেতেছিল। আবার যেসব নির্বাচনে অংশ নিয়েছে সেখানে ভোট কেন্দ্র দখল, ভোটারদের ভয় ভীতি প্রদর্শন, জাল ভোট প্রদান, মিডিয়া ক্যুর মাধ্যমে ফলাফল ঘোষণা ইত্যাদি নির্বাচন বিধিবিধান লঙ্ঘন করার কাজটি সুচারুরূপে করেছে। আর নির্বাচনকে সামনে রেখে অতীতে সামরিক ছাউনিতে জন্মলাভ করা দলগুলো দাগি সন্ত্রাসী, খুনী, গুন্ডাপান্ডা এমনকি জঙ্গীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে এক অরাজক অবস্থার সৃষ্টি করে ক্ষমতায় আসীন হয়েছে। এমনও হয়েছে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে দেয়া হয়নি। বোমাবাজি, গোলাগুলি, লাঠিপেটা, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার চিত্র অতীতে যেভাবে সংঘটিত হতো তা থেকে পরিস্থিতি বদলে গেলেও নাশকতার চেতনাধারীরা এখনও থেমে নেই। বরং নিত্য নতুন কৌশল অবলম্বন করে আসছে। অসৎ, আদর্শহীন, নীতিহীন, ঋণখেলাপী লুটেরাদের আবির্ভাব ঘটে ক্ষমতাদখলকারী দুই সামরিক জান্তাশাসক ও তাদের উত্তরসূরির আমল থেকে। তাদের বর্তমান প্রজন্ম মনোনয়নপত্র কিনতে এসে শোডাউনের নামে পুলিশকে মারধর, তাদের যানবাহনে আগুন জ্বালিয়ে উল্লম্ফন নৃত্যও করেছে। এরা চিহ্নিত হয়েছে। ছাত্রদল সম্পৃক্ত এই যুবকেরা পরিস্থিতিকে অস্বাভাবিক করে গড়ে তোলার জন্য লাঠিসোঁটার ব্যবহার করেছে। যারা এই হামলা চালিয়েছে তারা মনোনয়ন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রভাবশালী প্রার্থীর কাছ থেকে সহায়তা পেয়েছে বলা যায়। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন তাদের লক্ষ্য নয়, লক্ষ্য পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করা। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে প্রমাণ হয়ে যাবে, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সম্ভব। বাস্তবতায় দেখা গেছে, বিএনপি-জামায়াত জোটের একটি অংশ তাদের দলের দন্ডিত ও সাজাপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সনের মুক্তি ছাড়া নির্বাচনে যাবে না। দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত দুজনের অবর্তমানে দলের পালের গোদা হিসেবে চিঠিত ডক্টর কামাল হোসেনও তাদের মুক্তি চাইছেন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য গলা ফাটিয়ে ফেলা কামাল হোসেন বেআইনী কর্মকান্ডকে যখন সমর্থন দিচ্ছেন, তখন এটা স্পষ্ট এবং পরিষ্কার যে সন্ত্রাসী কর্মকা-কে তিনি পূর্ণসমর্থন দিয়ে যাবেন। যুদ্ধাপরাধীদের দল ও সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে খ্যাত নিবন্ধনহীন জামায়াতের শক্তি এখন কামাল হোসেনকে গর্জন তর্জনে সাহস যোগাচ্ছে। যে কারণে পল্টনে বিএনপির দু’গ্রুপের সংঘর্ষ এবং পুলিশের ওপর হামলা ও গাড়ি পুড়িয়ে দেয়ার বিরুদ্ধে বিএনপি-জামায়াত জোটের নব্য ধারক-বাহক জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কা-ারি কামাল হোসেন নিন্দামন্দ দূরে থাক, বরং আরও উৎসাহিত করতে উল্টাপাল্টা কথা বলছেন, এই সংঘর্ষ যে দুরভিসন্ধিমূলক তা সাধারণ জনগণও বোঝে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যারা দীর্ঘদিন ধরেই ঘোঁট পাকাচ্ছেন, সেই কথিত সুশীলসমাজ নামধারীরাও উঠেপড়ে লেগেছে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায় কিভাবে। অথচ তারা জানে নির্বাচনকালে সব রাজনৈতিক দল বা জোটের সত্যিকার গণতন্ত্র চর্চায় মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত হওয়ার জন্য এ চর্চার বিকল্প নেই। অগণতান্ত্রিক আচরণ করলে সুষ্ঠু নির্বাচন অসম্ভব। নয়া পল্টনে মনোনয়ন ফরম নেয়ার জন্য একেকজন নেতা যে পরিমাণ শোডাউন করেছেন এবং তা করতে গিয়ে দলীয় গ্রুপিংকে সামনে এনে সহিংসতা অবলম্বন করেছেন তা পূর্ব পরিকল্পিত বৈকি। লাঠিসোঁটা, পেট্রোল এসব আগেই যোগাড় করে রাখা হয়েছিল। গোলযোগপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঘাড়ে দোষ চাপানোর পুরনো প্রক্রিয়া থেকে পুলিশের ওপর হামলা চালানো হয়েছিল বলে অনেকের কাছেই প্রতীয়মান। যারা এই সহিংসতার সৃষ্টি করেছে, তারা রাজনৈতিক কর্মী হতে পারে না, তারা দুর্বৃত্ত বা দুষ্কৃতকারী। দেশবাসী গণতন্ত্রের বিজয় চায়, জ্বালাও-পোড়াও নয়। সরকারী ও বিরোধী দলীয় জোটগুলো শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে যেভাবে নির্বাচনে এসেছে, সেভাবে নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যারা গণতন্ত্র চর্চা করে না, সেনা ছাউনিতে জন্ম নেয়া এবং ক্যুপথে ক্ষমতাদখলকারী, তারা সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও অবাধ নির্বাচনে অতীতেও বিশ্বাসী ছিল না, বর্তমানেও নয়। উস্কানিমূলক, অসত্য, গুজব ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টির প্রবণতায় যারা মোহগ্রস্ত তারা দায়িত্বশীল হতে পারে না। বরং সংঘাত, হানাহানি, হাঙ্গামা প্রদর্শন করে অস্বাভাবিক অবস্থা তৈরিই প্রধান লক্ষ্য তাদের। এরা নির্বাচন পিছিয়ে নেয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনে ধরণা দিচ্ছে কোন স্বাভাবিক চিন্তা থেকে নয়, বরং এক ধরনের চক্রান্তকে সামনে এনে পরিস্থিতি তাদের অনুকূলে নিয়ে আসা। দেশে সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি করে সঙ্কট সৃষ্টির মাধ্যমে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায় তারা। তারেক জিয়া নির্দেশিত পথে চলতে গিয়ে কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামায়াত জোটের ঐক্যফ্রন্টকে সন্ত্রাসের পথে নিয়ে যাওয়া কঠিন কিছু নয়। পেট্রোল বোমায় জীবন্ত মানুষ মারার বিরুদ্ধে অবস্থান না নিয়ে কামাল হোসেন, মান্না, সুলতান গিয়েছিলেন গুলশানে বেগম জিয়ার বাসভবনে। তারা মানুষ হত্যা বন্ধে অবরোধ তুলে নেয়ার জন্য একটিবারও বেগম জিয়ার কাছে অনুরোধ জানাননি, বরং তার কর্মসূচীকে সমর্থনই করেছেন। সহস্রাধিক মানুষ হতাহত হলেও কামাল হোসেন সেসব মানুষের প্রতি সহানুভূতি দূরে থাক, নিন্দাও জানাননি। সেই কামাল গংরা বিএনপি-জামায়াতের নাশকতার প্রতি প্রচ্ছন্ন সমর্থন দিচ্ছেন পলাতক দুর্নীতিবাজ তারেকের নির্দেশিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য। যে ১১ দফা তারা উত্থাপন করেছেন, তার একটিই লক্ষ্য বিএনপি-জামায়াতকে পুনর্বাসিত করে খালেদা-তারেককে মুক্ত করে ক্ষমতায় আসীন করা। তারপর দেশ আবার ফিরে যাবে পাকিস্তানী ভাবধারায়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করার পূর্ব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কামাল হোসেন হবেন ‘পালের গোদা’। সন্ত্রাসের কাফেলা তিনিই পরিচালনা করবেন তখন এবং একে তিনি আইনের শাসন বলে অভিহিত করতে দ্বিধা করবেন না। কামাল হোসেন অনুসারী এবং বিএনপি-জামায়াতপন্থী এনজিওগুলো সহায়ক শক্তি হিসেবে অনেকদিন ধরেই মাঠে। এদের মধ্যে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ও দি হাঙ্গার প্রজেক্ট সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতায় নেমেছে। দুটির পরিচালক একই ব্যক্তি, যিনি তার কর্মকা-ের জন্য বিতর্কিত, সমালোচিত অনেকদিন ধরেই। তার বাসভবনে বিদেশী রাষ্ট্রদূতসহ আজকের ঐক্যফ্রন্ট নেতারা মধ্যরাত পর্যন্ত বৈঠক করে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটাতে ছক এঁকেছিলেন। সেখানেই সম্ভবত ঐক্যফ্রন্টের ভ্রুণ তৈরি হয়েছিল। কারণ বৈঠকে যারা ছিলেন, তারা সবাই আজ ঐক্যফ্রন্টের নেতা। সুজনের পরিচালকের সর্বশেষ কার্যক্রম দেশদ্রোহিতা ও নির্বাচনী আচরণবিধির বিরোধী। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোন অনুমোদন ছাড়াই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘জাতীয় নির্বাচনী অলিম্পিয়াড’-এর নামে কৌশলে সরকারবিরোধী প্রচার চালাচ্ছেন। সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সুজন ও হাঙ্গার প্রজেক্ট নামক দুই এনজিও পরিচালক বলেছেন, সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন তৈরি করে সরকার আইনকে অস্ত্রে পরিণত করেছে। বিগত সময়ে যতগুলো নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার একটিও সুষ্ঠু হয়নি। দেশের স্কুল ও কলেজগুলোতে এই অলিম্পিয়াড আয়োজন করে শিক্ষার্থী তথা তরুণ ভোটারদের শেখ হাসিনা ও তার সরকারের বিরুদ্ধে বিষিয়ে তোলা এবং বিএনপি-জামায়াতকে ধোয়া তুলসীপাতা হিসেবে বিবেচ্য করে তোলাই লক্ষ্য। সরকার বিরোধী প্রচারের ভেন্যু হিসেবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে তারা স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তা নিচ্ছে। সরকার, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিরোধী চেতনার বিকাশ ঘটাতে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে এই অলিম্পিয়াড আয়োজন কোন স্বাভাবিক, স্বচ্ছ বিষয় নয়। বরং এক মহা দুরভিসন্ধি এবং ষড়যন্ত্রেরই নামান্তর। একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সুজন যে সব কর্মকান্ড গত এক বছরের বেশি সময় ধরে চালিয়ে আসছে, তা ধর্মান্ধ, প্রতিক্রিয়াশীল, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করতে সহায়ক হয়েছে। এই দুটি প্রতিষ্ঠান দেশের অনেক তথ্য বিদেশীদের কাছে সরবরাহ যেমন করে আসছে, তেমনি প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে বিদেশীসহ দূতদের সঙ্গে বৈঠক করে আসছে। এরা সংসদ ভেঙ্গে নির্বাচন করা এবং নির্বাচনকে ২৮ জানুয়ারির পর করার মাধ্যমে দেশে সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি করার জন্য মরিয়া। এদের পরামর্শ ধারণ করতে দু’পা এগিয়ে কামাল গংরা। নির্বাচনী অনিশ্চিয়তা শুধু নয়, আরও অনেক ষড়যন্ত্রই চলবে নির্বাচনকে সামনে রেখে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারীদের সতর্ক হওয়ার কোন বিকল্প নেই।

এই মাত্রা পাওয়া