১৮ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শেখ হাসিনার উন্নয়ন ॥ নিকলী-বাজিতপুর

  • সোহেল রানা

‘এ পথ শুধু এগিয়ে চলার, নয়কো থামার।’ কেন থেমে যাবে? চলাই যার ধর্ম তাকে তো পাড়ি দিতে হবে মাইল মাইল পথ। চড়াই-উতরাই, প্রতিবন্ধকতা ডিঙ্গিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে সময়ের তালে তাল মিলিয়ে। হতশ্রী দরিদ্রপীড়িত মানুষের জীবনে এনে দিতে হবে দু’বেলা দু’মুঠো খাদ্য যেমন, তেমনি বেঁচে থাকার আনন্দ, সুখ। তাদের জীবনেও দেখা দেয় যেন সমৃদ্ধি। তাই তো যে অঞ্চলগুলো সুবিধাবঞ্চিত, পশ্চাৎপদ, শিক্ষা-দীক্ষাহীন, গত দশ বছরের উন্নয়নের ছোঁয়ায় সেসব আজ উন্নত, প্রাগ্রসর, সমৃদ্ধ, আলোকময় আর সচ্ছলতার আবরণে আনন্দ আর মঙ্গলের মাইলফলকে পরিণত হয়েছে। শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ হাতের স্পর্শে সব যেন স্বর্ণালোকিত হয়ে উঠেছে। আঁধার কেটে গিয়ে আলোর রোশনাই ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। একুশে পদক অর্জনকারী প্রথিতযশা সাংবাদিক সাহিত্যিক স্বদেশ রায় এই তো সেদিন (১৮ অক্টোবর) লিখেছিলেন তাঁর কলামে ‘মাত্র ৫৪ হাজার বর্গমাইলের এই দেশটিতে প্রায় ১৭ কোটি মানুষকে শুধু চাল নয়, ডিম, মাছ, সবজি, মাংস ও ফলমূল খাওয়াচ্ছেন কীভাবে, তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।’ কৃষির উন্নয়ন এমন হয়েছে যে, কারও ঘরে আজ চাল আর বাড়বাড়ন্ত নয়। দু’বেলা দু’মুঠো খেয়ে দেয়ে শান্তির নীড়ে অবগাহন করছে একদা দরিদ্র মানুষ। গত দশ বছরে বাংলাদেশকে শেখ হাসিনা যেখানে নিয়ে এসেছেন, প্রতিটি গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা তার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র একটি খন্ডচিত্র বলা যায়। এ এক অভাবনীয়, অকল্পনীয় দৃশ্যপট। যে গ্রামগুলোতে দশ বছর আগে যারা গিয়েছেন, দশ বছর পরে যখন তারা যাচ্ছেন, বিস্ময়ে তাদের চোখ ছানাবড়া বলা যায়। পাল্টে গেছে সবকিছু। উপজেলাগুলো শহরে পরিণত হয়েছে। আধুনিকায়ন আর উন্নয়নের ছোঁয়া তার সর্বত্র। এমনই উপজেলা বাজিতপুর ও নিকলী। দুটো উপজেলা মিলে জাতীয় সংসদের ১৬৬ এবং কিশোরগঞ্জ-৫ আসন। হতদরিদ্র অঞ্চল হিসেবে যার অবস্থান ছিল একযুগ আগেও। সেই দুটি উপজেলা আজ উন্নত জনপদে পরিণত হয়েছে। আলাদিনের জাদুর চেরাগের স্পর্শে নয়, শেখ হাসিনার স্বপ্নপূরণের বাস্তবতায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের একান্ত প্রচেষ্টা ও নিরলস পরিশ্রমে তা আজ আঞ্চলিক উন্নয়নের ‘রোল মডেল’ হিসেবে পরিগণিত।

সারা বিশ্ব আজ উন্নয়নশীল দেশের তকমা পরিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশকে। সেই দেশেরই প্রত্যন্ত অঞ্চল কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর-নিকলী। স্বাধীনতার পর ৪৭ বছরের উন্নয়নের ইতিহাসে এই দুটি জনপদ আজ জাতির জন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। উন্নয়নের আরেক নাম শেখ হাসিনা মনোনীত বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী হিসেবে যার নাম বিধৃত, তিনি মোহাম্মদ আফজাল হোসেন। নবম ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন এলাকাবাসীর। সততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করে তিনি আজ সর্বজননন্দিত নেতা। মানুষের ভালবাসায় এই জনপদের মাটি আর মানুষের নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। জননেত্রীর মতোই তার বিশ্বাস ‘রাজনীতি করতে হলে জনগণের পাশে থাকতে হবে, জনগণের মৌলিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। তাদের ন্যায্যতা যেন হরণ না হয় তা নিশ্চিতে পদক্ষেপ নিতে হবে।’ এই বিশ্বাস ধারণ করেই তিনি জনগণের সুখ-দুঃখের সাথী। জনপ্রতিনিধি হিসেবে গত দশ বছরে নিজের স্বীয় অবস্থান তৈরি করেছেন। ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য হয়ে উঠেছেন অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

রাজনীতির বাইরেও তিনি দেশ বরেণ্য একজন ব্যবসায়ী। সমাজসেবায় তার পারিবারিক ঐতিহ্যও রয়েছে। দশ বছর ধরে তিনি বাজিতপুর উপজেলার একটি পৌরসভা, ১১টি ইউনিয়ন এবং নিকলী উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছেন। এসব এলাকার বেশিরভাগই ছিল সুবিধাবঞ্চিত। কিন্তু বিগত দশ বছরে বদলে গেছে সবই। শুধু সরকারী অনুদানই নয়, কোন কোন ক্ষেত্রে তার ব্যক্তিগত অনুদানও যুক্ত হয়েছে এই পরিবর্তনে। শেখ হাসিনার কল্যাণে আফজাল হোসেনের হাত ধরে বদলে গেছে জনপদ দুটি।

বাজিতপুর-নিকলীতে গত ১০ বছরের মোট উন্নয়ন হয়েছে দুই হাজার দুই শ’ একাত্তর কোটি দশ লাখ একচল্লিশ হাজার টাকার। জানা গেছে, আরও এক হাজার কোটি টাকার কাজ চলমান। খাতওয়ারি চিত্রটি এভাবে তুলে ধরা যায় এভাবেÑ শিক্ষাবান্ধব সরকারের যোগ্য প্রতিনিধি আফজাল হোসেন। ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই অঞ্চলের শিক্ষার বাতিঘর বাজিতপুর। উপজেলার এই শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। তার একান্ত আগ্রহে বর্তমানে কলেজটিতে কয়েকটি বিষয়ে অনার্সসহ মাস্টার্স কোর্স চালু বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। এই অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার প্রসারে এটি একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। বর্তমান সরকারের আমলে বাজিতপুর সরকারী কলেজের একাডেমিক ভবন নির্মাণসহ দশ কোটি ছাপ্পান্ন লাখ সাতষট্টি হাজার টাকার উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে। উন্নয়ন কাজ হয়েছে নিকলী মুক্তিযোদ্ধা আদর্শ সরকারী কলেজের উন্নয়নমূলক কাজেরও। এই কলেজের একাডেমিক ভবন, বর্ধিত শ্রেণীকক্ষ উন্নয়নসহ চার কোটি একত্রিশ লাখ পনেরো হাজার টাকার উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়ন হয়েছে। উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষার উন্নয়নে দুই উপজেলায় কাজ হয়েছে পয়ষট্টি কোটি বাষট্টি লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকার। এর মধ্যে বাজিতপুরে সাঁইত্রিশ কোটি ছিয়াশি লাখ টাকা এবং নিকলীতে সাতাশ কোটি ছিয়াত্তর লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা। প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে নিকলীর ৬১টি স্কুলে এগারো কোটি আটষট্টি লাখ সতেরো হাজার টাকা এবং বাজিতপুরে ১০১টি স্কুলে বত্রিশ কোটি এগারো লাখ ছিয়াশি কোটি টাকার কাজ হয়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল কার্যালয়ের আওতায় কাঁচা-পাকা সড়ক ও বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নে নিকলী উপজেলায় তিন শ’ ছিয়াশি কোটি ছিয়াশি লাখ টাকার উন্নয়ন হয়েছে। বাজিতপুর উপজেলায় একই আওতায় এক শ’ ছাপ্পান্ন কোটি চৌষট্টি লাখ ঊনষাট হাজার টাকার সমধারার কাজ হয়েছে। কিশোরগঞ্জের এই নির্বাচনী এলাকায় বিদ্যুতের অভাবনীয় সাফল্য এসেছে। বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময় বিদ্যুত কখন আসবে তার অপেক্ষার প্রহর ছিল নিরন্তর। আর এখন বিদ্যুত পর্যাপ্ত। নিকলী উপজেলায় শতভাগ মানুষ এখন বিদ্যুত সুবিধা পাচ্ছে। বাজিতপুরে শতভাগ সুবিধা পূর্ণ হওয়ার পথে। দুই উপজেলায় ৩৯০০ ট্রান্সফরমারের আওতায় গ্রাহক সংখ্যা এখন ৫৬ হাজার। এই জন্য দুই উপজেলায় দুটি সাবস্টেশন রয়েছে। এই খাতে ইতোমধ্যে ৫০০ কোটি টাকার কাজ হয়েছে, আরও ১৫০ কোটি টাকার কাজ চলমান। নাগরিকদের সবচেয়ে জনগুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে স্বাস্থ্যখাত। স্বাস্থ্যসেবায় মানুষের দোড়গোরায় পৌঁছে দিতে নিকলী ও বাজিতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স দুটিকে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। এছাড়া বাজিতপুরে ৪টি উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ২৬টি কমিউনিটি ক্লিনিক এবং নিকলীতে ১৬টি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হয়েছে। এই খাতে দুই উপজেলায় বাইশ কোটি পঞ্চাশ লাখ টাকার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

নদীমাতৃক এই নির্বাচনী আসনটিতে পানি উন্নয়ন বোর্ড উপজেলার শ্রেষ্ঠ প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান। এর আওতায় হাওড়ের বন্যা ব্যবস্থাপনা, বেড়িবাঁধ নির্মাণ, খাল খনন, সøুইস গেট নির্মাণ, ডুবন্ত বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নদীভাঙন রোধ, ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও জীবনমান উন্নয়নে নিকলী উপজেলায় ৯৮ কোটি টাকা এবং বাজিতপুর উপজেলায় ১০৯ (দুই উপজেলায় দুই শ’ সাত) কোটি টাকার কাজ হয়েছে। হাওড় উপজেলা বাজিতপুর-নিকলী মূলত কৃষি প্রধান এলাকা। এখানকার অর্থনীতির চালিকাশক্তি কৃষি।

দুই উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের আওতায় বিনামূল্যে কৃষি উপকরণ বিতরণসহ নানা উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে ৮৯ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে।

দুই উপজেলায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের আওতায় খাদ্যশস্য, কালভার্ট নির্মাণ এবং নগদ বিতরণসহ ৫০ (পঞ্চাশ) কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হয়েছে। ইসলামী ফাউন্ডেশনের অধীনে মসজিদভিত্তিক শিক্ষাসহ দুই উপজেলায় আটাশ কোটি সাতান্ন লাখ ষোলো হাজার টাকা ব্যয়ে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়। পল্লীর সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার সারাদেশে বেশ কিছু উন্নয়নমূলক প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর আওতায় বাজিতপুর ও নিকলী উপজেলায় ১৯ কোটি ৫০ লাখ টাকার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাজিতপুর উপজেলায় ৪টি ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণে তিন কোটি আটষট্টি লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। গ্রামীণ জনপদের স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন ও পানীয় জলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে দুই উপজেলায় পনেরো কোটি টাকা উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ চত্বর, কমিউনিটি সেন্টার, স্মৃতিসৌধসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে ৩১ কোটি ৮১ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।

উপজেলা সমাজসেবা উন্নয়নের আওতায় দুই উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষার্থী, বিধবা, প্রতিবন্ধী ভাতাসহ বিভিন্ন খাতে ৫৮ কোটি ২০ লাখ টাকার উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালন করা হয়েছে। যুব উন্নয়ন অধিদফতরের আওতায় যুব সমাজকে কর্মমুখী করতে দুই উপজেলায় ৫ কোটি চার লাখ টাকার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। একটি বাড়ি একটি খামারের আওতায় দুই উপজেলায় ২১ কোটি ৮ লাখ টাকার উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন হয়েছে। বাজিতপুর পৌরসভার উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ১১ কোটি ৬৯ লাখ ১৪ হাজার ৯৮৯ টাকা ব্যয় হয়েছে। এছাড়া মৎস্য সম্পদ অধিদফতরের আওতায় ১২৫৯৬ জন মৎস্যজীবীকে আইডি কার্ড দেয়া হয়েছে, সমবায় উন্নয়নে বাজিতপুরে ১৮০টি এবং নিকলীতে ১৬৩টি সমবায় সমিতি গঠন করা হয়েছে, উপজেলা মহিলাবিষয়ক উন্নয়নে, ধর্মভিত্তিক সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নে, ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে সামাজিক সকল উন্নয়ন সূচকে। এই উন্নয়ন চিত্র কেবল একটি সংসদীয় এলাকারই নয়, এটি শেখ হাসিনার মানবিক বাংলাদেশের চিত্র। শেখ হাসিনার মানবিক বাংলাদেশ গড়ার রূপকার, সমৃদ্ধির বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা তাঁর অঙ্গীকার। তিনি দেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে তুলে এনেছেন-শেখ হাসিনার এই প্রচেষ্টার যোগ্য সৈনিক আফজাল হোসেন। এক কথায় মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় শেখ হাসিনার পাশে তিনি। সারাদেশে শেখ হাসিনার উন্নয়নের খন্ডাংশ এই দুটি জনপদ আরও এগিয়ে যাবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক