১৮ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাণিজ্য যুদ্ধ ও বাংলাদেশ

গত মার্চ থেকে শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ। পৃথিবীর বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে চীন হচ্ছে দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। সেক্ষেত্রে দুই বৃহৎ হস্তির তুমুল লড়াই শুরু হলে তার কমবেশি প্রভাব বিশ্বের অন্যান্য দেশে না পড়ে পারে না। যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের অন্য দেশগুলো একে অপরের পণ্যের ওপর ট্যারিফ ও পাল্টা ট্যারিফ আরোপের ফলে যে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়েছে, তাতে মূলত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব অনুযায়ী বাণিজ্য যুদ্ধের আর্থিক প্রভাবের পরিমাণ প্রায় ৪৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিশ্বের জিডিপির প্রায় ০.৫ শতাংশ। বাণিজ্যযুদ্ধের ফলে বৈশ্বিক জিডিপির ০.৮১ শতাংশ ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে দীর্ঘমেয়াদী মন্দার। সেজন্য বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোকে যথাযথ প্রস্তুতি নিতে হবে এখন থেকেই। সে অবস্থায় চলমান সঙ্কট এবং অব্যাহত অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় খোঁজার লক্ষ্যে শনিবার ডিসিসিআই তথা ঢাকা চেম্বার এবং ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট এক সেমিনারের আয়োজন করে। এর অন্যতম বিষয় ছিল, ‘বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধ এবং বাংলাদেশে তার প্রভাব’ সম্পর্কিত।

সত্য বটে, বিশ্ববাণিজ্যযুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশে অদ্যাবধি তেমন অনুভূত হয়নি। বরং আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকসহ সার্বিকভাবে আমাদের রফতানি আয় বেড়েছে। তবে শঙ্কা রয়ে গেছে আগামীতে। বিশ্ববাজারে ইতোমধ্যে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে। শুরুতে চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধ ইস্পাত ও এ্যালুমিনিয়াম নিয়ে শুরু হলেও এখন তৈরি পোশাক, খাদ্যপণ্যসহ অন্যবিধ পণ্যেও শুল্কারোপ করা হচ্ছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য নতুন নতুন দেশ ও বাজার খুঁজতে বাধ্য হবে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য। বাংলাদেশ হতে পারে এর জন্য অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান। কেননা বাংলাদেশের রয়েছে অফুরন্ত জনসম্পদ। যাদের একটি বৃহৎ অংশ তরুণ। এও সত্য যে, আমাদের দক্ষ মানবসম্পদ, অবকাঠামো উন্নয়নসহ বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে কিছু ঘাটতি রয়েছে। এর পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও রয়েছে। উদাহরণত বলা যায়, বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে চীন থেকে ইতোমধ্যে পোশাকশিল্পসহ ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেক্ট্রনিক্স পণ্যদ্রব্য উৎপাদনের কারখানাগুলো অন্য দেশে স্থানান্তরের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এক্ষেত্রে চীনের কাছে অগ্রাধিকার পেতে পারে ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া। কেননা সেসব দেশে দক্ষ মানবসম্পদ, অবকাঠামোসহ বৈদেশিক বিনিয়োগের অফুরান সুযোগ রয়েছে। যেমন, ভিয়েতনামের মোট রফতানির ৫২ শতাংশ এসে থাকে বৈদেশিক বিনিয়োগ থেকে। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে অনেক।

বর্তমান সরকার অবশ্য এসব দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে যথাযথ পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। বিদ্যমান ইপিজেডের বাইরে দেশের বিভিন্ন স্থানে নতুন ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এসব স্থানে অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে। ব্যাংক ঋণের সুদহার কমানো হয়েছে ইতোমধ্যে। দেশ এখন বিদ্যুত উৎপাদনে অনেকটাই স্বনির্ভর। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্রসহ একাধিক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্র বিনির্মাণের পথে। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির জন্য সবিশেষ জোর দেয়া হয়েছে বৃত্তিমূলক কারিগরি শিক্ষার ওপর। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতিও আশাব্যঞ্জক। প্রবাসী আয়ও ইতিবাচক। সে অবস্থায় বিদেশী বিনিয়োগ না আসার কোন কারণ নেই। গত কয়েক বছর ধরে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ-পরিস্থিতিও বলা চলে স্থিতিশীল। এর পাশাপাশি বিদেশে বাণিজ্যিক মিশনগুলোকে আরও সক্রিয় করে তুলতে হবে। প্রতিবেশী দেশ ভারত, চীন, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্য এমনকি ইইউ ও ব্রিটেনের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কও বেশ ভাল। সুতরাং বাণিজ্যযুদ্ধ মোকাবেলায় যথাযথ কৌশল নির্ধারণ করে পরিকল্পনামাফিক অগ্রসর হলে পরিস্থিতি বাংলাদেশের অনুকূলে আসতে বাধ্য।