২৪ জানুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কার্বন কর!

শব্দটি বাংলাদেশের কাছে প্রায় অচেনা। জিজিয়া কর, নীলকর, ভূমিকর, আয়কর, হোল্ডিং কর ইত্যাকার করের সঙ্গে পরিচিত এই বঙ্গদেশের মানুষ সেই মুঘলকাল থেকে আধুনিককাল পর্যন্ত সময়ে। কিন্তু কার্বন কর-এর সঙ্গে পরিচয় দূরে থাক, এই শব্দটিই যেন অচেনা। কিন্তু সেই করের ভার বইবার জন্য বাংলাদেশকে চাপ দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। এ কর হচ্ছে, জ্বালানি ব্যবহারের ফলে যে কার্বন নির্গত হয় তার ওপর ধার্য কর। কার্বন ডাই অক্সাইড উৎপাদনের জন্য অর্থাৎ পরিবেশ দূষণের কারণে জ্বালানি ব্যবহারকারীকে যে কর দিতে হয় সেটিই কার্বন কর হিসেবে পরিচিত। সাধারণত পেট্রোল, ডিজেল, কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাসসহ সব ধরনের জীবাশ্ম জ্বালানিতেই কার্বন বিদ্যমান। এসব পুড়িয়ে শক্তি উৎপাদন করলে কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে তুলনায় বাংলাদেশে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা অত্যন্ত কম হলেও এখনই দেশে কার্বন কর বসাতে বিশ্বব্যাংকের চাপ বাড়ছে। বিশ্ব ব্যাংকের হিসেবে বাংলাদেশে কার্বন কর আরোপ করা হলে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়বে এক শতাংশ। অথচ বাংলাদেশে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা খুব কম। যারা মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ করে তারাই এখন পর্যন্ত কর বসায়নি। এখনই কেন কার্বন কর বসানোর কথা আসছে তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। ফ্রান্স, জাপান, সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডসসহ বিশ্বে এখন পর্যন্ত ১৬ দেশ কার্বন কর বসিয়েছে। বাংলাদেশে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ মাত্র ১৫২ মিলিয়ন টন। পরিবেশ অধিদফতরের গবেষণায় বলা হয়ছে, এ দেশে সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ হয় জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে, ৭৩ মিলিয়ন টন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কার্বন নিঃসরণ হয় কৃষি খাত থেকে ৪৬ মিলিয়ন টন। এর পরে আছে বর্জ্য খাত-২৩ মিলিয়ন টন। আইপিপিইউ খাত হতে নিঃসরণ হয় এক মিলিয়ন টন। যদিও চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে তুলনা করলে এ হার খুবই নগণ্য। চীনে এক হাজার বিলিয়ন টনের বেশি। যুক্তরাষ্ট্র ছয় শ’ বিলিয়ন টন। সারা বিশ্বে যত কার্বন নিঃসরণ হয় তার ২৭ শতাংশ হয় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনে। ইইউতে ১০ শতাংশ, ভারতে সাত শতাংশ এবং রাশিয়ায় পাঁচ শতাংশ। বাংলাদেশে মাথাপিছু নিঃসরণ হয় মাত্র শূন্য দশমিক ৯৮ টন। অথচ চীনে ১৬ টনের বেশি, যুক্তরাষ্ট্রে ১২ টনেরও বেশি। বাংলাদেশে এখনও এক টনও হয়নি। ২০১০ সালে বাংলাদেশে নিঃসরণ ছিল মাত্র ৬০ মিলিয়ন টন। তা এখন বেড়ে হয়েছে ১৫২ মিলিয়ন টন। গত দশ বছরে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জ্বালানি তেলের ব্যবহার বেড়েছে। জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন কাজে পুড়ছে জ্বালানি। জ্বালানি তেল থেকে যেহেতু কার্বন নিঃসরণ বেশি হয়, তার প্রভাব পড়েছে সার্বিকভাবে। অর্থমন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো কার্বন কর আরোপের চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে। তবে শীঘ্রই তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা অবশ্য এই করের ঘোর বিরোধী। বেসরকারী গবেষণা সংস্থাগুলো অবশ্য অর্থনীতি ও পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে কর বসানোর পক্ষপাতী। তারা দেশে পেট্রোল ও ডিজেলের ওপর দশ শতাংশ হারে কার্বন কর বসানোর জন্য প্রস্তাব রেখে বলেছে, এতে বছরে বাড়তি চার হাজার তিন শ’ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দশ লাখ টন কার্বন নিঃসরণ কমে যাবে। কর আদায়ের হারও বাড়বে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত যেভাবে যুদ্ধ করছে তাতে কার্বন কর সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। এ খাতে অর্জিত অর্থ জলবায়ু পরিবর্তন খাতে ব্যয় করা যেতে পারে। হাতে গোনা কয়েকটি পণ্যের ওপর কর বসালে তা আদায় সহজ হবে। বাস্তবতাবিবর্জিত কোন করারোপ হিতে বিপরীত হতে পারে।

এই মাত্রা পাওয়া