২৪ জানুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্বাধীনতার জন্য আত্মদান

  • শহীদ নজরুল

বাশার খান ॥ মুক্তিযুদ্ধকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র ও দেশমাতৃকার অকুতোভয় সৈনিক নজরুল ইসলামের ৪৭তম শহীদ দিবস আজ। ১৯৭১ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলে প্রায় এক মাস ধরে অকথ্য নির্যাতনের পরও মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে কোন তথ্য বের করতে না পেরে ২১ নবেম্বর রাতে নজরুলসহ ৩৮ জন [কারও কারও মতে সংখ্যাটা আরও বেশি] মুক্তিযোদ্ধাকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী জেল থেকে নিয়ে যায়। সে রাতেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের পৈরতলা রেলব্রিজ সংলগ্ন খালপাড়ে তাদের হত্যা করে হানাদাররা।

কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার সুন্দলপুর গ্রামের কৃতী সন্তান শহীদ নজরুল ইসলাম ১৯৭১ সালে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। তার আগে ঢাকা কলেজে পড়াকালীন ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হন। দায়িত্ব পালন করেন ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) হিসেবে। ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৬৯ সালে এইচএসসি পাস করে সে বছরই নজরুল ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। ততদিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং শেখ কামাল, শেখ ফজলুল হক মণি ও শেখ সেলিমসহ বিশিষ্ট ছাত্রনেতাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে নজরুল সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন অল্প সময়েই।

নজরুল থাকতেন ফজলুল হক হলের নিচতলার ১১৭ নম্বর রুমে। তাঁর রুমের পরিবেশ এমন ছিল যে, কেউ রুমে প্রবেশ করলেই বোঝা যেত- বাঙালীর অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রামে এক নির্ভীক সৈনিকের রুম এটি। নজরুলকে চেনে না, এমন ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে কমই ছিল তখন। তাঁর কক্ষের দেয়ালে লেখা ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এক বাণী ‘আমার জীবন দিয়ে হলেও বাঙালীদের পথের নিশানা দিয়ে যাব।’ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এই বাণীকেই নিজের করে নিয়েছিলেন নজরুল। দেখিয়েছেন দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য কীভাবে জীবন উৎসর্গ করতে হয়।

২ মার্চ ১৯৭১, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে অনুষ্ঠিত স্মরণকালের বিশাল জনসভায় স্বাধীন বাংলার পতাকা প্রথম উত্তোলন করেছিলেন তখনকার ডাকসু ভিপি আসম আব্দুর রব। উত্তোলনের আগ মুহূর্তে সেই পতাকা বহন করে জনসভাবেশে নিয়ে এসেছিলেন নজরুল ইসলামÑ এমনই তথ্য পাওয়া যায় প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতিচারণে। ২ মার্চ মিছিলে অংশগ্রহণকারী তৎকালীন ফজলুল হক হলের ছাত্র এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ আনোয়ার হোসেন স্মৃতিচারণে লিখেন, ‘...ফজলুল হক হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন বাংলা বিভাগের নজরুল ইসলাম; যে কোন মিছিলে ¯েøাগানে উচ্চকিত নজরুল। ২ মার্চ এই নজরুল একটি বড় মিছিলের অগ্রভাগে স্বাধীন বাংলার পতাকা হাতে বটতলায় এসেছিলেন। সে পতাকাটি উত্তোলন করেছিলেন আসম আব্দুর রব।’ [সঙ্কলন গ্রন্থÑ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান, ২০১২, পৃষ্ঠাÑ২৯৭] এই তথ্যের অনুরূপ বক্তব্য দিয়েছেন এ ঘটনার আরেক প্রত্যক্ষদর্শী ও বর্তমান ‘ডাকসু সংগ্রহশালা’র সংগ্রাহক এবং আলোকচিত্রী গোপাল দাস। তিনি তাঁর ‘মণিদীপ্ত ক্যাম্পাস’ শীর্ষক স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘... ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল স্মরণকালের বৃহত্তম জনসভা। মিছিলের অগ্রভাগে তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা নজরুল ভাই বিশাল পতাকা নিয়ে এগিয়ে আসছেন। ...একপর্যায়ে বাংলাদেশের পতাকাটি অস্থায়ী মঞ্চের দিকে এগিয়ে নিয়ে যান ছাত্রনেতা নজরুল ভাই। সে সময় ডাকসু ভিপি আসম আব্দুর রব নিচ থেকে পতাকাটি অস্থায়ী মঞ্চে তুলে দেন। পরে সংগ্রাম পরিষদের উপস্থিতিতে পতাকাটি মঞ্চে উত্তোলন করেন।’ [মণিদীপ্ত ক্যাম্পাস, পৃষ্ঠা- ২৯] .

২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ঢাকায় আক্রমণের পর নজরুল চলে যান ভারতের আগরতলায়। সেখানে প্রশিক্ষণ নেন। দেশে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। গোপনে ঢাকায় ছাত্রদের সংগঠিত করে প্রশিক্ষণের জন্য আগরতলায় দিয়ে আসতে শুরু করেন। যেতেন দাউদকান্দিতেও। সেখানকার ছাত্র-যুবকদেরও ছোট ছোট দলে বিভক্ত করে কৌশলে সীমান্ত পার করে আগরতলা নিয়ে যেতেন। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছাত্র-যুবকদের দেশে এনে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন গেরিলা দলে সরবরাহ করতেন। পরবর্তীতে বিএলফ [বাংলাদেশে লিবারেশন ফোর্স, মুজিব বাহিনী নামেও পরিচিত] গঠিত হলে নজরুল ইসলাম দাউদকান্দি থানার বিএলএফের কমান্ডার নিযুক্ত হন।

২৭ অক্টোবর ১৯৭১ (রমজান মাস) তৎকালীন মোহাম্মদপুর থানার দারোগা শহীদ সিরু মিয়া, তাঁর ছেলে শহীদ কামাল, বিএলএফ কমান্ডার শহীদ নজরুলসহ ৬ জন মুক্তিযোদ্ধা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা থানার এক রাজাকারের বিশ্বাসঘাতকতায় ধরা পড়েন। নজরুল ও সিরু মিয়া দারোগা ধরা পড়েন রিভলবারসহ। এরপর তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলে। সেদিন বিকেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে স্থানীয় রাজাকাররা মাইকে প্রচার করে, ৬ জন দুর্ধর্ষ দুষ্কৃতকারী ধরা পড়েছে। এরপর জেলে বন্দী নজরুলের ওপর চলে অমানবিক নির্যাতন। উদ্দেশ্যÑ মুক্তিবাহিনীর বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য বের করা। কিন্তু নজরুলের শরীর যেন হয়ে ওঠে পাথরের মতো। তাঁকে শত নির্যাতনের পরও কোন তথ্য বের করতে পারেনি হানাদার বাহিনী।

মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত আসামি গোলাম আযমের বিরুদ্ধে করা মামলার অভিযোগে উল্লেখ ছিল নজরুল, সিরু মিয়া দারোগাসহ ৩৮ জন মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যার ঘটনা। সেই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম সাক্ষী ছিলেন নজরুলের সঙ্গে জেলে থানা জনপ্রিয় সুরকার, গীতিকার ও শিল্পী আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। ঈদের রাতে নজরুলসহ ৩৮ জন মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যার ঘটনার করুণ বর্ণনা ছিল আদালতে দেয়া আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের বক্তব্যে। তিনি বলেন, ‘...শহীদ নজরুল তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। তাকে একদিন পালিয়ে যেতে বললে তিনি আমাকে মারধর করে বলেছিলেন, মুক্তিযোদ্ধারা পালাতে শেখেননি। এখান থেকে ফুলের মালা গলায় দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা একদিন আমাদের মুক্ত করে নিয়ে যাবে। ... [হত্যার জন্য জেল থেকে বের করে নেয়ার সময়] আমি নজরুল ভাইয়ের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করি, আপনি তো পালিয়ে গেলেন না। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, আমার কিছু বলার নেই রে। এই লুঙ্গিটা আমার মায়ের কাছে পৌঁছে দিস। একটি সিগারেটের টুকরা দেখিয়ে সেটিও দিতে বলেন। কামালের বাবা সিরু মিয়া দারোগা বার বার কাঁদছিলেন। তখন কামাল তাঁর বাবাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে বলে, বুলবুল, যদি কোন দিন রাস্তায় কোন পাগলিকে দেখিস, তাহলে মনে করিস, ওটাই আমার মা। নজরুল বলেছিলেন, যখন কোন পাকিস্তানী আর্মি দেখবি, একটা করে মাথায় গুলি করবি। ...আমি চাদর দিয়ে প্রত্যেকের চোখের পানি মুছে দিয়েছিলাম।’ [সাক্ষ্য দিতে গিয়ে কাঁদলেন, কাঁদালেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, banglanews24.com, ৪ অক্টোবর ২০১২]

এরপর

ঈদের দিন গভীর রাতেই পৈরতলা খালপাড়ে লাইনে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হয় নজরুলসহ ৩৮ মুক্তিযোদ্ধাকে। শহীদদের লাশ ফেলে দেয়া হয় পৈরতলা খালে। সেখানে এখন ইটের গাঁথুনি দিয়ে কোন রকমভাবে তৈরি একটি স্মৃতিচিহ্ন আছে। কিন্তু সে জায়গাটি আজ জঙ্গলে পরিণত। পরে আছে অযত্ন-অবহেলায়। স্বাধীনতা জন্য নজরুল ইসলামের আত্মদান দেশপ্রেমের উজ্জ্বল উদাহরণ। নজরুলের মতো সাহসী দেশপ্রেমিকরা বাংলার মাটিতে জন্মেছিল বলেই পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীকে অল্প সময়েই স্বাধীনতাকামী বাঙালীদের কাছে পরাজয় বরণ করতে হয়েছিল। তরুণ প্রজন্মের জন্য দেশপ্রেম বোঝার, জানার ও ধারণ করার অন্যতম উপকরণ নজরুলের আত্মত্যাগের ঘটনা। ৪৭তম শহীদ দিবসে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান শহীদ নজরুল ইসলামের অনবদ্য অবদান ও স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।

লেখক : মুক্তিযুদ্ধ গবেষক এবং সাংবাদিক

basherkhandu@gmail.com

এই মাত্রা পাওয়া