১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ভূমি ও পানি সম্পদের উপর সবার অধিকার নিশ্চিত করার তাগিদ

ভূমি ও পানি সম্পদের উপর সবার অধিকার নিশ্চিত করার তাগিদ

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ ভূমি ও পানি সম্পদের উপর সকল নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ভূমি ও পানি পাওয়ার ক্ষেত্রে এশিয়ায় বৈষম্য সবচেয়ে বেশি। আর এক্ষেত্রে নারীরা আরও বেশি পিছিয়ে আছে। বৈশ্বিক এ সঙ্কট থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। বাংলাদেশেও ভূমির সঠিক প্রাপ্যতা ও বণ্টন ব্যবস্থায় ত্রুটি রয়েছে। কিন্তু ভূমি ও পানির অধিকার নিশ্চিতে দেশে যথাযথ আইন-কানুনও রয়েছে। এসব আইনের সঠিক বাস্তবায়ন জরুরী প্রয়োজন।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে এ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম এ্যান্ড ডেভলপমেন্ট ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এনগকের যৌথ উদ্যোগে ‘এশিয়ায় ভূমি ও পানি ব্যবস্থাপনায় সঠিক বণ্টন’ শীর্ষক দ’ুদিনব্যাপী অনুষ্ঠিত (২৯-৩০ নবেম্বর) কর্মশালায় আলোচকরা এসব কথা বলেন। মানবাধিকার কর্মী ও এএলআরডির চেয়ারপার্সন খুশী কবিরের সভাপতিত্বে আলোচনায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি বেলা’র প্রধান নির্বাহী এ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। বাংলাদেশ ছাড়া ভারত, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন এবং কম্বোডিয়ার প্রতিনিধিগণ কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন। ওই সময় উপস্থিত ছিলেন এএলআরডি’র নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদাও।

আলোচকরা বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সবচেয়ে বিপদগ্রস্ত দেশগুলোর শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের এ প্রভাব দৃশ্যমান হওয়ার পাশাপাশি নিম্ন আয় এবং জলবায়ু উদ্বাস্থদের প্রাপ্য সরকারি খাস জমি এবং জলাধার এক শ্রেণীর রাজনীতিবিদ, আমলা, ভূমি ব্যবসায়ীরা দখলের মহোৎসবে নেমেছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে উপকূল অঞ্চলের মানুষ নিজ বাস্থভিটা থেকে উচ্ছেদিত হচ্ছে এবং এ অঞ্চলের খাবার পানির উৎসসমূহে লবণাক্ততা বেড়ে সেগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যাচ্ছে।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, ভূমি ও পানিখাতে দেশের সব মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম পূর্বশত। দেশের সংবিধানেও এ অধিকার নিশ্চিত করার জন্য সমঅধিকারের কথা বলা হয়েছে। অথচ এশিয়াসহ বাংলাদেশে দিনদিন ভূমি ও পানি ব্যবস্থায়পনায় সঙ্কট গভীর হচ্ছে। ভূমিদস্যু ও জলদস্যুদের হাতে চলে যাচ্ছে এই দুইখাত।

এ কারণে সমাজের একটি শ্রেণী ফুলেফেঁপে উঠলেও সুবিধাবঞ্চিতরা ভূমিহীন হয়ে পড়ছেন। ফলে দেশে ভূমিহীন মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। একই অবস্থা বিরাজ করছে পানির ক্ষেত্রেও। নদী, নালা দখল হয়ে যাচ্ছে। ফলে জাল যার তার আর জলা থাকছে না। এছাড়া সুপেয় পানি পাওয়াও একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ দেশে এসব বিষয়ে ভাল আইনকানুন রয়েছে। এসব আইনের বাস্তবায়ন জরুরী। বাংলাদেশের পাশাপাশি এশিয়ার অন্যান্য দেশেও ভূমি ও পানি ব্যবস্থাপনা ত্রুটি রয়েছে।

বক্তারা আরও বলেন, বলেন, কৃষি ও ভূমিতে নারীর অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। অথচ এই সেক্টরে নারীর অবদান সবচেয়ে বেশি। ৬৬ শতাংশ গ্রামীণ নারী কৃষিকাজে সম্পৃক্ত। এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে প্রযোজ্য আইন সংশোধন করে নারীর ক্ষমতায়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। খুশী কবির বলেন, নারীরা এখনও ভূমি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একই সঙ্গে তারা মজুরি-বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

এই বৈষম্য যাতে না থাকে, সেজন্য নীতিনির্ধারকদের এগিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় পুরুষের ভূমিকা কম নয়। নারী-পুরুষ উভয়কে মিলেই দেশের উন্নয়নে একযোগে কাজ করতে হবে। এজন্য পুরুষদের মানসিকতারও পরিবর্তন ঘটাতে হবে। নয়তো নারী সর্বক্ষেত্রে উপেক্ষিতই থাকবেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ন্যায় ভারত, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া এবং কম্বোডিয়ার মতো রাষ্ট্রে ভূমি ও পানি ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে।

বিশেষ শ্রেণী ভূমিহীন হয়ে পড়ছে। সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, সকলের জন্য ভূমি ও পানির অধিকার নিশ্চিতে রাষ্ট্রকেই দায়িত্ব নিতে হবে। এছাড়া আদিবাসীদের ভূমি অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তাদের জন্য কেবল ভূমি কমিশনই যথেষ্ট নয়, তাদের জন্য স্বতন্ত্র ভূমি আইনও করা প্রয়োজন।

প্রসঙ্গত, এ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ভূমি অধিকার রক্ষা ও ভূমি সংস্কার বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে এএলআরডি ১৯৯১ সালে একটি নীতি নির্ধারণী, এ্যাডভোকেসি এবং নেটওয়ার্কিং সংস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ভূমি অধিকার নিয়ে কাজ করছে এই সংগঠনটি।

আলোচনা সভায় বেশকিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়-ভূমি এবং পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট সকলের জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ভূমি ও পানি সম্পদের উপর সকল নাগরিকের অধিকার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রকল্প বাস্তবায়নে নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। পানি সম্পদকে উন্নয়ন ও জনগনের জীবনমান পরিবর্তনের লক্ষ্যে কার্যকর ভাবে ব্যবহারের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

ভূমি ও পানি সম্পদে দখলদারিত্ব বন্ধ করতে হবে এবং ভূমি ও পানি সম্পদ খাতে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি বিশেষ করে দায়িত্বে অবহেলা, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। বিষাক্ত পদার্থ সরাসরি জলাধারে নির্গমনবন্ধ কররা প্রয়োজন। এছাড়া ভূমি ও পানি সম্পদ রক্ষায় কার্যকর আইন প্রয়োগ করতে হবে এবং জীব ও প্রাণী বৈচিত্র্য সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।