১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

উন্নয়নের অভিযাত্রায় অদম্য বাংলাদেশ

  • ড. এম. শাহ্ নওয়াজ আলী

‘শাবাশ বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়: জ্বলে-পুড়ে, মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়।’ দ্রোহের কবি প্রতিবাদী কবি সুকান্তের বিখ্যাত দুর্মার কবিতার পঙ্ক্তিগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে আজ বলতে চাই- সত্যিই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি কখনও মাথা নোয়াবার নয়!! গাঙ্গেয় অববাহিকার পলল সমৃদ্ধ এ ভূ-খ-টি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছেন এক রূপকথার গল্পের শিরোনাম। মাত্র ৪৭ বছর আগে স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ৩০ লাখ প্রাণের বিনিময়ে বিশ্ব মানচিত্রে ৫৫ হাজার বর্গমাইলের একটি দেশ সৃষ্টি হয়। জাতির জনকের ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, শিক্ষিত ও আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার বুক ভরা স্বপ্ন মাত্র তিন বছর সাত মাস ছয় দিনের মাথায় ধূলিসাৎ করে দেয় ১৫ আগস্টের ঘাতকচক্র। তারপরও বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন। দীর্ঘ ২১ বছর রক্তাক্ত বাংলাদেশের ইতিহাস, গণতন্ত্রকে হত্যা করে সামরিকতন্ত্রের ইতিহাস, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মৌলবাদী রাজনীতিকে জায়েজ করার ইতিহাস আমাদের সকলের জানা। ১৯৯৬ সালের বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর দেশে নতুন ধারার উন্নয়নের জোয়ার শুরু হয়। মাত্র ৫ বছরে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ, বিদ্যুত, তথ্যপ্রযুক্তি এবং অবকাঠামোগত মেগাপ্রকল্পগুলো হাতে নিলেও দৃশ্যত: দেশবাসীকে উপহার দিতে পারেননি। ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতাসীন হবার পর আওয়ামী লীগ সরকারের গৃহীত সকল প্রকল্পগুলো বন্ধ করে দেয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ৫ বছর তিল তিল করে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশকে তারা আবারও পিছনের দিকে ঠেলে দেয়। সংবিধান, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, দক্ষতা ও গতিশীল নেতৃত্ব তথা সাংবিধানিকভাবে দেশ পরিচালনার পরিবর্তে তারা মেতে ওঠে খুন, দুর্নীতি এবং জঙ্গীবাদের মহোৎসবে। টঙ্গীর জননন্দিত সংসদ সদস্য আহসানউল্লাহ মাস্টার, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব সংসদ সদস্য শাহ এএমএস কিবরিয়াসহ হাজার হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা ও গুম এবং ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মতো নারকীয় তা-ব চালিয়ে দেশকে বর্বর বাংলাদেশে পরিণত করে। তারপরের ইতিহাস আমাদের সকলের জানা। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর সুষ্ঠু অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে।

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে পৃথিবী, এগিয়ে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ। ২০০৯-২০১৮ সাল। মাত্র ১০ বছরে বাংলাদেশ আজ সমগ্র বিশ্বের কাছে রোলমডেল। একজন সৎ, দক্ষ দেশপ্রেম সমৃদ্ধ রাষ্ট্রনায়কের সফল নেতৃত্বের কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, যোগাযোগ, তথ্য প্রযুক্তি, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, পররাষ্ট্র, জনশক্তি রফতানি, শিল্পায়ন, গ্রামীণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন তথা প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আজ ইউরোপ, আমেরিকার উন্নত রাষ্ট্রগুলোর কাছে ঈর্ষণীয় আতঙ্কের নাম। পক্ষান্তরে অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে আরব্য উপন্যাসের গল্পের মতো জাদুকরী এক রাষ্ট্রের নাম। গত ০৪-০৬ অক্টোবর পর্যন্ত দেশব্যাপী উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে উন্নয়ন মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মেলায় সরকারের বিভিন্ন দফতরের উন্নয়ন কর্মকা-গুলো একনজরে দেখলে সত্যিই এক অবিশ্বাস্য গল্পের মতো মনে হয়। প্রত্যন্ত গ্রাম-গ্রামান্তরে কিংবা শ্রমিক থেকে কৃষক, জেলে মুটে তথা সর্বস্তরের মানুষ বর্তমান সরকারের কয়েকটি ক্ষেত্রে উন্নয়নের অদম্য সাফল্য বিরামহীনভাবে ভোগ করছে। বিশেষত গ্রামীণ যোগাযোগ, বিদ্যুত, চিকিৎসা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী। বর্তমান সরকারের বিভিন্ন সেক্টরের উন্নয়ন সাফল্য তথা সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এ লেখায় কোনভাবেই শেষ করা যাবে না। আমি পেশায় নেশায়, ধ্যানে জ্ঞানে একজন শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় কেটে গেছে ৩৬ বছর। সে কারণে আমি বর্তমান সরকারের শিক্ষা ক্ষেত্রে যুগান্তকারী কিছু সাফল্য ও উন্নয়ন নিয়ে আলোকপাত করতে চাই।

শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের চাবিকাঠি। উন্নয়নকে গতিশীল এবং টেকসই করতে শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। গত ১০ বছরে প্রাথমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা এবং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের আকাশ ছোঁয়া সাফল্য আজ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি, ঝরে পড়া রোধ, শিক্ষার প্রসার, বাল্যবিবাহ রোধ, নারীর ক্ষমতায়ন, আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে মেয়েদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধিসহ শিক্ষাক্ষেত্রে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি, এছাড়া সমতা বিধানের লক্ষ্যে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় উপবৃত্তি সংশ্লিষ্ট প্রকল্পসমূহ ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে। অন্যদিকে ডিজিটাল পদ্ধতির আওতায় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয় উপবৃত্তির টাকা অনলাইনে প্রদান করেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় মেধাবৃত্তির আওতায় প্রাথমিক হতে ¯œাতকোত্তর শ্রেণী পর্যন্ত মেধা ও সাধারণ বৃত্তি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, উপজাতীয় উপবৃত্তি, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, প্রতিবন্ধী (দৃষ্টি ও অটিস্টিক ব্যতীত) ও অটিস্টিক উপবৃত্তি এবং পেশামূলক উপবৃত্তিবিষয়ক ৩টি ক্যাটাগরিতে বিভিন্ন মেয়াদে বৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে।

প্রাথমিক : শিক্ষা বর্তমান সরকারের সাহসী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষার প্রসঙ্গটি সর্বাগ্রে। এ প্রসঙ্গে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের একটি উক্তি বিশেষভাবে স্মরণীয়- আগে চাই মাতৃভাষার গাঁথুনি তারপর ইংরেজী শেখার পত্তন। দার্শনিক রুশো, প্লেটো, এ্যারিস্টেটল এবং রাসেলের মতে সকল শিক্ষার ভিত্তি প্রাথমিক শিক্ষা। প্রাথমিক শিক্ষাকে পাশ কাটিয়ে কোন শিক্ষার প্রসঙ্গ চিন্তা করা যায় না। এই সত্যকে ধারণ ও লালন করে স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু ৪৪ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেন। সেই পথ ধরে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী গত ১০ বছরে তিন ধাপে ২৫২৪০টি রেজিস্ট্রার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেছেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে গত ১০ বছরে ০১ লাখ ৩০ হাজার ১০০ জন শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে। ২০০৫ সালে প্রাথমিকে ঝড়ে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৪৭.২, বর্তমানে তা হ্রাস পেয়ে ১০.৬। গত ১০ বছরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন শ্রেণীকক্ষ নির্মাণ করা হয়েছে ৩৬ হাজার। শিশুদের মধ্যে ডিজিটাল পদ্ধতির শিক্ষা কার্যক্রম বিস্তার ঘটানোর লক্ষ্যে ৮৯২৫টি বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর সরবরাহ করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের আরও ২টি যুগান্তকারী সাফল্য হলো দেশের দারিদ্র্যপ্রীড়িত এলাকার ৯৩৬টি উপজেলায় ১৫হাজার ৭০০টি বিদ্যালয় ৩০ লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর মাঝে টিফিন বিস্কুট বিতরণ এবং বিদ্যালয়বিহীন এলাকায় ৬৩৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন। এছাড়াও প্রাথমিক পর্যায়ের এক কোটি ৩০ লাখ শিক্ষাথীকে উপবৃত্তি বিতরণ বিশ্বজুড়ে সুনাম ও খ্যাতি বয়ে এনেছে।

মাধ্যমিক পর্যায় : ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ১৪ লাখ ৮৮ হাজার ৪০১ জন শিক্ষার্থীকে ১২০৩ কোটি ৮১ লাখ ১৩ হাজার ৫০০ টাকা বৃত্তি হিসেবে প্রদান করা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়বিহীন ৩২৫টি উপজেলার বেসরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৪২টি প্রতিষ্ঠান সরকারীকরণ করা হয়েছে এবং অবশিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সরকারী কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এছাড়া ৩১১টি বেসরকারী কলেজ সরকারীকরণ করা হয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত বেসরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৮০ হাজার ৪০৬জন শিক্ষককে এমপিও প্রদান করা হয়েছে। অন্যদিকে বেসরকারী কলেজের ১৭ হাজার ৪৫৮ জন শিক্ষককে এমপিও প্রদান করা হয়েছে। যা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে এক মাইলফলক। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে নন এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (স্কুল ও কলেজ) এর জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০১৮ জারি করা হয়েছে। বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের মাধ্যমে ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত অবসর সুবিধাবোর্ড হতে ৫৯ হাজার ৪১৪ জন শিক্ষক কর্মচারীকে ২ হাজার ৩৬১ কোটি ৬৭ হাজার ৮৮৮ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। যা অবসরপ্রাপ্ত বেসরকারী শিক্ষক কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ও দাবি পূরণ করছে। সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণী পদমর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর সংলগ্ন এলাকায় ১০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় (সরকারী) স্থাপন প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকার আশপাশে স্থাপনের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। ৩৫তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ নন ক্যাডার ৪৫০ জনকে সরকারী বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের পদে পদায়ন করা হয়েছে। বিভিন্ন বিষয়ের শ্রেণী শিক্ষককে সৃজনশীল পদ্ধতিতে দক্ষ করার লক্ষ্যে এসইএসডিপি প্রকল্পের আওতায় ৪৪২০৯১ জন এবং সেসিপ এর আওতায় ৬৭ হাজার ৪৬৫ জনসহ সারাদেশের মোট ৫০৯৫৬৬ জন শিক্ষককে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কাছে বিজ্ঞান শিক্ষাকে আকর্ষণীয় করার লক্ষ্যে হাতে কলমে বিজ্ঞান শিক্ষা বিষয়ে মোট ৫৫০১৭ জন শিক্ষককে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। সরকারী বিদ্যালয়বিহীন ৩২৫টি উপজেলার ৩২২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আধুনিক বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়েছে। মাধ্যমিক স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পাঠ্যভ্যাস গড়ে তোলার লক্ষ্যে সেকায়েপ প্রকল্পের আওতায় ২৫০টি উপজেলায় বিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ানদের তত্ত্বাবধানে ১ কোটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের মননশীল ৮৪টি বইয়ের ৮৫ লাখ কপি সরবরাহ করা হয়েছে। অন্যদিকে সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (সেসিপ) এর আওতায় মাধ্যমিক পর্যায়ে আইসিটি ব্যবহার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে ৬৪টি জেলায় ৬৪০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আইসিটি লার্নিং সেন্টার স্থাপন এবং ওঈঞ ভড়ৎ চবফধমড়মু কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। শিক্ষার মানবৃদ্ধির জন্য শিখন কার্যক্রমকে শিক্ষার্থীদের কাছে সহজবোধ্য করার জন্য মাল্টিমিডিয়া ক্লাস রুমের মাধ্যমে পাঠদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নে শিক্ষায় তথ্য ও প্রযুক্তি সমন্বয়ের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী ২০১২ সালের ২০ মে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম উদ্বোধন করেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাস মনিটরিং-এর জন্য অনলাইন এ ড্যাসবোর্ড চালু করা হয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী দেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশে রূপান্তর করার লক্ষ্যে মাধ্যমিক পর্যায়ে ২০০৯ থেকে এ পর্যন্ত আইসিটি বিষয়ে ১ লাখ ৯৩ হাজার ৭৬১ জনকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে বর্তমান সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হচ্ছে ষষ্ঠ থেকে ৯ম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ। যা দেশে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে।

মাদ্রাসা শিক্ষা : বাংলাদেশ একটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু আমাদের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষকতা শব্দটি যুক্ত করেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু ইসলামিক ফাউন্ডেশন, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমার জন্য জমি বরাদ্দ থেকে শুরু করে অনেক ইসলাম হিতৈষী কাজ করেছিলেন। ১৯৭৫ সালের পর থেকে আওয়ামী লীগকে ইসলাম বিরোধী দল, এমনকি নাস্তিকের দল বলেও অপ্রচার চালানো হয়েছে। কিন্তু গত ১০ বছরে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলাম, ইসলামী শিক্ষা এবং মাদ্রাসা শিক্ষার যে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে তা ইতিহাসের স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের অন্যতম সাফল্য হলো মাদ্রাসা শিক্ষার জন্য আলাদা অধিদফতর প্রতিষ্ঠা। যুগের পর যুগ ধরে বঞ্চিত ও অবহেলিত এবতেদায়ী মাদ্রাসা স্তরকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আদলে গড়ে তোলার জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এবতেদায়ী মাদ্রাসা শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধির যুগান্তকারী ঘোষণা দেয়া হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড আইন ২০১৮ প্রণয়ন করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে মাদ্রাসা শিক্ষায় যুগান্তকারী আরও একটি পদক্ষেপ হচ্ছে বেসরকরী মাদ্রাসার ৩৯ হাজার ৪০৬ জন শিক্ষককে এমপিও প্রদান করা হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়নে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত ১০০টি নতুন ভবন নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়নে ১২৬৬ কোটি টাকর বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ১০১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৯৫টি মাদ্রাসার শিক্ষার উন্নত পরিবেশন নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে অবকাঠামো উন্নয়ন, শ্রেণীকক্ষ আধুনিকায়ন ও কম্পিউটার ল্যাব স্থাপনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ৫২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে মাদ্রাসার শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে ও শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিকায়ন করার লক্ষ্যে ২৮১টি মাদ্রাসায় কারিগরি শিক্ষা কোর্স চালু করা হয়েছে। ৫২টি মাদ্রাসায় অনার্স কোর্স প্রবর্তন। দেশের ৩৫টি মাদ্রাসাকে মডেল মাদ্রাসা হিসেবে ঘোষণা করে এ সকল প্রতিষ্ঠানে অত্যাধুনিক ভবন নির্মাণ, উন্নতমানের আসবাবপত্র সরবাহ, কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন, প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করা হয়েছে। আলেমদের শত বছরের দাবি অনুযায়ী ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ইসলামী শিক্ষাকে মর্যাদাশীল করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত উদ্যোগে কওমী মাদ্রাসা ডিগ্রীকে সরকারী স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। কওমী মাদ্রাসাসমূহের দাওরায়ে হাদিস সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রী (আরবী ও ইসলামিক স্টাডিজ) সমমান প্রদান আইন ২০১৮ প্রণীত হয়েছে। যা সমগ্র বিশ্ব এবং মুসলিম উম্মার কাছে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে স্বীকৃতি হয়েছে।

কারিগরি শিক্ষা : স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ ড. কুদরাত-ই-খুদার নেতৃত্বে গঠিত শিক্ষা কমিশনে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দক্ষ জনশক্তি রফতানির লক্ষ্যে কারিগরি শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার কারিগরি শিক্ষার প্রসারে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষায় এনরোলমেন্ট ছিল ১% এর কম। বর্তমান সরকারের বিশেষ সুদৃষ্টি ও যুগান্তকারী পদক্ষেপের ফলে এখন তা দাঁড়িয়েছে ১৫.১২%। ২০২০ সাল নাগাদ কারিগরি শিক্ষায় ২০% এনরোলমেন্টের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ডিপ্লোমা কোর্সে আসন সংখ্যা ১২৫০০ হতে ৫৭৭৮০টি করা হয়েছে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড আইন ২০১৮ চূড়ান্ত প্রণয়ন করা হয়েছে। ১১৯টি প্রতিষ্ঠানে ৯৫০টি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমে ১০৯৯টি মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর স্থাপন করা হয়েছে। কারিগরি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০০৯ হতে বর্তমান সময় পর্যন্ত ডিপ্লোমা পর্যায়ের ৩লাখ ৫৮ হাজার ৬১৫ জন শিক্ষার্থীকে মাসিক ৮০০ টাকা হারে বৃত্তি প্রদান করা হয়েছে। বেসরকারী ক্ষেত্রে ৪৫৭টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসহ প্রায় ৭৭৭৩টি বিভিন্ন কারিগরি প্রতিষ্ঠান স্থাপনের অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। বেসরকারী উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ১৬৩০টি কারিগরি প্রতিষ্ঠানের ১৮৬৬১ জন শিক্ষক কর্মচারীকে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। প্রতিটি সরকারী পলিটেকনিককে ডবল শিফ্ট চালু করা হয়েছে। কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণে দেশের অবশিষ্ট জেলায় বিশ্বমানের পলিটেকনিক স্থাপনের উদ্যোগে নেয়া হয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহী বিভাগীয় শহরে ০৪টি মহিলা পলিটেকনিক স্থাপন করা হয়েছে। ১০০টি উপজেলায় টেকনিক্যাল স্কুল এ্যান্ড কলেজ স্থাপনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এছাড়াও ৮টি বিভাগীয় শহরে ৮টি মহিলা টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। অন্যদিকে ভারত সরকারের অর্থায়নে ২৫৬১ কোটি টাকা ব্যায়ে ৪৯টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সক্ষমতা বৃদ্ধির কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

উচ্চ শিক্ষা : স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ছিল মাত্র ৬টি। ৭৫ পরবর্তী সময় থেকে ৯৬ পর্যন্ত দেশে উচ্চশিক্ষার পথও পরিবেশ সুনিশ্চিত ছিল না। ৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত হয়। গড়ে উঠে নতুন নতুন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। তবে ২০০৯ থেকে গত ১০ বছরে দেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ আকাশ ছোঁয়া উচ্চতায় পৌঁছে গেছে। দেশে নতুন ২২টি সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার বাইরে বেসরকারী উদ্যোগে ৫২টি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয়া হয়েছে। উচ্চশিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিতকরণ এবং আন্তর্জাতিকীকরণের লক্ষ্যে অপপৎবফরঃধঃরড়হ ঈড়ঁহপরষ আইন পাস করা হয়েছে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৭ লাখ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৩৮ লক্ষ্যে উন্নীত হয়েছে। ৪৩টি সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫৩টি প্রশাসনিক ভবন ও একাডেমিক ভবন, ৭৩টি আবাসিক ভবন এবং ১০১টি আবাসিক হল নির্মাণ করা হয়েছে। এসব অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ১৫০০০ শিক্ষার্থীর আবাসিক সুবিধা নিশ্চিত হয়েছে। অন্যদিকে বর্তমান সরকারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার ফলে গবেষণা এবং অনুন্নয়ন খাতে ব্যাপক বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে ৯৭৫৫.৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮১টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। অনুন্নয়ন বাজেট ৯০৮টি টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৪৮৫৩ কোটিতে উন্নীত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে গবেষণা। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে গবেষণা খাতে বরাদ্দ ৬ কোটি থেকে বৃদ্ধি করে ৬২ কোটিতে উন্নীত করা হয়েছে। ৩৩২.১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে উচ্চগতি সম্পন্ন ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশ্বজ্ঞান ভা-ারের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংযোগ স্থাপন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও গবেষকদের মেধার মূল্যায়ন তথা স্বীকৃতি হিসেবে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এ জন্য গত ১০ বছরে ৫০১ জন শিক্ষক/শিক্ষার্থীকে কমনওয়েলথ স্কলারশীপ প্রদান করা হয়েছে। ১৮৫জন গবেষককে ইউজিসি স্বর্ণ প্রদান করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণ প্রদান করা হয়েছে ৮৫৬ জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে।

নানা বাধা বিপত্তি এবং প্রতিকূলতা পেরিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উনèয়নের মহাসড়কে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। শুধু শিক্ষাক্ষেত্রে নয় মাথাপিছু জাতীয় আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং গড় আয়ু বৃদ্ধি, মাতৃমৃত্যু ও শিশু মৃত্যুর হার হ্রাসকরণ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিসহ উনèয়নের সকল সূচকে বাংলাদেশের সাফল্য আজ আকাশছোঁয়া। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তীতে ২০২১ সালে বাংলাদেশ পৌঁছে যাবে মধ্যম আয়ের বিশ্বকাতারে। কিন্তু চারদিকে স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি ও ষড়যন্ত্রকারীরা থেমে নেই। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রতিটি প্রগতিশীল মানুষকে সচেতন হওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। আগামী ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে উন্নয়নের এ মহাযুদ্ধের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার জন্য বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে টিকিয়ে রাখতে হবে। এ জন্য সকল ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। সময় এখন বাংলাদেশের। জয় আমাদের হবেই।

লেখক : সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন