১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্বাস্থ্যকর বাংলাদেশ

বিশ্বের স্বাস্থ্যকর দেশের তালিকায় উঠেছে বাংলাদেশের নাম। যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান লেগাটাম ইনস্টিটিউটের দ্য লেগাটাম প্রসপারেটি ইনডেক্স-২০১৮ সালে প্রণীত তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান স্বাস্থ্যসূচীর ১০০ নম্বরে থাকলে অবস্থান করলেও তা ভারত-পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে। বিশ্বের ১৪৯টি দেশ নিয়ে প্রকাশ করা হয় এই তালিকা। তালিকায় স্বাস্থ্যসূচকে ভারতের অবস্থান ১০৯ এবং পাকিস্তানের ১২২ নম্বরে। সর্বশীর্ষে অর্থাৎ এক নম্বরে অবস্থান করছে সিঙ্গাপুর। তালিকায় স্বাস্থ্যের পাশাপাশি আরও কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নেয়া হয়। সেগুলো হলো অর্থনৈতিক অবস্থা, বসবাসের পরিবেশ, শাসন ব্যবস্থা, শিক্ষা, নিরাপত্তা, মূলধন ও প্রাকৃতিক পরিবেশ। সবচেয়ে ভাল অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশের নিরাপত্তা খাত, ৬১ নম্বরে।

স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের আরও একটি সাফল্য উল্লেখ করার মতো। সহজে প্রতিরোধ ও নিরাময়যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও সারা বিশ্বে পাঁচ বছরের নিচে বয়সের অন্যতম একটি ঘাতক ব্যাধি হলো নিউমোনিয়া। বাংলাদেশে শুধু ২০১৬ সালেই পাঁচ বছরের নিচে ১৬ হাজার ৬১০ শিশু মারা গেছে নিউমোনিয়ায়; যা হিসাব করলে দাঁড়ায় প্রতি ঘণ্টায় ২টি শিশুর মৃত্যু। উন্নত বিশ্বে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুকে ব্যয়বহুল ও প্রশিক্ষিত জনবলের সাহায্যে কৃত্রিম ভেন্টিলেটরে সচল রাখা হয় শিশুর ফুসফুস। বাংলাদেশের আইসিডিডিআরবির চিকিৎসক-গবেষক ডা: মোহাম্মদ যোবায়ের চিশতী উদ্ভাবিত ফেলে দেয়া প্লাস্টিকের শ্যাম্পুর বোতলের মাধ্যমে সচল রাখা হয় শিশুর ফুসফুস। এই পদ্ধতিতে স্বল্প ব্যয়ে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুর মৃত্যুহার কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃতিও মিলেছে। অথচ দেশে সরকারীভাবে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় খুব কম, জিডিপির শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ মাত্র। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাজেট বরাদ্দে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশ হওয়া বাঞ্ছনীয়।

মা ও শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যায় জাতিসংঘ নির্দেশিত মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি) অর্জনের কারণে বাংলাদেশ সারাবিশ্বে প্রশংসিত হলেও অদ্যাবধি কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। এর অন্যতম হলো পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাব তথা পুষ্টি সমস্যা। সন্তান প্রসবে অকারণে সিজারসহ হাতুড়ে চিকিৎসক তথা দাইয়ের হস্তক্ষেপও কম দায়ী নয় কোন অংশে। ফলে প্রসূতি ও শিশুমৃত্যু হার বেড়েছে। ২০৩০ সাল নাগাদ এসডিজি অর্জন করতে হলে এ সবই দূর করতে হবে পর্যায়ক্রমে।

বর্তমান সরকারের অনেক সমুজ্জ্বল সাফল্যের অন্যতম একটি দেশব্যাপী কমিউনিটি ক্লিনিক। সম্প্রতি এটি পেয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, বিশেষ করে বিশ্বব্যাংকের মতো সুবৃহৎ বহুজাতিক দাতা সংস্থার। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সার্বিক স্বাস্থ্য খাতের উন্নতিতে ‘অসাধারণ ভূমিকা’ রাখছে কমিউনিটি ক্লিনিক। স্বাস্থ্য খাতে অভাবনীয় উন্নতির উল্লেখ করে সংস্থাটি বলেছে, এটি সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করেছে। এর ফলে নবজাতক ও শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যু, প্রজনন হার নিয়ন্ত্রণসহ ১০টি সূচকে সন্তোষজনক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা এবং পুুষ্টি সেক্টর উন্নয়ন কর্মসূচীর সুবাদে সম্ভব হয়েছে এই অগ্রগতি। এর আওতায় ২০১৪ সাল থেকে দেশে ১৩ হাজারের বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু রয়েছে। এর ফলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীর সেবা নেয়ার হার ২১ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশে। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে অবশ্য কয়েকটি চ্যালেঞ্জের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দারিদ্র্য, চিকিৎসা উপকরণের অভাব, বিভিন্ন রোগের প্রকৃতির পরিবর্তন ইত্যাদিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। মা ও শিশুর অপুষ্টির কথাও বলা হয়েছে। তদুপরি নগরায়ণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির সমস্যা তো আছেই। সে অবস্থায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোয় প্রশিক্ষিত ধাত্রীসহ সেবার মান বাড়ানো গেলে নারী ও শিশুর অপুষ্টিজনিত সমস্যাসহ প্রসবজনিত জটিলতা ও মাতৃমৃত্যুর হার আরও কমে আসবে নিঃসন্দেহে।