১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চলে গেলেন মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবি

বার বার ফিরে আসে বিজয়ের এই মাস। ডিসেম্বর মাস আসলেই বীরের অনন্য মর্যাদায় অভিষিক্ত হওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মোৎসর্গই নয় সংগ্রামী অভিযাত্রায় তাদের লড়াকু কাহিনীও নতুন করে সবাইকে নাড়া দেয়। রক্তাক্ত পথপরিক্রমায় অর্জিত এই মহিমান্বিত মাসটিতে বিদায়ের ঘণ্টাও বাজতে থাকে। স্মরণ করা যেতে পারে ১৪ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর হাতে অসংখ্য গুণীজনের নির্মম হত্যাকা- আজও পুরো জাতিকে শোকে, বেদনায় বিষণœœ করে দেয়। বিজয়ের মাত্র দু’দিন আগে দেশের বুদ্ধিবৃত্তি জগতের ওপর এমন নৃশংস কাপুরুষোচিত হামলা আজও ইতিহাসের রক্তাক্ত আখ্যান। সেই সব বীর শহীদের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা আর বিনম্র অভিবাদন। ২০১৮ সালের বিজয়ের মাসের সূচনা পর্বে ২ ডিসেম্বর চলে গেলেন আর এক বীর মুক্তি সৈনিক তারামন বিবি। তাঁর প্রতিও হৃদয় নিঃসৃত অর্ঘ্য এবং প্রাণঢালা শুভেচ্ছা। স্বজন হারানো পরিবারটির প্রতি অনেক সহানুভূতি।

তারামন বিবি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের রক্তাক্ত ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় নাম। ১৯৫৭ সালে জন্ম নেয়া এই অসম সাহসী নারী ’৭১-এর মুক্তি সংগ্রামের সময়টিতে মাত্র ১৪ বছরের এক কিশোরী। যে সময় এক উদীয়মান তরুণী স্বপ্নে বিভোর থাকে উদ্দীপ্ত তারুণ্যকে শাণিত করার লক্ষ্যে। যেখানে যুদ্ধাহত দেশের প্রতি অকৃত্রিম দায়বদ্ধতার চাইতেও বেশি কাজ করে নিজের আকাক্সিক্ষত জীবনের হরেক রকম প্রত্যাশায়। আর তারামন বিবি সদ্য আগত তারুণ্যের সমস্ত উৎসাহ- উদ্দীপনাকে নিবেদন করলেন শত্রু পরিবেষ্টিত মাতৃভূমিকে মুক্ত করার এক অদম্য মনোবলে। যে দীপ্ত চেতনায় সামান্য রাঁধুনির ভূমিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের আহারের সংস্থান করতেন। শুধু তাই নয় বিভিন্ন শিবিরে পাকসেনাদের তথ্য সরবরাহ করে সহযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতেন। এ দেশের বাঙালীরা কতভাবেই না ’৭১-এর স্বাধীনতা সংগ্রামকে অনন্য ভূমিকায় সফলতার দ্বারে নিয়ে যেতে যে কোন ধরনের কাজ করতে কুণ্ঠিত হয়নি। বিজয়ের মাস আসলেই সে সব স্মৃতিচারণ নতুন করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে জোরালা হয়। তারামন কিশোর বয়সেই কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ক্যাম্পে তারামন বিবি নিজেকে একজন সেবকের ভূমিকায় দাঁড় করিয়ে যুদ্ধরত দেশের সেবায় সর্বসত্তা নিবেদন করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে প্রতিনিয়তই থাকা এই বীর নারী শুধুমাত্র তাদের সেবা করেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। এক সময় দৃঢ় ইচ্ছে ব্যক্ত করলেন- অস্ত্র চালনা শিখে সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে অংশগ্রহণে লিপ্ত হবেন। ভেতরের অবিচলিত বোধ আর দেশের প্রতি গভীর মমত্ববোধে এই তরুণী এক সময় অস্ত্র চালনায় পরদর্শী হয়ে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। এর পরের ইতিহাস তারামন বিবির সম্মুখ সমরে সরাসরি সংযুক্ত হওয়ার এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। সে সময় বাংলাদেশে অনেক সংগ্রামী নারী মুক্তিযুদ্ধে তাদের সরাসরি অংশগ্রহণকে দৃশ্যমান করে তুললেও অস্ত্র হাতে পাকসেনাদের মোকাবেলা করা যুদ্ধের মাঠে সেসব নারীর সংখ্যা ছিল একেবারে হাতেগোনার মতো। আর তারামন বিবি ছিলেন সেই কয়েকজনের একজন। কুড়িগ্রাম, কোদালকাঠি এবং গাইবান্ধার বিভিন্ন সেক্টর থেকে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে যে সব গুপ্ত হামলা চালানো হতো তারামন বিবি সেখানে অংশ নিয়ে শত্রু পক্ষের বিরোধী শক্তির ভূমিকায় নেমে যেতেন। মৃত্যুর পর তার সহযোদ্ধারা সে স্মৃতি স্মরণ করে শোকে, শ্রদ্ধায় মুহ্যমান হয়ে যান। তারামন বিবির এক সহযোদ্ধা শওকত আলী বীরবিক্রম বলেন যে একটি অল্প বয়সী মেয়ে কত বড় ঝুঁকি নিয়ে আমাদের যুদ্ধে লিপ্ত হতো। তাকে হারানো মানেই এক বীর মুক্তিসেনাকে চিরতরে বিদায় দেয়া। বঙ্গবন্ধু জীবদ্দশায় সংগ্রামী বীরদের সম্মান প্রদান, উপাধি দেয়াই শুধু নয় সনদপত্র বিতরণ করে তাদের বীরত্বগাথাকে মর্যাদা দিয়েছিলেন। আর সেভাবেই তারামন বিবি ১৯৭৩ সালে ‘বীরপ্রতীক’ খেতাবে ভূষিত হন। শুধু তাই নয় সে সময়ের বঙ্গবন্ধু সরকার তার হাতে সম্মাননাও তুলে দেন। অতঃপর তারামন বিবির আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। স্বাধীনতার ২৪ বছর পর ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজের শিক্ষক বিমল কান্তি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণার তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলায় তারামন বিবি ও তার পরিবারের খোঁজ পান। এরপর থেকেই এই বীর সেনানী অন্তরাল থেকে একেবারে সবার সামনে চলে আসেন। ১৯৯৯ সালে তিনি জনকণ্ঠ সম্মাননায়ও অভিষিক্ত হন। মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া এই বীরপ্রতীকের ছেলে আবু তাহের জানান, বর্তমান শেখ হাসিনার সরকার তার মায়ের পাশে সব সময়ই ছিলেন। একইভাবে তারামন বিবির পুরো পরিবারও অনেক সাহায্য-সহযোগিতা পায়। ছেলের আকুল আবেদন সরকার প্রদত্ত এসব সুযোগ-সুবিধা মায়ের মৃত্যুর পরও যেন অব্যাহত থাকে। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও মনে হয় এসব মুক্তিযোদ্ধার নিবেদন ও ঋণ কোনভাবেই পরিশোধ করার মতো নয়। তবে স্বাধীন দেশে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া বীর সেনানীদের সন্তানরা যেন কোন আর্থিক সঙ্কট কিংবা সামান্যতম দুর্বিপাকের আবর্তে না পড়ে। তাহলে মহান বিজয় তার মর্যাদা হারাতে পারে। তারামন বিবি নীরবে নিঃশব্দে চলে গেলেন। কোন কিছুর প্রত্যাশায় মুক্তিযুদ্ধ করেননি। দেশকে ভালবেসে মাতৃভূমির দুঃসময়ে শত্রুকে ঘায়েল করতে অস্ত্র হাতে তুলে নেন। যথার্থ মূল্য কোন কিছুর বিনিময়ে হতে পারে না। তবে তাদের সন্তানরা যেন অনাদরে, অবহেলায় এই মুক্ত দেশে দিনযাপন না করে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা সবারই দায়বদ্ধতা। দেশপ্রেমিক সচেতন জনগোষ্ঠী যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রতিনিয়ত লালন করে তাদের এমন প্রত্যাশা।

অপরাজিতা প্রতিবেদক

নির্বাচিত সংবাদ