১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শহীদ কন্যা শামীমা সুলতানা

বাংলাদেশ যখন নির্বাচনী হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে সেই ক্রান্তিলগ্নে আবারও বিজয়ের মাস নতুন করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার উদাত্ত বার্তা সবার সামনে হাজির করেন। তাকে দৃপ্ত যাত্রায় অবারিত করা প্রত্যেক দেশপ্রেমিক নাগরিকের অন্যতম দায়বদ্ধতা। বিজয়ের অম্লান সূর্য যেন প্রতিনিয়তই আলো বিকিরণ করে যায় এই কামনায় মহিমান্বিত মাসটিকে সশ্রদ্ধা চিত্তে স্মরণ করছি। সেই তাগিদে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে নিয়ে অভিব্যক্তি প্রকাশ করার দায়ও অনুভব করছি।

শামীমা সুলতানা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের একজন কৃতী তথ্য বিশ্লেষক। কর্ম জীবনে এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সম্পৃক্ত করার উজ্জ্বল পথপরিক্রম যেমন আছে পাশাপাশি ১৯৭১ সালে ২৫ নবেম্বর স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র ২১ দিন আগে বাবা মোঃ আবু তৈয়বকে পাক হানাদার বাহিনী কর্তৃক ধরে নেয়ার করুণ আখ্যানে মর্মাহত হওয়ার বেদনাও মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। নিজের সম্পর্কে বলতে গিয়ে সেই ’৭১-এর দুঃসহ শৈশব স্মৃতিতে ফিরে যান। মাত্র ১০ বছরের বালিকা মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত পথযাত্রায় লড়াকু প্রতিবেশের যে ক্ষতচিহ্ন আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন সেটা যেমন মর্মস্পর্শী একইভাবে অসংখ্য শহীদের জীবনের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতারও এক অক্ষয় ঐশ্বর্য। শুধু শহীদের সন্তানরাই নয় মুক্তিকামী আপমার বাঙালী ও এমন আত্মোৎসর্গের ঐতিহাসিক ঘটনাপঞ্জীর প্রতিবাদী প্রজন্ম। বঙ্গবন্ধুর অন্যতম সহযোগী। এইচএম কামরুজ্জামানের অত্যন্ত নিকটজন ছিলেন এই আবু তৈয়ব। ফলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নিজেকে নিয়মিত শাণিতও করেছেন। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু রাজশাহীতে গিয়ে এই বীর শহীদদের পরিবারকে এককালীন ৫ হাজার টাকা সম্মাননাসহ জাতির পিতার লেখা সনদপত্রও দিয়ে আসেন। সেটুকু নিয়ে আজও রেখে যাওয়া সন্তানরা শোকের আবহে আচ্ছন্ন হন।

শামীমা ১৯৭৭ সালে পিএন গার্লস হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৭৯ সালে রাজশাহীর সরকারী মহিলা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগে ভর্তি হন। স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করতে ১৯৮৬ সাল গড়িয়ে যায়। এরপর ঢাকায় এসে গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে কিছুদিন কাজ করার পর ১৯৮৭-৮৮ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্য বিশ্লেষণ বিভাগে পুনরায় ভর্তি হয়ে সেখান থেকেও ডিগ্রী অর্জন করেন। সেই যে কম্পিউটার বিশ্বে পদচারণা শুরু হলো আজ অবধি সেটাই পেশার একমাত্র অবলম্বন। ১৯৮৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসখ্যান বিভাগে এই নতুন প্রযুক্তির তথ্য বিশ্লেষক হিসেবে নিজের কর্মজীবন শুরু করেন। সেই অবধি পরিসংখ্যান বিভাগে কোন কম্পিউটারই ছিল না। সে ক্ষেত্রে পদার্থবিজ্ঞানের ল্যাবে কম্পিউটার বিভাগে ইমিরেটাস অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাকের তত্ত্বাবধানে নিজেকে তৈরি করতে থাকেন। এক সময়ে এই কম্পিউটার জগত কিছুটা অবারিত হলে পরিসংখ্যান বিভাগেও এই আধুনিক বিজ্ঞানটির যাত্রা শুরু হয়। সেই থেকে এখনও শামীমা তার কর্মজীবনকে প্রায়ই ৩০ বছর ধরে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। ১৯৯০ সালে সাংসারিক জীবনে প্রবেশ করে সিরাজুল ইসলামের ঘরনি হওয়াও এক অবিস্মরণীয় পর্ব।

বহুজাতিক কোম্পানির বিশিষ্ট কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলামের আবাসিক স্থান ও কর্মক্ষেত্র ঢাকায়। ফলে শামীমার শুরু হয় আরেক জীবন লড়াই। শ্বশুরবাড়ি পরিবেষ্টিত শামীমা স্বামী তো নয়ই অন্য কারোর কাছ থেকেও সামান্যতম বাধা পায়নি তার চাকরির ব্যাপারে। সুতরাং কর্মক্ষেত্রকে স্থানান্তর কিংবা ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারটিও কখনও সামনে আসেনি। স্বামী শুধু বিচক্ষণই নন একজন স্বাধীনচেতা ও অধিকার সচেতনও। সেটা শুধু নিজের ক্ষেত্রেই নয় প্রত্যেকের বেলায় স্ত্রীর ক্ষেত্রে তো অনেকখানি। সেই মুগ্ধতা ও শামীমাকে সব সময় বিস্ময়ে অভিভূত করে। শাশুড়ি মাও ছিলেন বউমার পক্ষেই শুধু নন চাকরি ছাড়ার বিপরীতেও। তবে সবার সহযোগিতা পেলেও শামীমার প্রতিদিনের জীবনযাত্রা অতখানি সুস্থির আর নির্বিঘœ ছিল না।

নিজের তাগিদেই সব সময় রাজশাহী আর ঢাকা করতে হয়েছে। অন্য কারোর চাপে কিংবা বিরোধিতার কারণে নয়। এখন বঙ্গবন্ধু সেতু হওয়ার পর থেকে ঢাকা-রাজশাহী যাত্রা অনেকখানি আরামদায়ক ও স্বস্তির হলেও আগে কিন্তু তা ছিল না। নগরবাড়ী ঘাটে এসে ফেরিতে ওঠা আবার আচিরাঘাটে ফেরি থেকে নামা সেও যাত্রার এক দুঃসময়। তার পরেও তাই করতে হয়েছে, করেছেও। তবে অবসরের কাছাকাছি এসে মনে হয় তার কোন ছুটি এবং পিএফ অবশিষ্ট নেই। এ নিয়ে কোন আক্ষেপ কিংবা অনুশোচনাও নেই। মনে করে কিছু দায়িত্ব করতে গেলে সব দিক বজায় রাখা অসম্ভব। রাজশাহীতে ভাই-ভাবিদের সহযোগিতা কোন সময়ের জন্য ভোলেন না। মা যতদিন বেঁচে ছিলেন বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিয়েছেন। একমাত্র বড় বোনও যতখানি পারেন শামীমাকে একেবারে কাছের মানুষের মমতায় জড়িয়ে রাখেন। দুই পুত্রের জননী শামীমা একজন সফল মাও। বড় ছেলে শাহরিয়ার ইসলাম বিমানবাহিনীর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট।

সদ্য বিবাহিত। ছোটজন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্য বিদায় ডিগ্রী অর্জন করে পেশার ক্ষেত্রে নিজেকে সম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টায় আছে। সব কিছু সামলাতে গিয়ে নিজেকে যতখানি নিবেদন করেছেন তৃপ্তি পেয়েছেন তার চেয়েও বেশি। ছেলেরা নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। নিজেও কর্মজীবনের প্রান্তসীমায় অবসরের অপেক্ষায়। স্বামী ও তার পরিবার কোনদিন কখনও সামান্য অভিযোগও তোলেনি। এই সমস্ত পাওনাই জীবন থেকে অর্জন করা সবচেয়ে বড় সম্পদ।

নির্বাচিত সংবাদ