১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গল্প ॥ পদ্মাপাড়ের আরশোলা সঞ্জয় কর

দীর্ঘদিন যাবৎ সুখে শান্তিতে বসবাসকারী পদ্মাপাড়ের আরশোলা সমাজে একটি দুঃসংবাদ ছড়িয়ে পড়ে। হঠাৎ এ ধরনের সংবাদ আরশোলাদের মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়। আরশোলারা এদিক ওদিক অশান্ত মনে ছোটাছোটি, উড়াউড়ি করছে। খাটের নিচে, ঝোপের আড়ালে আরশোলাদের জটলা সৃষ্টি হয়েছে। পদ্মাপাড়ের আরশোলাদের খাদ্য গুদামে চোরের হাত পড়েছে। জমানো খাবারগুলো প্রতিনিয়ত নিশেঃষ হয়ে যাচ্ছে। খাদ্য গুদামে দুইজন সোটাম দেহের আরশোলা পালাক্রমে পাহারা দিচ্ছে। তারপরও চুরি! কে করছে এমন কাজ? কিছু কিছু আরশোলাদের মনে সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করেছে। তারা ভাবছেন যারা রক্ষক তারাই ভক্ষক নয় তো! কারও কারও সন্দেহের তীর এসে পড়লো পদ্মাপাড়ের আরশোলাদের সমাজপতি গুরু আরশোলার উপর। বেশীর ভাগ আরশোলারা তা চিন্তাও করতে পারেন না, কারণ এই মহৎ এবং জ্ঞানী আরশোলাই পদ্মাপাড়ের আরশোলাদের উপহার দিয়েছেন একটি সুশৃঙ্খল সমাজ ব্যবস্থা। খাদ্য গুদাম তারই প্রতিষ্ঠিত। প্রত্যেক পূর্ণ বয়স্ক আরশোলা তার প্রতিদিনের সংগ্রহিত খাদ্যের একাংশ খাদ্য গুদামে জমা রাখে। উদ্দেশ্য হলো পদ্মাপাড়ের আরশোলাদের বিপদের সময় এই খাদ্য যেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়াও গুরু আরশোলা পদ্মাপাড়ের রুপা মিয়ার ঘরের ভাঙ্গা সুটকেসে স্থাপন করেছেন চিকিৎসা কেন্দ্র। সেখানে দু’জন চিকিৎসক আরশোলা রয়েছেন। তারা দীর্ঘদিন একটি হাসপাতালের স্টোর রুমে বসবাস করে চিকিৎসা শাস্ত্রে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। তাদের পারিশ্রমিক হিসেবে খাদ্য গুদাম থেকে প্রতিদিন এক পেকেট করে খাবার প্রদান করা হয়। এবং লাল পাহাড়ের উপরে দুইটি বড় বড় মরা গাছের ফাটলে আশ্রয় কেন্দ্র স্থাপন করেছেন গুরু আরশোলা। যাতে বন্যার সময় পদ্মাপাড়ের আরশোলারা সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করতে পারে। পদ্মাপাড়ের আরশোলাদের জন্য নিবেদিত প্রাণ গুরু আরশোলা খাদ্য গুদামের চুরির সাথে কখনই সম্পৃক্ত থাকতে পারেন না। আরও একটি দুঃসংবাদ এলো। অতিরিক্ত দুঃশ্চিন্তার ফলে একজন বয়স্ক আরশোলা না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। এমতাবস্থায় গুরু আরশোলা ভোর রাতে জরুরী সভা আহবান করলেন।

হাত তুলে মাঝ নদীকে ইঙ্গিত করেন গুরু আরশোলা। ছেলেকে বলেন, ‘ঐ যে চাঁদের আলোয় ঝলমল করছে পদ্মার বুক, সেখানে ছিল সোনাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ঐ বিদ্যালয়ের লাইব্রেরী কক্ষের পরিত্যক্ত স্টিল আলমিরার ভিতর ছিল আমাদের বাসস্থান। তখন তুমি ছোট ছিলে। ঠিকমতো হাটতেও পারতেনা। এখন যেখানে বহমান নদী সেখানে ছিল একটি বড় মাঠ। মাঠটি সারাদিন লোকে লোকারণ্য থাকতো। মানুষের বাচ্চারা খেলা করতো। বিভিন্ন উৎসবে মেলা বসত।

বিভিন্ন জায়গা থেকে ফেরিওয়ালা রকমারি খাবার নিয়ে আসতো বিক্রি করার জন্য। আবার রাতের বেলা মাঠটি ঘন অন্ধকারে ছেয়ে যেত। আশেপাশে মানুষের বসতি না থাকায় কোলাহলহীন নিস্তব্ধ এলাকায় পরিনত হতো মাঠটি। তখন পদ্মা পাড়ের আরশোলাদের মিলন মেলা হত মাঠটিতে। এখানে সকল আরশোলা আসতো খাবারের সন্ধানে।

গুরু আরশোলা জোৎ¯œা রাত খুব পছন্দ করেন। জোৎ¯œা রাতে তিনি ঘরে থাকতে পারেন না। তিনি কখনও ধানি জমি, খোলা মাঠ, কখনো বা নদীর পাড়ে এসে জ্যোৎ¯œা ¯œান করতেন এবং মনের আনন্দে ঝিঝি পোকার গান শোনতেন। আজ আকাশে থালার মতো গোল একখানা চাঁদ উঠেছে। চাঁদ মামা যেন দুই হাতে জ্যোৎ¯œা বিলাচ্ছেন কিন্তু তুবও মনটা ভালো নেই গুরু আরশোলার। খাদ্য গুদামের চুরির ঘটনাটি তাকে খুব পীড়া দিচ্ছে। ছেলের সাথে গল্প করতে করতে এক দৃষ্টিতে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকেন তিনি। মাঝ রাত গড়িয়ে ভোর ছুঁই ছুঁই করছে। কলমদর আলীর লাকড়ি ঘরে আরশোলাদের সভা। শীঘ্রই সেখানে যেতে হবে তাই গুরু আরশোলা ছেলেকে নিয়ে সেদিকে অগ্রসর হন। সহ¯্রাধিক আরশোলাদের উপস্থিতিতে সভা অনুষ্ঠিত হলো। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে খাদ্য গুদামের পুরাতন পাহারাদারদের পরিবর্তে নতুন দুজন চৌকস আরশোলাদের নিয়োগ দেয়া হলো। এবং পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলো।

আবছা অন্ধকার কেটে গিয়ে চর্তুদিক আলোকিত হয়ে উঠছে। গুরু আরশোলা ছেলেকে নিয়ে দ্রুত হাটছেন। দুই একজন মানুষ রাস্তায় হাঁটা-হাটি করছে। দিনের বেলা আরশোলাদের চলাচল বিপদজনক। গুরু আরশোলার নতুন বাসাটি একটু দূরে। সেখানে আর কোন প্রতিবেশী আরশোলা নেই। বাসায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আছে। সেখানেও যদি চোরের হাত পড়ে, মনে মনে ভাবেন গুরু আরশোলা। নতুন বাসাটিও একটি বিদ্যালয়। গুরু আরশোলার পিতা বলতেন ‘বিদ্যালয় হলো জ্ঞান মন্দির। আমি চাই আমার ভবিষ্যত প্রজন্ম এই জ্ঞান মন্দিরেই বসবাস করুক।’ গুরু আরশোলার শৈশব কৈশোর এবং যৌবনের বেশীর ভাগ সময় কেটেছে সোনাপুর বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়ে ছিলেন বলেই তিনি প্রচুর জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পেয়েছিলেন। আর সেই জ্ঞানের আলোর পদ্মা পাড়ের আরশোলাদের কাছে তিনি হয়ে উঠেন গুরু আরশোলা। গুরু আরশোলা আরও অনেক ভালো ভালো বাসা পেয়েছিলেন কিন্তু সেখানে ওঠেননি। দূরে হলেও একটি বিদ্যালয়কে বাসার জন্য বেছে নিয়েছেন তিনি। উক্ত বিদ্যালয়ের দপ্তরীটা ভীষণ দুষ্ট। সে বার বার আক্রমণ করে গুরু আরশোলার পরিবারকে। এ যাবৎ এই স্কুলেই বাসার স্থান পরিবর্তন করেছেন বেশ কয়েকবার। প্রথমে ছিলেন বিদ্যালয়ের ডাস্টবিনের কাছে গাড়ির পুরনো একটি টায়ারের ভিতরে। তারপর বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে ফাইলের স্তূপের নিচে। বর্তমানে আছেন বিদ্যালয়ের অব্যবহৃত টয়লেটের ভেতর। সেখানে খুব নিরাপদেই আছেন গুরু আরশোলার পরিবার।

তদন্ত কমিটি রিপোর্ট প্রদান করলেন। তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী একটি টিকটিকি আরশোলাদের খাদ্য গোদামে প্রবেশ করেছে। সেই গোদামের খাবার চুরি করে ভক্ষণ করছে। গুরু আরশোলার পরিকল্পনা অনুযায়ী টিকটিকিকে আক্রমন করা হলো। আরশোলাদের সম্মিলিত শক্তির কাছে পেরে উঠলোনা টিকটিকি। সে আহত হল, তার লেজ কেটে গেল। লেজ ফেলেই পালিয়ে গেল টিকটিকি।

কিছুদিন যেতে না যেতেই আবার চোরের তান্ডব। কিন্তু এবার বেছে বেছে সব ভালো ভালো খাবার খেয়ে সাবাড় করে দিচ্ছে দুষ্ট চোর। গুরু আরশোলা খাদ্য গোদাম পরিদর্শন করে বললেন, নিশ্চয়ই এবার বড় একটি প্রাণীর হাত পড়েছে খাদ্য গোদামে অথবা সেই লেজ কাটা টিকটিকি দলবল নিয়ে আবার হানা দিয়েছে খাদ্য গুদামে। পদ্মা পাড়ের সকল আরশোলা ভয় পেয়ে গেল। পাহারাদার আরশোলারা ভয়ে কাঁপতে শুরু করলো। কেউ তদন্তের দায়িত্বও নিতে চাইলোনা। এদিকে গুরু আরশোলার অনেক বয়স হয়ে গেছে। চোঁখেও কম দেখেন। শরীরে আগের মতো শক্তি নেই। শেষ পর্যন্ত তিনিই তদন্তের দায়িত্ব নিলেন। সহযোগী হিসেবে থাকলো গুরু আরশোলার ছেলে। রাতের বেলা দুজনে ঘাপটি মেরে বসে রইলেন চোরের অপেক্ষায়। সারা রাত চলে গেল চোর এলোনা। ভোর বেলা যখন গুরু আরশোলার চোখ দুটি তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লো এবং গুরু আরশোলার ছেলে বাবার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লো।

ঠিক তখনই মানুষের গন্ধ পেয়ে নড়ে চড়ে বসলেন গুরু আরশোলা। ছেলেকে চুপি চুপি ডাক দিলেন তিনি। দেখা গেল একটি মানুষের বাচ্ছা বেছে বেছে ভালো বিস্কুট, চকোলেট, চিপস ইত্যাদি গপাগপ করে গিলে ফেলছে। গুরু আরশোলার ছেলে, মানুষের বাচ্ছাটিকে চিনে ফেললো। এই মানুষের বাচ্চার বাসায় তার ঘনিষ্ট বন্ধু সুঠাম দেহের কালো আরশোলা বসবাস করে। কালো আরশোলা একদিন বলেছিল, এই মানুষের বাচ্চাটি বেশি বেশি অপচয় করে। এক টুকরু বিস্কুট খেয়ে সারা প্যাকেট ফেলে দেয়। এক দুইটা চিপস খেয়ে পুরোটাই ফেলে দেয়.........। এতে কালো আরশোলার ভালো খাবারের যোগান হয়। খাবারের জন্য তাকে আর বাহিরে যেতে হয় না। পরদিন কালো আরশোলার সাথে যোগাযোগ করে জানা গেল এই মানুষের বাচ্চার বাড়ি-ঘর, সহায়-সম্পত্তি সবকিছু পদ্মা নদীর ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে।

এখন অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছে তারা। মানুষের বাচ্চার পরিবারে ঠিকমতো একবেলাও খাবার জুটেনা। সব শুনে গুরু আরশোলা বললেন, ‘অপচয় করা ভাল নয়। মানুষের বাচ্চাটি বেশি বেশি অপচয় করেছে বলেই তার এই অবস্থা। মহান আল্লাহ তায়ালা তাকে শাস্তি দিয়েছেন। একসময় যে মানুষের বাচ্চা আরশোলার খাবারের যোগান দিত, সেই এখন আরশোলাদের খাবারে ভাগ বসায়। এই মানুষের বাচ্চাটি শিঘ্রই অসুস্থ হয়ে পড়বে কারণ যা আরশোলাদের জন্য সুখাদ্য তা মানুষের জন্য ক্ষতিকর।