১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মধ্যাহ্ন, অপরাহ্ণ!

  • আলী যাকের

পর্ব-২৩

পথের শেষ নেই! এই পৃথিবীর পথে যতই পথ হাঁটা যাক পথ শেষ হয় না কখনও। আমাদের নগরগুলো আকীর্ণ রয়েছে পথে, পথ আছে ছোট শহরে কিংবা গ্রাম-গ্রামান্তরে যতদূর যাওয়া যায়। চাইলেই ওই সব পথ ধরে পথ হাঁটা যায়। আমি হেঁটে চলেছি অবিরত কয়েক দশক ধরে। যে পথে আমি কখনও হাঁটিনি সেই পথে নেমে মনে হয়েছে কতই না কাছের, এই পথ। মনে হয়েছে যারা হাঁটছেন ওই পথে তাদের সবাইকে তো চিনি, আমার সহপথচারী হিসেবে। কত ধরনের পথচারী আছে পথে। নানা আকৃতির, নানা রঙের, নানা ভাষার এবং নানা মতের। পথেই পরিচিত হওয়া যায় নতুন নতুন বন্ধুদের সঙ্গে। এই পরিচয়ের উত্তেজনা আমাদের ভরিয়ে রাখে সকল সময়। আমার অতি প্রিয় এক গান প্রখ্যাত সলিল চৌধুরীর লেখা এবং সুরারোপিত, গেয়েছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় : ‘পথে এবার নামো

সাথী, পথেই হবে পথ চেনা।’ পথে যেমন সহযাত্রীকে চেনা যায় ঠিক তেমনিভাবে আরও অনেক অজানা কথাও জানা যায়। আপনি যদি পথ ভালবাসেন তাহলে পথ আপনাকে অনন্ত আনন্দ ধারায় ভাসিয়ে নিয়ে যাবে নিত্যই। তবে দুঃখজনক হলেও সত্যি যে আমার এই অতি প্রিয় শহর ঢাকায় পথ চলা বড় সহজ নয়। আপনার পথ চলা মসৃণ করা দুষ্কর হয়ে পড়বে এখানে। হাতে কুড়ি কিংবা তিরিশ

মিনিট সময় নিয়ে পথে নামুন। অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে হয়ত ২/৩ ঘণ্টা লেগে যাবে। অতএব, আমার এই প্রিয় শহরে কেউ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে পথ চলতে চায় না এখন আর যদি না তাঁর পথ চলা একান্ত প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। কেউ যদি হাঁটার ব্যাপারে অতি উৎসাহী হন তাহলে তাকে অপেক্ষা করতে হবে একটি যথাযথ সময়ের। হয়ত অনেক রাতে অথবা কাক ডাকা প্রভাতে। যখন আমাদের শহর ক্লান্ত হয়ে পড়ে কিংবা কেবল মাত্র আড়মোড়া ভেঙে ঘুম থেকে ওঠে। এসবই সত্য। কিন্তু তবুও বলতে বাধ্য হই যে আপনি যদি উৎসাহী হোন তবে সব বাধাকে অবজ্ঞা করে পথে নামতে পারেন। যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন সব জেনে শুনেও এই দুর্লঙ্ঘ পথ যাত্রার কি কোন প্রয়োজন আছে? আমি বলব, মাঝে মধ্যে আর কিছু না হোক রোমাঞ্চিত হবার জন্য হলেও চেষ্টা করে দেখতে পারেন।

আমি একজন প্রবীণ মানুষকে চিনি যিনি এই রকম পথ চলায় আনন্দ খুঁজে পান। তিনি শহরের বুক চিরে একটি বিশেষ ছন্দে দুপায়ে নির্ভর করে হেঁটে চলেন এখন, তখন! তিনি বাংলার বুনো ফুল ভালবাসেন এবং সেই ফুল খুঁজে বেড়ান সর্বত্র। তিনি বলেন, বুনো ফুল সব জায়গাতেই ফোটে।

কৌতূহল বশে, আমি নিজেও একদিন পথে নামি, বুনো ফুলের সন্ধানে এবং কি আশ্চর্য, অজ¯্র বুনো ফুল দেখতে পাই চতুর্দিকে। একবার আমি কথা প্রসঙ্গে আমার এক বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে তিনি কখনও আমাদের মিরপুরে অবস্থিত উদ্ভিদ উদ্যানে গিয়েছেন কিনা। তিনি বললেন সেখানে যাওয়ার মতো কোন পরিস্থিতি নেই। এবং বিশেষ করে উদ্ভিদের বৈচিত্র্য তো নেইই। বড় মর্মাহত হয়েছি তার কথা শুনে। এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে আমাকে একবার ওই উদ্যানে যেতে হবে, অচিরেই।

পৃথিবীর নানা প্রান্তে বেশ কিছু শহরে যাবার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। এবং যেখানেই গেছি সেই শহরের উদ্ভিদ উদ্যান দেখতে গেছি। এর শুরু কলকাতা দিয়ে। কলকাতার অদূরে হাওড়ায় অবস্থিত উদ্ভিদ উদ্যানে সপ্তাহান্তের দিনগুলোতে অনেক দর্শকের সমাগম হয়। তারা গাছ দেখতে আসেন।

ঝোপ দেখতে আসেন এবং দেখতে আসেন জলজ উদ্ভিদ। সেখানে প্রত্যেকটি গাছে লেখা রয়েছে তার বোটানিক্যাল নাম, সাধারণ নাম এবং ইতিহাস। প্রায় তিরিশ বছর আগে শেষ গিয়েছিলাম ওই উদ্যানে।

অতএব সব কথা এখন স্পষ্ট মনে নেই তবে বেশ কিছু বিচিত্র গাছপালা দেখেছিলাম যা আমার স্মৃতিতে এখনও ভাস্বর। একটি বিশাল বটগাছের কথা এখনও ভুলতে পারিনি। যার আকার এবং আকৃতির কারণে সারা বিশ্বের নিঃস্বর্গ প্রেমিকেরা এই বৃক্ষটির কথা উল্লেখ করেন প্রায়ই। বট গাছের বটানিক্যাল নাম ফাইকাস বেঞ্জলায়নসিন্স। যদিও এটি একটি বৃক্ষ, এর নানা শাখা-প্রশাখা থেকে ঝুরি নেমে অসংখ্য কান্ডের সৃষ্টি করেছে, দেখে মনে হয় যেন একটি বনই হবে হয়তো বা। গাছটি দাঁড়িয়ে আছে প্রায় চার একর জায়গা জুড়ে। এই বৃক্ষটির প্রধান অথবা মূল যে কা-টি তার উচ্চতা ছিল ৪৫ ফুট। মারা যায় ১৯২৫ সালে। অথচ ঝুরির উপরে নির্ভর করে তিনি দিব্যি দাঁড়িয়ে রয়েছেন। এই বিস্তীর্ণ

গাছটির ছায়া এত ঘন কালো যে ভেতরে প্রবেশ করতে আমার ভয় লেগেছে। এই গাছটির আয়তনের কাছাকাছি আরও একটি বট গাছ আছে আমাদেরই যশোর জেলায়। ওই গাছটি আমি দেখিনি নিজের চোখে। তবে অনেকে মনে করেন যশোরের ওই বট বৃক্ষ কলকাতার বৃক্ষের চেয়েও বড়। পথ চলা দিয়ে শুরু করেছিলাম। হাজির হয়ে গেছি বট বৃক্ষের সানিধ্যে। আসলে পথ না চললে নিঃস্বর্গ সম্বন্ধে ধারণা করা দুষ্কর। অতএব, পথ চলা শুরু করা দরকার আমাদের সবার, নিঃস্বর্গ রক্ষার স্বার্থেই। চলবে