১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটা গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার শিল্পকলার চর্চ্চা ॥ ফৌজিয়া

উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটা গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার শিল্পকলার চর্চ্চা ॥ ফৌজিয়া

অনলাইন ডেস্ক ॥ পাকিস্তানে ১৯৮৪ সালে গড়ে উঠেছিল নতুন একটি নাটকের দল- নাম আজোকা থিয়েটার। পাকিস্তানে সামাজিক নানা পরিবর্তন নিয়ে নাটক সৃষ্টির শুরু এই দলের হাত ধরেই। সেসময় পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল মুহাম্মদ জিয়া-উল হক যে জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন তার শর্ত ভঙ্গ করে জন্ম হয়েছিল এই নাট্যদলের। দলটি প্রতিষ্ঠার পর তাদের প্রথম মূল নাটকে অভিনয় করেছিলেন ফৌজিয়া আফজাল খান।

বিবিসির ফারহানা হায়দারকে তিনি বলছিলেন আজোকা যেভাবে পাকিস্তানে তাদের ভূমিকা প্রতিষ্ঠা করতে চাইছিল, এর আগে কোনো নাটকদল সেভাবে তাদের ভূমিকার কথা ভাবেনি। "আমাদের মনে হয়েছিল পাকিস্তানে একটা মুক্ত অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ গড়ে তোলার লড়াইয়ে আমাদেরও একটা ভূমিকা রাখা উচিত। আমরা সেই লড়াইয়ে সামিল হতে চেয়েছিলাম। "

১৯৭৭ সালে এক অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে জেনারেল জিয়া-উল হক যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন ফৌজিয়া আফজাল খান লাহোরে ছাত্রী। জেনারেল জিয়া-উল হক যখন ক্ষমতা হাতে নেন, তখন খুব দ্রুত তিনি শরিয়া আইন প্রবর্তন করেন। ১৯৭৯ সালে তিনি চালু করেন 'হুদুদ অধ্যাদেশ'। এটি ছিল বিতর্কিত কিছু আইন যার মাধ্যমে পাকিস্তানকে শরিয়া আইনের আওতায় আনার প্রয়াস নেয়া হয়। এসব আইনের মধ্যে ছিল ব্যভিচারীদের শাস্তি হিসাবে পাথর ছুঁড়ে মারা বা তাদের বেত্রাঘাত করা।

পাকিস্তানে ১৯৮৪ সালে গড়ে উঠেছিল নতুন একটি নাটকের দল- নাম আজোকা থিয়েটার। পাকিস্তানে সামাজিক নানা পরিবর্তন নিয়ে নাটক সৃষ্টির শুরু এই দলের হাত ধরেই। সেসময় পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল মুহাম্মদ জিয়া-উল হক যে জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন তার শর্ত ভঙ্গ করে জন্ম হয়েছিল এই নাট্যদলের। দলটি প্রতিষ্ঠার পর তাদের প্রথম মূল নাটকে অভিনয় করেছিলেন ফৌজিয়া আফজাল খান। বিবিসির ফারহানা হায়দারকে তিনি বলছিলেন আজোকা যেভাবে পাকিস্তানে তাদের ভূমিকা প্রতিষ্ঠা করতে চাইছিল, এর আগে কোনো নাটকদল সেভাবে তাদের ভূমিকার কথা ভাবেনি। "আমাদের মনে হয়েছিল পাকিস্তানে একটা মুক্ত অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ গড়ে তোলার লড়াইয়ে আমাদেরও একটা ভূমিকা রাখা উচিত। আমরা সেই লড়াইয়ে সামিল হতে চেয়েছিলাম। "

১৯৭৭ সালে এক অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে জেনারেল জিয়া-উল হক যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন ফৌজিয়া আফজাল খান লাহোরে ছাত্রী। জেনারেল জিয়া-উল হক যখন ক্ষমতা হাতে নেন, তখন খুব দ্রুত তিনি শরিয়া আইন প্রবর্তন করেন। ১৯৭৯ সালে তিনি চালু করেন 'হুদুদ অধ্যাদেশ'। এটি ছিল বিতর্কিত কিছু আইন যার মাধ্যমে পাকিস্তানকে শরিয়া আইনের আওতায় আনার প্রয়াস নেয়া হয়। এসব আইনের মধ্যে ছিল ব্যভিচারীদের শাস্তি হিসাবে পাথর ছুঁড়ে মারা বা তাদের বেত্রাঘাত করা।

গড়ে উঠল 'ব্যতিক্রমী' আজোকা থিয়েটার

১৯৮৪ সালে মাদিহা গওহর আজোকা থিয়েটার সংস্থা গড়ে তোলেন - তার উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানে তখন যা ঘটছিল তাকে নাটকের মধ্যে দিয়ে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা।

"রাজনৈতিক চিন্তাভাবনায় সক্রিয় ছিল এই নাটকের দল। এধরনের নাটক তখন ছিল না। কেউ কোনদিন করে নি। এটা ছিল পুরো নতুন ধরনের। ফলে লোকে উৎসুক ছিল- এক্সাইটেড ছিল। রাজনৈতিক নাটকের জন্য মানুষের একটা ক্ষুধা ছিল। প্রচুর মানুষ এল নাটকে দেখতে। কোন বিজ্ঞাপন ছিল না। সবাই এসেছিল লোকমুখে খবর পেয়ে।" এরপর ১৯৮৭ সালে আজোকা তাদের নিজস্ব রচনা মঞ্চস্থ করার জন্য তৈরি হয়। মাদিহা যোগাযোগ করেন বান্ধবী ফৌজিয়ার সঙ্গে। "মাদিহা বলল- শোন- দারুণ খবর। আমরা নতুন নাটক নামাচ্ছি। নাটক লেখাই হয়েছে আজোকায় মঞ্চায়নের জন্য। নাটক লিখেছেন শাহেদ নাদিম। আমরা সবাই জানতাম শাহেদ গণতন্ত্রকামী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। জেনারেল জিয়া ক্ষমতাগ্রহণ করার আগে তাকে জেলে যেতে হয়েছিল। জেল থেকে ছাড়া পাবার পর জিয়া প্রশাসন তাকে হুমকিধামকি দেয়। ফলে দেশ ছেড়ে পালিয়েছিল সে।"

মাদিহা ফৌজিয়াকে বললেন ঐ নাটকে অংশ নিতে। ফৌজিয়া ফিরে গেলেন লাহোরে দলের প্রথম মূল নাটকে অংশ নিতে। নাটকের নাম ছিল বারি- যার অর্থ 'খালাস'। এই নাটকে হুদুদ আইনকে সরাসরি আক্রমণ করা হয়। তুলে ধরা হয় এই আইনের কারণে নারীরা কীভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে। যেমন কোন নারী ধর্ষণের শিকার হলে তাকে এই অপরাধ প্রমাণ করার জন্য চারজন পুরুষ সাক্ষী আনতে হবে। আর সেই নারী যদি তা করতে না পারে তাহলে তাকেই ব্যভিচারের দায়ে অভিযুক্ত করা হবে। বারি নাটকটি ছিল ঊর্দু ও পাঞ্জাবী ভাষায়। ফৌজিয়া বলছেন তিনি যে ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন সেই নারীর মুখের ভাষা ছিল সারাইকি । "সারাইকি ভাষায় কথা বলা হয় দক্ষিণ পাঞ্জাবে। আমি অভিনয় করেছিলাম ঐ এলাকার এক নারীর ভূমিকায়, যে ওই অঞ্চলের ভাষায় গান করে, বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে। দু:খের বিষয় এই মুহূর্তে পাঞ্জাবের ওই অঞ্চলে ধর্মীয় উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিয়েছে," বলছিলেন ফৌজিয়া।

"ওই অঞ্চলের সুফি কবিরাও কিন্তু লিখতেন এই সারাইকি ভাষায়। আমি ওই নাটকে যে নারীর চরিত্রে অভিনয় করছিলাম সেই চরিত্রে আমি খুবই প্রশাসন বিরোধী গান গেয়েছিলাম। সারাইকি ভাষায় গাওয়া ওই গানে ছিল ধর্মীয় উগ্রবাদী চিন্তাধারার কড়া সমালোচনা আর মোল্লাদের ব্যঙ্গ করে ঠাট্টাতামাশা।"

নাটকে থাকত পাকিস্তানে নারীদের দুরাবস্থার কথা

ফৌজিয়া বলছিলেন ওই নাটকে সেসময় পাকিস্তানের নারীদের দুরাবস্থার কথা তুলে ধরা হয়েছিল। যে নারীদের লক্ষ্য করে তৈরি হয়েছিল বৈষম্যমূলক নানা আইন, তুলে ধরা হয়েছিল তাদের দু:খের কথা। "নাটকটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নারীদের সমস্যা সম্পর্কে অন্যদের সচেতন করাই ছিল নাটকের মূল লক্ষ্য। আমরা তুলে ধরতে চেয়েছিলাম কত কঠিন সংগ্রামের মুখোমুখি আমরা।"

"প্রশাসন অবশ্যই অখুশি হয়েছিল আমাদের ওপর। আজোকা থিয়েটার তার জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে তাদের যাত্রাপথে সরকারের দিক থেকে নানাধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে ধর্মীয় নেতাদের রোষানলে পড়েছে বহুবার। মাদিহাকে জেলে যেতে হয়েছে। ধর্মীয় দলগুলো যেহেতু অভিযোগ আনত এসব অ-ইসলামিক, ফলে তার নাটক অনুষ্ঠানগুলোর ওপর প্রায়ই নজরদারি চালানো হতো। ওর বেশ কিছু নাটক নিষিদ্ধও করা হয়েছে।" আজোকার জন্য নাটক মঞ্চায়ন ছিল রীতিমত একটা সংগ্রামের ব্যাপার, বলছিলেন ফৌজিয়া আফজাল খান। "মাদিহা ছিলেন রীতিমত দু:সাহসী। তিনি লোকজন জড়ো করতেন। আমরাও তুমুল উৎসাহে আমাদের বক্তব্য তুলে ধরতাম। বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখে আজোকার যাত্রাপথের ইতিহাসের একটা বড় অংশ ছিল প্রতিনিয়ত হয়রানির মধ্যে নাটক মঞ্চায়নের দুরূহ চেষ্টা।"

জেনারেল জিয়া ক্ষমতায় ছিলেন ১১ বছর। কিন্তু যে আইন তিনি চালু করেছিলেন তা এখনও কার্যকর রয়েছে। ২০০৬ সালে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশারফ নারীদের সুরক্ষা দিতে এই আইনগুলোর কিছুটা আধুনিকায়নের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তার সংস্কারগুলো খুবই সীমিত মাত্রায় বাস্তবায়িত হয়েছিল। মাদিহা গওহর মারা যান এ বছর- ২০১৮ সালে । কিন্তু তার হাতে গড়া আজোকা নাট্যদল এখনও রাজনৈতিক নাটক মঞ্চস্থ করছে।

সমাজে কতটা পরিবর্তন এনেছিল আজোকা?

এই নাটকের দল পাকিস্তানের সমাজে পরিবর্তন আনতে কতটা সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পেরেছিল? এই প্রশ্নে ফৌজিয়া আফজল খান বলেন এই নাট্যদল পাকিস্তানে খুবই প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছে।

"আজোকার মূল উদ্দেশ্য ছিল নাটকের মাধ্যমে সমাজে পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে কাজ করা। এছাড়াও অন্যান্য থিয়েটার দলের জন্য কাজ করার পথ প্রশস্ত করতে সাহায্য করেছিল আজোকা। তারা একসঙ্গে যে নাট্য আন্দোলন গড়ে তুলেছিল তার ফলশ্রুতিতে পাকিস্তানে আজ একটা মুক্ত নাট্যচর্চ্চার পরিবেশ গড়ে উঠেছে। আজোকা না থাকলে সেটা কোনদিনই সম্ভব হতো না," বলছিলেন ফৌজিয়া।

"জিয়াউল হক পরবর্তী পাকিস্তান ছিল নাট্যচর্চ্চার ক্ষেত্রে অন্ধকার কয়েকটি দশক। সেই সময় মাদিহা সবরকম প্রতিকূলতার মুখেও পাকিস্তানে সামাজিক নাটকের মঞ্চায়ন, সেইসঙ্গে নাটকে গান ও নাচের ব্যবহারকে বাঁচিয়ে রাখার দু:সাহস দেখিয়েছিলেন।"

ফৌজিয়া মনে করেন উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটা গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার শিল্পকলার চর্চ্চা। "কারণ শিল্প-সংস্কৃতি না থাকলে মানুষের আশার মুত্যু ঘটে। উগ্রপন্থায় যে হত্যার আদর্শকে অনুপ্রাণিত করা হয়, তার বিরুদ্ধে কথা বলার একমাত্র মাধ্যম শিল্পকলার চর্চ্চা। এর মধ্যে দিয়েই মানুষ তার বিকল্প পথ খুঁজে নিতে পারে। শিল্প-সংস্কৃতি না থাকলে সমাজে মত বিনিময় বা সংলাপের পথ অবরুদ্ধ হয়ে যায়। শিল্প-সংস্কৃতি ছাড়া কোন সমাজ টিঁকতে পারে না," বলছিলেন ফৌজিয়া আফজাল খান।

ফৌজিয়া আফজাল খান বর্তমানে বাস করেন নিউ ইয়র্কে। সেখানে মন্টি ক্লেয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ইংরেজি পড়ান।

সূত্র : বিবিসি বাংলা