১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জাতীয় পার্টির ৩৯ প্রার্থীর হাতে মহাজোটের চিঠি

রাজন ভট্টাচার্য ॥ মহাজোটের অন্যতম শরিক জাতীয় পার্টি শেষ পর্যন্ত কত আসন পাচ্ছে এ নিয়ে আলোচনা চলছে বেশ। দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে আসন বণ্টন ইস্যুতে আগ্রহের শেষ নেই। যদিও ২২০টি আসনে জাপার পক্ষ থেকে প্রার্থী মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল। কিন্তু আগামীকাল ৯ ডিসেম্বর রবিবার প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। তাই আজ শনিবারের মধ্যেই সবকিছু চূড়ান্ত হবে। যদিও শুক্রবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জোটের শরিকদের জন্য ৬০টি আসন ছাড় দেয়ার কথা বলেন। এরমধ্যে ১৪ দলের শরিক ও যুক্তফ্রন্টকে দেয়া হয়েছে ১৭টি আসন। বাকি আছে ৪৩টি। যদিও জাপা মহাসচিব বলেছেন, তাদের প্রত্যাশা ৪৫ আসন পাওয়ার। তবে শুক্রবার রাত পর্যন্ত দলের ৩৯ প্রার্থীকে মহাজোটের চূড়ান্ত মনোনয়নপত্রের চিঠি তুলে দেন জাপা মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা।

জাপা সূত্রে জানা গেছে, দলের পক্ষ থেকে মহাজোটের প্রার্থী যারা হয়েছেন তাদের প্রত্যেকেই নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করতে পারেন। এর বাইরে দলের নেতাদের দাবির মুখে কিছু প্রার্থী বিভিন্ন আসনে দেয়া হতে পারে। তারা দলীয় প্রতীক লাঙ্গল নিয়ে নির্বাচন করবেন। তবে কত আসনে লাঙ্গল প্রতীকে জাপার প্রার্থীরা নির্বাচন করছেন তা ঠিক হয়নি। আজকের মধ্যে বিষয়টি চূড়ান্ত হতে পারে। জাপার একাধিক সূত্র বলছে, মহাজোটের সমঝোতা হওয়া আসনগুলোর বাইরে আরও অন্তত ৩০টি আসনে দলের প্রার্থীরা পৃথকভাবে নির্বাচন করতে পারেন। শরিক নেতারা নিজ দলের প্রতীক নিয়ে পৃথকভাবে নির্বাচন করার ইঙ্গিত দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকেও।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের কাছে ১০০ আসন দাবি করেছিলেন এরশাদ। এরপর ৩০টি আসন ছাড় দেয় জাপা। ৭০টি আসন নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে দরকষাকষি চলে। তখন ওবায়দুল কাদের স্পষ্ট জানিয়ে দেন জোটের শরিকদের জন্য সর্বোচ্চ ৭০ আসন ছাড় দেবে আওয়ামী লীগ। এই ধারাবাহিকতায় দলীয় মনোনয়ন দেয় উভয় পক্ষ। এরমধ্যে জাপায় মনোনয়ন বাণিজ্য নিয়ে অভিযোগ ওঠে। নানা নাটকীয়তার মধ্যে এরশাদ আবারও সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে। জাপা মহাসচিবেও পরিবর্তন আসে। এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারকে মহাসচিবের দলের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। এমনকি তার মনোনয়নপত্র সর্বশেষ নির্বাচন কমিশনের আপীলে টিকেনি। দলীয় প্রধানের অনুপস্থিতে এখন সবকিছু দেখভাল করবেন মশিউর রহমান রাঙ্গা।

৯ ডিসেম্বর মনোনয়ন প্রত্যাহারের আগে মহাজোটের আসন চূড়ান্ত হবে আওয়ামী লীগ ও জাপার পক্ষ থেকে একথা বারবার বলা হয়। তাই শুক্রবার জাতীয় পার্টির বনানী কার্যালয়ে চূড়ান্ত মনোনয়নের টিকেট নিতে আসেন অনেক প্রার্থীই। একে একে সমঝোতা হওয়া আসনগুলোতে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্রের চিঠি তুলে দেন মশিউর রহমান রাঙ্গা। ঢাকা-৪ আসন থেকে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পাওয়া বর্তমান সংসদ সদস্য আবু হোসেন বাবলা বলেন, শুক্রবার বিকেলে আমি মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত মনোনয়নপত্র পেলাম। দলের মহাসচিবের পক্ষ থেকে মনোনয়নপত্র দেয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য এখন নৌকার পক্ষে বিজয় নিশ্চিত করা। আমি নিজের নির্বাচনী এলাকায় সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকা-ের কথা প্রার্থীদের কাছে তুলে ধরছি অনেক আগে থেকেই। বরিশাল-৬ আসন থেকে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত মনোনয়নপত্র নেন নাসরিন জাহান রতœা। আরেকটি সূত্র বলছে, কিছু আসনে মহাজোটের প্রার্থীদের চূড়ান্ত মনোনয়নপত্র তুলে দেয়া হয়েছে। বাকি আসনগুলোর চিঠি আজ শনিবার দেয়া হতে পারে।

জাপার নিশ্চিত হওয়া আসনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রংপুর বিভাগে ৯টি। আসনগুলো হলো: রংপুর-১ মশিউর রহমান রাঙ্গা, রংপুর-৩ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, নীলফামারী-৩ কাজী ফারুক কাদের, নীলফামারী-৪ শওকত চৌধুরী, কুড়িগ্রাম-১ আক্কাস আলী, কুড়িগ্রাম-২ পনির উদ্দিন আহমেদ, কুড়িগ্রাম-৪ আসাফউদ্দৌলা তাজ, লালমনিরহাট-৩ জি এম কাদের এবং গাইবান্ধা-১ শামীম হায়দার পাটোয়ারী।

রাজশাহী বিভাগের মধ্যে কেবল বগুড়ায় ছাড় পাচ্ছে জাতীয় পার্টি। রাজধানীর দুটি আসনের মধ্যে রয়েছে, ঢাকা-৪ সৈয়দ আবুল হোসেন বাবলা, ঢাকা-৬ কাজী ফিরোজ রশীদ, নারায়ণগঞ্জ-৩ লিয়াকত হোসেন খোকা, নারায়ণগঞ্জ-৫ এ কে এম সেলিম ওসমান এবং কিশোরগঞ্জ-৩ মুজিবুল হক চুন্নু। বরিশাল-৬ নাসরিন জাহান রত্না এবং পিরোজপুর-৩ রুস্তম আলী ফরাজী। বরিশাল-২ আসনে চিত্রনায়ক সোহেল রানা, ময়মনসিংহ-৪ বেগম রওশন এরশাদ ও ময়মনসিংহ-৮ ফখরুল ইমাম।

সিলেট-২ ইয়াহহিয়া চৌধুরী এবং সুনামগঞ্জ-৪ পীর ফজলুর রহমান মেসবাহ। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ রেজাউল ইসলাম ভুঁইয়া, লক্ষ্মীপুর-২ এম এ নোমান, ফেনী-৩ মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম-৫ আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। এছাড়াও আরও কিছু আসনে জাপার প্রার্থী চূড়ান্ত হয়েছে মহাজোটের পক্ষ থেকে।

আওয়ামী লীগের নেতারা জানান, কিছু আসন আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হচ্ছে। সেসব আসন নিয়ে সমঝোতা না হওয়াই এর কারণ। ২০০৮ সালেও বেশ কিছু আসনে দুই দলেরই প্রার্থী ছিল। ২০১৪ সালে সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ৩৪টি আসন পায়। সংরক্ষিত মিলিয়ে বর্তমানে জাপার আসন সংখ্যা ৪০টি। তাই ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনকে সামনে রেখে জাপা ৭০টি আসন দাবি করেছিল। তবে অন্তত ৪৫টি আসন পাওয়ার ব্যাপারে এখনও আশাবাদী দলীয় হাইকমা-।

নির্বাচন শক্ত হবে- রাঙ্গা ॥ বিএনপি নির্বাচনে আছে, তাই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন খুব শক্ত হবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা। এ কারণেই যারা জয়ী হতে পারবেন তাদেরই মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হবে বলেও জানান তিনি। শুক্রবার জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের বনানী অফিসে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন রাঙ্গা।

জাতীয় পার্টি ৪৫টি আসন পেতে পারে জানিয়ে মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, দুই-একদিনের মধ্যেই মহাজোটে জাতীয় পার্টির প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করা হবে। মহাজোটের অন্যান্য শরিক দলের সঙ্গে আলোচনা চলছে। জাতীয় পার্টি ৪৫টি আসন পেতে পারে। দলের নতুন দায়িত্ব নেয়া মহাসচিব রাঙ্গা বলেন, বিএনপি নির্বাচনে আছে, তাই একাদশ জাতীয় নির্বাচন খুব শক্ত হবে। মহাজোটভুক্ত দলগুলোর জনপ্রিয় প্রার্থীরাই মনোনয়ন দেয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে, সে ক্ষেত্রে কে কোন দলের প্রার্থী তা বিবেচনা করা হবে না। দুই-এক দিনের মধ্যেই জাতীয় পার্টির ইশতেহার ঘোষণা করার কথাও জানান তিনি।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শারীরিক অবস্থা জানতে চাইলে রাঙ্গা বলেন, তিনি ভালো আছেন, সুস্থ আছেন। এ সময় জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য এস এম ফয়সল চিশতী, মজিবুর রহমান সেন্টু, রেজাউল ইসলাম ভূইয়া, মহাসচিব লিয়াকত হোসেন খোকা, সাংগঠনিক সম্পাদক আমির হোসেন ভূইয়া, এস এম ইয়াসির, যুগ্ম দফতর সম্পাদক এম এ রাজ্জাক খান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

মহাজোটের শরিকদের মধ্যে আসন বণ্টন সম্পন্ন করেছে আওয়ামী লীগ। শরিকদের শেষ পর্যন্ত ৬০টি আসন দিচ্ছে দলটি। শুক্রবার সকালে ধানম-িতে আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব জানান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। কাদের জানান, শরিকদের মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টিকে ৫টি, জাসদ (ইনু) ৩টি, জাসদ (আম্বিয়া) ১টি, তরিকত ফেডারেশন ২টি, জাতীয় পার্টিকে (জেপি) ২টি আসন দেয়া হয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে ১৪ দলের শরিকদের জন্য সংরক্ষিত মিলিয়ে ১৭টি আসন দেয়া হয়।

ওয়ার্কার্স পার্টির পাঁচটি আসনের মধ্যে রয়েছে, রাশেদ খান মেনন (ঢাকা-৮), ফজলে হোসেন বাদশা (রাজশাহী-২), মোস্তফা লুৎফুল্লাহ (সাতক্ষীরা-১), ইয়াসিন আলী (ঠাকুরগাঁও-৩) এবং বরিশাল-৩ আসন থেকে শেখ টিপু সুলতান। মহাজোট এবার জাসদকে (ইনু) দিয়েছে ৩টি আসন। এ আসনগুলো হলো- কুষ্টিয়া-২ হাসানুল হক ইনু, ফেনী-১ শিরীন আখতার ও বগুড়া-৪ এ কে এম রেজাউল করিম তানসেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ জাসদের মইনউদ্দিন খান বাদল চট্টগ্রাম-৮ আসন থেকে লড়বেন নৌকা প্রতীক নিয়ে।

শরিক দল তরিকত ফেডারেশনকে দু’টি আসন দিয়েছে জোটের বড় দল আওয়ামী লীগ। এগুলো হলো চট্টগ্রাম-২ নজিবুল বশর মাইজভা-ারী ও লক্ষ্মীপুর-১ আনোয়ার হোসেন খান, জাতীয় পার্টি (জেপি) পাচ্ছে দু’টি আসন। পিরোজপুর-২ আসনে নৌকা প্রতীকে লড়বেন আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও কুড়িগ্রাম-৪ আসনে নৌকার প্রার্থী হিসেবে থাকবেন রুহুল আমিন। বিকল্প ধারার মাহী বি. চৌধুরীকে দেয়া হয়েছে মুন্সীগঞ্জ-১ আসনটি। মহাজোটের হয়ে নৌকা প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন তিনি। এ ছাড়া লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে মেজর (অব.) আব্দুল মান্নান ও মৌলভীবাজার-২ আসনে এম এম শাহীনকে নৌকা প্রতীক দিয়েছে আওয়ামী লীগ।

তবে মহাজোটের এই শরিকরা চাইলে তাদের নিজ নিজ প্রতীকেও নির্বাচন করতে পারবেন বলে জানিয়েছেন ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, নৌকা প্রতীক ছাড়াও তারা অন্য কেউ নির্বাচন করতে চাইলে নিজ দলের প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে পারবেন।

এ ছাড়া এরশাদের জাতীয় পার্টিকে ৪০ থেকে ৪২টি আসন দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন ওবায়দুল কাদের। এক প্রশ্নের জবাবে কাদের বলেন, আমাদের একটা স্ট্র্যাটেজি আছে। সেটা হিসেব করেই নির্বাচন করছি। পৃথক প্রার্থী হলে আমাদের কোন সমস্যা নেই। সমঝোতার ভিত্তিতে আসন ভাগাভাগির নামে বানরের পিঠা ভাগ করছি না।