১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিলুপ্ত ১১১ ছিটের মানুষ অপেক্ষার প্রহর গুনছে

রাজুমোস্তাফিজ ফুলবাড়ীর বিলুপ্ত ছিট দাশিয়ারছড়া থেকে ফিরে ॥ শুক্রবার সকাল ১১টা, শীতের সকাল। তখনও কুয়াশা কাটেনি। দাশিয়ারছড়া গ্রামের কালিরহাট বাজারে চায়ের দোকানে বসে সত্তরোর্ধ কৃষক ইছাহাক আলী, জহুরুল হক (৫৫), বাচ্চু শেখ (৪৫), শাহ আলমগীর (৫৮), জোবায়দুল হক (৪৭)। সবাই আগামী নির্বাচনের আলাপ করছেন। তাদের সকলের মাঝে চাপা আনন্দ কাজ করছে। বাংলাদেশের মূল ভূখ-ে যুক্ত হওয়ার পর জীবনে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেব এবারেই প্রথম তারা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। দেশ পরিচালনার প্রতিনিধি নির্বাচনে নাগরিক অধিকার প্রয়োগের এমন সুযোগে নতুন এই নাগরিকদের মাঝে দেখা দিয়েছে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা। পুরো দেশের মানুষের মতো তারাও ভোট উৎসবে মেতে উঠেছেন।

বিলুপ্ত ছিটের মানুষ কৃতজ্ঞ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি। তার কারণেই দু’বছর আগে দীর্ঘ ৬৮ বছরের বন্দী জীবন কাটিয়ে তারা মুক্তির স্বাদ পেয়েছেন। মাথা উচু করে কথা বলতে পারছেন। এত কম সময়ে শুধু প্রধানমন্ত্রীর সদইচ্ছায় এত উন্নয়ন হতে পারে তা কল্পনাও করতে পারেনি বিলুপ্ত ছিটমহল দাশিয়ার ছড়ার মানুষ। এখানকার অধিকাংশ মানুষ চায় এ মহাজোট সরকার আবারও ক্ষমতায় আসুক। সারাদেশের মতো তাদের এমন উন্নয়ন অব্যাহত থাকুক। শেখ হাসিনা মহাজোটের প্রার্থী যাকেই দিন না কেন তারা তার পক্ষেই কাজ করবে এবং নিজেদের ভোট প্রয়োগ করবে। শুধু কুড়িগ্রামের দাশিয়ারছড়া নয় বাংলাদেশের অভ্যন্তরের ১১১টি বিলুপ্ত ছিটমহলের ৪১ হাজার ৪ শ’ ৪৯ জন মানুষ বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ায় তারা প্রথমবার সংসদ ভোট দিতে পারবেন। নিজের মতো করে আইন প্রণেতা তৈরি করবেন। তারাও চান সারাদেশে যে উন্নয়নের জোয়ার চলছে কোনভাবে যেন বাধাগ্রস্ত না হয়। এখানকার মানুষরাও চায় না আবার জঙ্গীবাদ ফিরে আসুক।

দাশিয়ারছড়া বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল মান্নান ও সহকারী শিক্ষক হায়দার আলী, সমন্বয়পাড়া উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম জানান দু’বছর আগে আমরা পরাধীনতার শিকল ভেঙ্গে মুক্তির স্বাদ পাই। এটা শুধু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক ইচ্ছায় সম্ভব হয়েছে। তার কারণে দেশের প্রতিটি বিলুপ্ত ছিটমহলে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। আমরা যেন স্বপ্নের সাগরে ভাসছি । আগামীতে যদি বর্তমান সরকার আবারও ক্ষমতায় আসে তাহলে আমাদের দেশ সোনার বাংলা হবে ।

আয়শা সিদ্দিকা (৫৪), আলেকজন বিবি (৫০), রাহেলা বেগম (৪০), প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন,‘ খাঁচার বন্দী পাখি কেবল বোঝে, স্বাধীনতার কী স্বাদ? তাই এর মর্মে আমরা বুঝতে পারছি হৃদয় দিয়ে। দীর্ঘদিন পর আমরা এবার জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে পারব। শুধু পুরুষরা নয় মহিলারাও দারুণ খুশি। অধিকাংশ মানুষ জানান কুড়িগ্রাম-২ আসনে আওয়ামী লীগের কোন প্রার্থী না থাকায় তারা হতাশ হয়েছে। তারা শেখ হাসিনার প্রতীক নৌকা মার্কায় ভোট দিতে চান। তার কাছে এখানকার মানুষরা কৃতজ্ঞ। তবে তিনি মহাজোটের প্রার্থী যাকেই মনোনয়ন দিবেন তার পক্ষেই কাজ করবেন এবং ভোট দিবেন। এখনও কোন দলের প্রার্থী তাদের কাছে আসেননি। মনোনয়ন পাবার পর হয়ত তারা মাঠে নামবেন। কামালপুর গ্রামের তরুন ভোটার রাধাকান্ত রায়, আমিনুল ইসলাম, শরীফউদ্দিন, আব্দুল হাই ও মনিরুজ্জামান জানান, আমরা দীর্ঘদিন অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরে এসেছি। এটা শুধু সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান ও তার কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কারণে। তাই আগামী ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মনোনিত প্রার্থীকে ভোট দিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করব।

বিলুপ্ত ছিটমহল বিনিময় আন্দোলনের প্রাক্তন নেতা আলতাফ হোসেন জানান দীর্ঘ ৬৮ বছর আমরা রাষ্ট্রীয় পরিচয়হীন ছিলাম। ভারত ও বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধন করার মধ্য দিয়ে আমরা মুক্ত হয়েছি। আমরা ফিরে পেয়েছি নাগরিক মর্যাদা। জীবনে প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে পারায় ভীষণ খুশি দেশের ১১১টি বিলুপ্ত ছিটের নারী পুরুষরা। তারা এখন শুধু অপেক্ষার প্রহর গুণছে। আগামী ৩০ ডিসেম্বর ভোটের দিন প্রতিটি এলাকায় ঈদের আমেজ বিরাজ করবে। কারণ এখানকার মানুষ জীবনে প্রথম জাতীয় নির্বাচনে নিজেদের মতামত প্রয়োগ করবেন। বিলুপ্ত দাশিয়ারছড়া মৌজার ৯টি ওয়ার্ড হচ্ছে সমন্বয়পাড়া, বানিয়াটারী, দোলাটারী, বটতালা আদিপপুর, কামালপুর, চরাটার রাসমেলা, খরিয়াটারী ও ছোটখামার। এখানে ১ হাজার ৮ শ’ পরিবারে প্রায় ৯ হাজার মানুষ রয়েছে।

উপজেলা নির্বাচন অফিসার হাওলাদার মোহাম্মদ কামরুল হাসান জানান, দাশিয়ারছড়াসহ ফুলবাড়ী উপজেলার মোট ভোটার সংখ্যা ১ লক্ষ ২৬ হাজার ৪১১ জন। পুরুষ ভোটার ৬২ হাজার ৩০১ জন ও মহিলা ভোটার ৬৪ হাজার ১১০ জন। এদের মধ্যে বিলুপ্ত দাশিয়ারছড়ায় মোট ভোটার সংখ্যা ৩ হাজার ১ শ’ ৭২ জন। পুরুষ ভোটার ১ হাজার ৫৯০ জন ও মহিলা ভোটার ১ হাজার ৮২ জন। উপজেলায় মোট ভোটকেন্দ্র ৫০টি। বিলুপ্ত দাশিয়ারছড়াবাসীরা পাঁচটি ভোট কেন্দ্রগুলো হচ্ছে পশ্চিম কুটি-চন্দ্রখানা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, পূর্ব চন্দ্রখান উচ্চ বিদ্যালয়, চন্দ্রখানা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, আটিয়াবাড়ী ১ নং সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ছড়ারপাড় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়।