২২ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শেখ হাসিনার দর্শন ও মানবিক বাংলাদেশ

  • রেজা সেলিম

১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ভাষণের শুরুতেই উল্লেখ করেছিলেন, ‘একটি স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে মুক্ত ও সম্মানজনক জীবন যাপনের অধিকারের জন্য বাঙালী জাতি বহু শতাব্দী ধরে সংগ্রাম চালিয়ে এসেছে। তারা চেয়েছে বিশ্বের সকল জাতির সঙ্গে শান্তি ও সৌহার্দ্যরে মধ্যে বসবাস করতে। জাতিসংঘ সনদে যে মহান আদর্শের কথা বলা হয়েছে তা আমাদের জনগণের আদর্শ এবং এ আদর্শের জন্য তারা চরম ত্যাগ স্বীকার করেছে। এমন এক বিশ্ব-ব্যবস্থা গঠনে বাঙালী জাতি উৎসর্গীকৃত, যে ব্যবস্থায় সকল মানুষের শান্তি ও ন্যায়বিচার লাভের আকাক্সক্ষা প্রতিফলিত হবে এবং আমি জানি, আমাদের এ প্রতিজ্ঞা গ্রহণের মধ্যে আমাদের লাখ লাখ শহীদের বিদেহী আত্মার স্মৃতি নিহিত রয়েছে।’

এই ভাষণের পরতে পরতে উল্লেখ আছে বিশ্ব পরিসরে বাংলাদেশ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর দার্শনিক ভাবনার বিবরণ যার প্রতিফলন এখন দেখা যাচ্ছে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার দেশ পরিচালনার অন্তর্নিহিতে। বঙ্গবন্ধু যে বিশ্ব ব্যবস্থার স্বপ্নের কথা সেদিন বলেছিলেন, যে ব্যবস্থায় সকল মানুষের শান্তি ও ন্যায়বিচার লাভের আকাক্সক্ষা প্রতিফলিত হবে, আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি সেরকম এক বিশ্ব ব্যবস্থার প্রতিরূপেই বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারের নেতৃত্বের আসনে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দের তালিকায় ঠাঁই করে নিয়েছেন অন্তত ডজনখানেক বিবেচনায়। আর তা সম্ভব হয়ে উঠেছে এই কারণেই যে, শেখ হাসিনা গত এক দশকে নিজের দেশকে বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনার আলোকে দাঁড় করিয়েছেন ফলে বাংলাদেশ একটি গ্রহণযোগ্য স্থিতিশীল উন্নয়নকামী দেশ হিসেবে বিশ্ববাসীর নজর কাড়ছে। কেউ কেউ এই ব্যবস্থা নির্মাণের কৌশলকে ‘ম্যাজিক’ বলছেন।

বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে আরও যা যা বলেছিলেন সেসবের বিশ্লেষণ করলে আমরা স্পষ্টতই দেখতে পাই, শেখ হাসিনা মূলত সে ভাষণেরই প্রতিপাদ্যকে তাঁর নিজের জীবন ও দেশ পরিচালনার আদর্শে যুক্ত করে নিয়েছেন। ভাষণের এক অংশে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘মানবের অসাধ্য সাধন ও দুরূহ বাধা অতিক্রমের অদম্য শক্তির প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থার কথা আবার ঘোষণা করতে চাই। আমাদের মতো দেশসমূহ, যাদের অভ্যুদয় সংগ্রাম ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে, এই আদর্শে বিশ্বাসই তাদের বাঁচিয়ে রাখবে। আমাদের কষ্ট স্বীকার করতে হতে পারে। কিন্তু আমাদের ধ্বংস নেই। এই জীবন যুদ্ধের মোকাবেলায় জনগণের প্রতিরোধ ক্ষমতা ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞাই শেষ কথা। আত্মনির্ভরশীলতাই আমাদের লক্ষ্য। জনগণের ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগই আমাদের নির্ধারিত কর্মধারা। এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই যে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সম্পদ ও প্রযুক্তিবিদ্যায় অংশীদারিত্ব আমাদের কাজকে সহজতর করতে পারে, জনগণের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করতে পারে। কিন্তু আমাদের ন্যায় উদীয়মান দেশসমূহের অবশ্যই নিজেদের কার্য-ক্ষমতার প্রতি আস্থা রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, শুধু জনগণের ঐক্যবদ্ধ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই আমরা আমাদের নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হতে পারি, গড়ে তুলতে পারি উন্নততর ভবিষ্যত’।

১৯৭৪ সালে বিশ্ব দরবারে দেয়া এই দিক নির্দেশনার সঠিক অনুসরণ আজকের ডিজিটাল বাংলাদেশে বাস্তব ও সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। সংগ্রাম ও ত্যাগের মাধ্যমে যেসব দেশের জন্ম ‘মানবের অসাধ্য সাধন’ই তো সেসব দেশের আদর্শ। বঙ্গবন্ধু এরকম এই জীবন যুদ্ধের মোকাবেলায় জনগণের প্রতিরোধ ক্ষমতা ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞাই শেষ কথা মনে করেছেন যা হলো আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন। তিনি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, সম্পদ ও প্রযুক্তিবিদ্যায় অংশীদারিত্ব চেয়েছেন কিন্তু বাংলাদেশের মতো উদীয়মান দেশগুলোর নিজেদের কার্যক্ষমতার প্রতি আস্থা রাখার কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন। শেখ হাসিনার আদর্শ চেতনার ভিত কি সেটাই নয়?

আমরা সবাই জানি, জন্মলগ্ন থেকেই বাংলাদেশ ইতিহাসের কতগুলো নির্মম বাঁক-প্রতিকূলতায় তার সময় অতিক্রম করেছে। দেশ স্বাধীনের পরে ’৭৫ সালের নির্মম হত্যাকা-ের মধ্যকালে বঙ্গবন্ধু সময় পেয়েছিলেন মাত্র ৪৩ মাস। নবগঠিত দেশের নতুন সরকার একটি মেয়াদও ততদিনে শেষ করতে পারেনি। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা হোঁচট খেল ইতিহাসের এক কদর্য কালিমায়। জনগণের যে সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি ’৭১ সালে যুদ্ধ করেছে সেই শক্তি অপনোদনের চক্রান্তে সুপ্ত হলো সময়ের অবিচারে। এই দেশ আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি-না এই নিয়ে দুনিয়াব্যাপী যত আলোচনা হয়েছে সে সবের অযুত প্রমাণ এখনও পাওয়া যায় যা অন্য কোন দেশের ইতিহাসে বিরল। কিন্তু ওই যে ভাষণের শুরুতেই বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘একটি স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে মুক্ত ও সম্মানজনক জীবন যাপনের অধিকারের জন্য বাঙালী জাতি বহু শতাব্দী ধরে সংগ্রাম চালিয়ে এসেছে’Ñ ফলে সেই সংগ্রাম বাংলাদেশের মানুষকে অব্যাহত রাখতেই হলো। আবার সেই সামরিক শাসন, অপশক্তির প্রকাশ্য বিচরণ ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়ে এই দেশের সংগ্রামের ইতিহাস ঘুরিয়ে দেয়ার চেষ্টা শুরু হলো।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। যে বাঙালী জাতি কলঙ্কমোচনের দায় মাথায় নিয়ে সময় পার করছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার ও মুক্তিযুদ্ধ সময়কালে সংঘটিত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বিচারের মাধ্যমে তার কলঙ্কমোচনের শুরু হলো। পাশাপাশি দেশের অগ্রযাত্রার সংগ্রাম। শেখ হাসিনা তাঁর জীবন দর্শনে যুক্ত করেছেন এই সংগ্রাম যে কারণে এই অবিচল সংগ্রামী মানুষকেও হত্যার চেষ্টা করেছে সেই একই অপশক্তি যারা বঙ্গবন্ধুকে তাদের প্রধান শত্রু হিসেবে বিবেচনা করত।

গত এক দশকে বাংলাদেশের যেসব ক্ষেত্রে উন্নয়ন অগ্রগতি ঘটেছে বৈশ্বিক বিবেচনায় সেসবের সূচক উর্ধমুখী। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন ছাড়াও শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অপরাপর সামাজিক খাতগুলোতে বাংলাদেশের উন্নতি প্রণিধানযোগ্য মনে করেন বরেণ্য অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনও। ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের আহ্বানে তথ্যপ্রযুক্তিতে তরুণ সমাজের ব্যাপক অংশগ্রহণের ফলে বাংলাদেশ উন্নতিসীমার একটি আধুনিক সূচক তৈরি করতে পেরেছে যা এখন অন্য অনেক দেশের জন্য অনুকরণীয়। বাংলাদেশ এখন বঙ্গবন্ধুর উল্লিখিত ‘সম্মানজনক জীবন যাপনের অধিকার’ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে।

রাজনীতির কূটচালে আর যাই-ই হোক বাংলাদেশকে তার সম্মানের এই উচ্চ অবস্থান থেকে এখন কেউ আর টেনে নামাতে পারবে না এই বিশ্বাস শেখ হাসিনার মতো বাংলাদেশের মানুষও সমানভাবে বিশ্বাস করে। এই দেশের মানুষ এখন এক নতুন ভাবাদর্শের সন্ধান পেয়েছে শেখ হাসিনার কাছেÑ তা হলো, মানবিক বাংলাদেশ গঠন যে বাংলাদেশ চিরকাল সম্মানজনক অবস্থানে থাকবে শান্তি ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায়। কারণ, এই দেশের মানুষের এই দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ আকাক্সক্ষার মূলে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর একই ভাষণের উক্তিÑ ‘আমি জানি আমাদের এ প্রতিজ্ঞা গ্রহণের মধ্যে আমাদের লাখো লাখো শহীদের বিদেহি আত্মার স্মৃতি নিহিত রয়েছে’ তার মধ্যে, আর সে হলো সকল উন্নয়ন চেতনায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগী বাঙালীর কথা মনে রাখা। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের চেতনাই বাংলাদেশের উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি যা শেখ হাসিনা শক্তভাবে ধরে রেখেছেন ও এদেশের মানুষকে এই একটি চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাবার সাহস যোগাচ্ছেন।

সেই সংগঠিত মানবিক বাংলাদেশের শান্তিপূর্ণ নীতির নির্দেশনাও বঙ্গবন্ধু তাঁর সেই ভাষণে দিয়ে রেখেছিলেন, যা এখনও বাস্তব ও আমাদের শক্তি যোগায়Ñ ‘শান্তির প্রতি যে আমাদের পূর্ণ অনুগত্য তা এই উপলব্ধি থেকে জন্মেছে যে, একমাত্র শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই আমরা আমাদের কষ্টার্জিত জাতীয় স্বাধীনতার ফল আস্বাদন করতে পারব এবং ক্ষুধা, দারিদ্র্য, রোগশোক, শিক্ষা ও বেকারত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য আমাদের সকল সম্পদ ও শক্তি নিয়োগ করতে সক্ষম হব।’

ফলে শেখ হাসিনার দর্শন চিন্তায় ও তাঁর নেতৃত্ব সক্ষমতায় আজ মানবিক বাংলাদেশের যে উত্তরণ ঘটেছে তা সমুন্নত রাখা জরুরী। বাংলাদেশের সংগ্রামী মানুষের জন্য কষ্টকর এই যে, দুর্ভাগ্য তাদের পিছু ছাড়ে না, কিন্তু এখন যে সুযোগ এসেছে তার সঠিক অনুসরণ হয়তো এই সংগ্রামের পথযাত্রায় ইতিহাসকে নতুন নির্মাণের বাঁকে মহাকাল নিজেই টেনে নেবে।

লেখক : পরিচালক, আমাদের গ্রাম উন্নয়নের জন্য তথ্য-প্রযুক্তি প্রকল্প

rezasalimag@gmail.com