২২ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

একটি ভাল নির্বাচনই প্রত্যাশা

  • অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন কেমন হলো এমন প্রশ্নের উত্তর সর্বশেষ প্রার্থিতা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত এখনও পুরোপুরি কিছুই বলা যাচ্ছে না। তবে আমাদের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলই জোটের সঙ্গে যুক্ত। এমন অবস্থায় সবাই একটি ম্যাজিক নম্বর খুঁজছেন। ম্যাজিক নম্বরটি হচ্ছে ১৫১। অর্থাৎ রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে হলে ১৫১টি আসন লাগবে। কাজেই ১৫১টি আসন পাওয়ার জন্য, যেখানে যার দ্বারা জয় আসবে, সেখানে তাদেরকেই মনোনয়ন দিবে রাজনৈতিক দলগুলো। প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে এটিই মূল বিবেচ্য বিষয়। যুক্তরাজ্য ও ভারতসহ বিশ্বের যেখানেই পুরনো সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা চালু রয়েছে, সেখানে একটি নির্বাচন থেকে আর একটি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রার্থিতার খুব বেশি পরিবর্তন হয় না। ২০ শতাংশের বেশি নতুন প্রার্থী দেখা যায় না। একই সঙ্গে প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে বংশ পরম্পরা লক্ষণীয়। সংসদীয় রাজনীতিতে পারিবারিক ঐতিহ্য, রাজনীতিতে অবদান রয়েছে কিংবা রাজনীতি করে আসছেন সেই পরিবার থেকে বেশি লোকই ফের রাজনীতিতে আসেন। তবে কোন নির্বাচনে ২০ শতাংশের বেশি নতুন প্রার্থী আসে না। অনেকের দাদা এমপি, কিংবা বাবা মন্ত্রী ছিলেন। অর্থাৎ বংশানুক্রম ধারা চলছে। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে, আওয়ামী লীগের ২৩০ জনের মধ্যে প্রায় ৪৫ জন নতুন প্রার্থী। আমি মনে করি, সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা চর্চার ক্ষেত্রে আমাদের দেশে নতুন প্রার্থীর বদলের এই হার ইতিবাচক। এবার নির্বাচনে যেমন বিতর্কিত প্রার্থী রয়েছেন, তেমনি দণ্ডপ্রাপ্তরাও রয়েছেন। তাদের নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। কিন্তু যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্তদের আত্মীয়-স্বজনরাও নির্বাচন করছেন, তাদের নিয়ে তেমন আলোচনা হয় না। মানি লন্ডারিং এবং বর্বর গ্রেনেড হামলা চালিয়ে মানুষ খুন করার দায়ে উচ্চ আদালতের দ-প্রাপ্ত ব্যক্তি নির্বাচনের নমিনেশন দিচ্ছেন। কাজেই নমিনেশন কে পেল সেটা আলোচনা করার চেয়ে বরং হাইকোর্ট কর্তৃক দ-প্রাপ্ত পলাতক আসামি কিভাবে প্রার্থী নির্ধারণ করেন? সেটা আগে ভাবা দরকার। যার বিরুদ্ধে অপরাধ কেবল নি¤œ আদালতে নয়, উচ্চ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে, তার বিষয়টি সবার আগে আলোচনা হওয়া দরকার। কিছু লোক হয়ত নির্বাচনে আসছে, তাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। দ-িত লোককে যখন নমিনেশন দিবেন তখন দ-িত লোকও নমিনেশন পাবেন এটাই স্বাভাবিক। অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়ার লক্ষ্য হলো রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়া। বেশির ভাগ সুশীল সমাজ এবং জনগণ আওয়ামী লীগ থেকে অনেক প্রত্যাশা করি। কারণ, আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে। কাজেই আওয়ামী লীগে সব ভাল ভাল লোক থাকবেন। আওয়ামী লীগের লোকজন মূল্যবোধ, বাঙালী সংস্কৃতি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং গণতন্ত্রের কথা বলবেন, এমনটি আমাদের প্রত্যাশা। শহীদ মিনার কিংবা বাংলা একাডেমিতে যে আলোচনা সভা হয়, সেখানে আওয়ামী লীগের লোকেরা অবস্থান নিবেন। এদিকে যারা রাজাকার এবং স্বাধীনতাবিরোধী, তারাই রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকবেন। আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকলেও সমালোচনার অভাব থাকে না। সুশীল সমাজের অনেকের বক্তব্য অনুযায়ী আওয়ামী লীগ ‘নিট এ্যান্ড ক্লিন’ হয়ে শহীদ মিনারে থাকুক আর রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকুক স্বাধীনতা বিরোধীরা। এবারের নির্বাচনে সর্বোচ্চ সংখ্যক রাজনৈতিক দল, জোট, প্রার্থী অংশগ্রহণ করছে। নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতায়ন নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা করছি। কিন্তু আমি মনে করি, নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের দিন সকাল বা নির্বাচন শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত অনেক ক্ষমতাবান। নির্বাচন কমিশন যা কিছু করবে, যা কথাবার্তা বলবে, কিংবা করতে পারত, করণীয় ইত্যাদি আমরা টকশোতে আলোচনা করতে পারি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, নির্বাচন যখন শুরু হয়, তখন পুরোটাই নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর। যারা নির্বাচনে অংশ নেয় অর্থাৎ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর। তারা যদি শেষপর্যন্ত নির্বাচনী মাঠে থাকে এবং অবস্থানটি যদি শক্তিশালী হয়, তাহলে ভাল নির্বাচন হবে। যখন একটি পক্ষ মাঠে থাকে না, চলে যায় তখন অন্যপক্ষ কেন্দ্র দখলে নিয়ে নেয়, ঠিক তখন স্বার্থান্বেষী মহল নির্বাচনের মধ্যে প্রবেশ করে যড়ষন্ত্র শুরু করে। সংবিধানে ১২৬ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের সকল নির্বাহী ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের হাতে চলে গেছে। যদি নির্বাচন কমিশন ক্ষমতার ব্যবহার না করতে পারে, তাহলে তাদের ব্যর্থতা। নির্বাচন কমিশনকে অনেক বিষয়ই সামলাতে হবে। বিনা কারণে কেউ যেন গ্রেফতার না হয় তা দেখতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে সতর্কভাবে দায়িত্ব পালন করা দরকার। নির্বাচন কমিশনের অনেকে আলাদা-আলাদাভাবে কথা বলেন, এতে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়। অনেক সময় যেটা হয় সাংবাদিকরা নির্বাচন কমিশনের কাউকে একটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করলেন আবার অন্য জায়গায় ঠিক একই বিষয় সম্পর্কে অন্য কাউকে জিজ্ঞাসা করলেন। পরে মিডিয়া দেখাল উভয়ের কথার মাঝে গরমিল রয়েছে। তখন দ্বিমত সৃষ্টি বিষয়টি প্রচারণায় আসবে এবং এতে কমিশনের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে। কাজেই কথা বলার সময় অনেক ভেবে কথা বলতে হবে। আমি মনে করি, নির্বাচন কমিশনারগণ কোন কথাই বলবেন না। তারা গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার জন্য মুখপাত্র তৈরি করে দিবেন। তিনি কমিশনের পক্ষে কথা বলবেন। সেটা এখন সচিব করছেন। মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলার সময় কুশলী হতে হবে। কৌশলের গুরুত্ব যদি নাই থাকত, তাহলে মিডিয়া নিয়ে এত পড়াশোনার দরকার হতো না। মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলতে পারেন, এমন পারদর্শী লোক দিয়ে কথা বলাতে হবে। কারণ মিডিয়ারও বিভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে। আমাদের মিডিয়া সব সময় ভাল উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করে, এমন নয়। তাদেরও নানা এজেন্ডা থাকে। কিছু মিডিয়া এমনভাবে কথা বলে, যাতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে। এবার নির্বাচনে যারা পর্যবেক্ষক, তারা কেবলই পর্যবেক্ষকই হবেন, এর বাইরে কিছু নয়- এই অর্থে কথা বলতে গিয়ে সচিবের হয়তো শব্দচয়নে ভুল ছিল। তিনি বলতে চেয়েছেন নির্বাচনের যেসব ঘটনা ঘটবে, পর্যবেক্ষকরা সেগুলোতে কোনভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। নির্বাচনে মারামারি হলেও তারা কি লাঠি নিয়ে গিয়ে মারামারি ঠেকাতে যাবে না। কোন পক্ষের সঙ্গে মারামারি কিংবা বিতর্কে জড়াবেন না। কোন উস্কানিমূলক কথাবার্তা বলতে পারবেন না। এসব কথা বলতে গিয়ে তিনি ভুল শব্দ ব্যবহার করেছেন। তার শব্দচয়নে ভুল ছিল। এমনও হতে পারে কথা বলার সময় পাশ থেকে সাংবাদিক প্রশ্ন করছেন, তাহলে কী পর্যবেক্ষকরা মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকবেন। তখন হয়তো তিনি বেশ জোরে সোরে ‘হ্যাঁ, মূর্তির মতোই দাঁড়িয়ে থাকবেন’ বলেছেন। কাজেই নির্বাচন কমিশনের একজনকে কথা বলতে হবে। আমার প্রত্যাশা এবারের নির্বাচন অবশ্যই একটি ভাল, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে। নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে নানা কথাবার্তা, আলোচনা-সমালোচনা, ত্রুটিবিচ্যুতি আমরা মতামত ব্যক্ত করব। বিষয়গুলো নিয়ে আমরা আলোচনা করতেই থাকব। আর এর মধ্য দিয়ে একটি ভাল নির্বাচন হয়ে যাবে এবং এর মধ্য দিয়েই নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তি রক্ষা হবে।

লেখক : উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়