১৮ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জিয়ার পর কামাল এখন জামায়াত পুনর্বাসনে সচেষ্ট

  • জাফর ওয়াজেদ

নির্বাচনের হাওয়া বইছে উত্তুরে বাতাসে শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে একাকার হয়ে। একটু উষ্ণতার জন্য শীতার্ত মানুষের আকুপাকু শুরু হওয়ার এই সময়ে ভোটের ধ্বনিতে প্রকম্পিত আকাশ-বাতাস। একটি ভোটের দিনের প্রতীক্ষায় সারাদেশের মানুষ আজ বেশ প্রণোচ্ছ্বল হয়ে উঠছে। ভোটার জানে তার ভোটের গুরুত্ব কী, যেমন জানে প্রার্থীও। ভোটারের হাতে হাত মেলানোর মধ্যে প্রার্থীর প্রাণে জাগে আশাবাদ। নিশ্চিত বিজয়ের আশায় আশান্বিত হয়ে ওঠার বুঝি এটাই মোক্ষম সময়। দেশজুড়ে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়ে গেছে। হাতে সময় আছে উনিশ দিন। তারপরই ভোট। যে দিনটির জন্য সারাদেশের মানুষ, সকল রাজনৈতিক দল উদগ্রীব। ভোটারকে বেছে নিতে হবে তার যোগ্যতম প্রার্থীকে। এই বাছাইয়ের বিষয়টি হতে পারে ব্যক্তিগত, হতে পারে সমষ্টিগত বা দলগত। দলীয় অনুসারীরা তাদের দলের প্রার্থীর পক্ষে ভোট যেমন দিয়ে থাকে, তেমনি প্রচার-প্রচারণায় অংশ নেয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আর যা-ই হোক ভোটার তালিকায় নেই ভুয়া ভোটার। গত দুটি নির্বাচন ছাড়া অতীতে ভোটার তালিকায় ছিল ভুয়া ভোটারের ছড়াছড়ি। কিন্তু ভোটার আইডি কার্ড চালুর পর ভুয়াদের অস্তিত্ব আর খুঁজে পাওয়া যায় না। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনের আগে কোটি খানেক ভুয়া ভোটার বানিয়েছিল বিএনপি-জামায়াত জোট। তত্ত্বাবধায়ক সরকার তা চিহ্নিত করে বাতিল করেছিল। চালু করেছিল ভোটার আইডি কার্ড। যে কার্ড আজ দেশবাসীর জীবন যাপনের অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে।

দেশজুড়ে ভোটের মাতম। সর্বত্র প্রার্থীর জন্য জয়ধ্বনি হচ্ছে উচ্চারিত। ভোটযুদ্ধে কোন প্রার্থী কার চেয়ে এগিয়ে, কোন কারণে কে পিছিয়ে-এসব নিয়ে কর্মী-সমর্থক-ভোটারদের মাঝে চলছে আলোচনা-সমালোচনা, বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। কোথাও কোথাও বাহাস। উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ও হয়ে যেতে পারে কোথাও কোথাও। জনসংযোগ চলছে দেদারসে। পথসভার আয়োজন চিত্র সর্বত্র।

সবচেয়ে সুখপ্রদ যে, নির্বাচনে সব দলই অংশ নিচ্ছে। বিশেষ করে নিবন্ধিত সব দলই প্রার্থী দিয়েছে। আর অনিবন্ধিত দলগুলো বিভিন্ন ফ্রন্ট বা জোটে অন্তর্ভুক্ত হয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন কমিশনে গিয়ে আলোচনা, দেনদরবার করছে। সবারই প্রত্যাশা, সবার অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান। জনগণকে তাদের শাসক নির্বাচনের অধিকার প্রদান এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করাই হলো ভোটের কাজ। নির্বাচন কোন খেলাধুলা নয়, ফাঁকা মাঠে গোল দেয়াও নয়। ফুটবল বা ক্রিকেট খেলার নাম রাজনীতি নয়। রাজনীতি হচ্ছে নীতির খেলা। এ খেলায় বিদ্যমান দলগুলো প্রতিপক্ষকে পরাজিত করবে জনগণ ও দেশের কল্যাণার্থে প্রদত্ত তাদের নীতির উৎকর্ষ দ্বারা। গায়ের জোর, ভোট চুরি, টাকার খেলা, গ্রেফতার, ভয়-ভীতি প্রদর্শন, বিদেশীদের কাছে নালিশ বা সমর্থন চাওয়া অত্যন্ত অশোভনীয় ও লজ্জ্বাজনক। কিন্তু এসব এদেশবাসীকে দেখতে হয়েছে। সহ্যও করতে হয়েছে। তারপরও জনগণ চেয়ে আসছে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। অর্থাৎ সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। এবার সব দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণ দেশবাসীর জন্য স্বস্তিকর বৈকি। বিএনপি-জামায়াত জোট এবং তাদের উদ্ধারকারী ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে অংশ নেয়ার মাধ্যমে দলের অস্তিত্ব রক্ষা করতে যাচ্ছে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি যে করুণ দশায় পতিত হয়েছে, তা থেকে উদ্ধার শুধু নয়, এবার অংশ না নিলে বিএনপির নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে। আর তাই নির্বাচনে অংশ নেয়া ছাড়া তাদের আর কোন বিকল্প নেই। আন্দোলন করার শক্তি-সামর্থ্য হারানো বিএনপি এখন ডক্টর কামাল হোসেনকে শিখন্ডি বানিয়ে নির্বাচন করতে যাচ্ছে। আর অনিবন্ধিত যুদ্ধাপরাধীদের দল কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টের অধীনে একই প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচনে ২৪ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। কামাল হোসেন এখন জামায়াতীদেরও নেতা হিসেবে তাদের জন্য শুধু ভোট চাওয়া নয়, বিজয়ী হবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। জামায়াতীরা কামাল হোসেনের নেতৃত্ব মেনেই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। আর কামালকে তা নতমস্তকে অনুমোদন দিতে হয়েছে। কারণ তারেকের নির্দেশের বাইরে যাওয়ার উপায় নেই কামাল হোসেনের। সিরাজদৌলা নাটকের সেই বিখ্যাত সংলাপ ‘উপায় নাই গোলাম হোসেন’ অবস্থা আজ কামাল হোসেনের। তারেকের মনোনয়ন পাওয়া জামায়াতীদের নেতা কামাল হোসেন বিষয়টিকে আড়াল করার জন্য দেশবাসীর প্রতি ১৯৭১ সালের মতো ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্ত্রীর প্রাক্কালে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন আমাদের দেশ ও জাতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্যই এবারের ভোট গুরুত্ব বহন করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষায় ‘বিএনপি-জামায়াতের হিংস্র থাবা থেকে দেশ বাঁচাতে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে জনগণকে, কামাল হোসেনের কাছে মুক্তিযুদ্ধ কোন্ পর্যায়ের তা স্পষ্ট হয় বিএনপি নেতা নজরুল ইসলামের জামায়াতকে ‘মুক্তিযোদ্ধার সনদ’ প্রদানের মধ্যে। বলেছেন তিনি, ‘জামায়াতেও মুক্তিযোদ্ধা রয়েছে।’ বিস্ময়কর হলেও কামাল হোসেনের কাছে তা সত্য বলে প্রতীয়মান হতেই পারে। অথচ দেশবাসী জানে, এবারের নির্বাচন দেশ রক্ষার নির্বাচন। পঁচাত্তর পরবর্তীর মতো দেশ আবার পাকিস্তানী ভাবধারায় ফিরে যাবে, জামায়াতী-মওদুদীবাদী শাসনব্যবস্থা চালু হবে নাকি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ ও গর্বিত বাংলাদেশ গঠন হবে কিনা- এই দুটি ধারা কাজ করছে ভোটকে কেন্দ্র করে। কামাল হোসেন মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে চাইছেন জামায়াতকে আড়াল করার জন্য। কিন্তু তার নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট তাদের সহযোগী বিএনপির আত্মীয়সম যুদ্ধাপরাধীর দল জামায়াতকে সঙ্গে রেখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলা প্রহসন বৈকি। বিএনপি যুদ্ধাপরাধীর পক্ষে এবং তাদের রক্ষায় অতীতে হরতাল, অবরোধ এবং জ্বালাও-পোড়াও চালিয়েছিল। এমনকি জামায়াতকে বর্জনের জন্য বিভিন্ন দল ও পেশাজীবীর দাবি সত্ত্বেও তা করেনি। কামাল হোসেন ২৪টি আসনে তাদের মনোনয়ন প্রাপ্তির বিরুদ্ধে কোন অবস্থান নেননি। সামান্য ‘টু’ শব্দটিও উচ্চারণ করেননি। আইনের শাসনে বিশ্বাসী কামাল হোসেনের অবশ্যই জানা যে, জামায়াত দেশের আইনকানুনে বিশ্বাসী নয় বলে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত হতে পারেনি। বিএনপি সেই জামায়াত নেতাদের কামাল হোসেনের সম্মতিতেই নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে যেমন তেমনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও। স্বতন্ত্র বা জোটের নেতা হয়ে যুদ্ধাপরাধী ও জঙ্গীবাদের প্রবর্তক দলের লোকজন প্রার্থী হওয়া মানেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ দেশের বিরোধীদের রাজনীতিতে অবস্থান ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। বিএনপির হৃৎপিন্ড জামায়াত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকাতে বিদেশে লবিষ্ট নিয়োগ করে রেখেছে। এরাই শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাতের জন্য বিদেশে নানা ষড়যন্ত্র চালিয়ে আসছে তারেক রহমানের সঙ্গে যূথবদ্ধ এবং এককভাবেও। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার এবং আইনগত ত্রুটির প্রশ্ন তুলে লবিংয়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গত কয়েক বছরে লবিষ্ট নিয়োগ করেছিল ‘অর্গানাইজেশন ফর পীস এ্যান্ড জাস্টিস’ নামের একটি সংগঠন। এই সংগঠন কর্পোরেশন হিসেবে নিউইয়র্কে রেজিস্ট্রিকৃত। এই সংস্থাকে নিয়োগ সম্পর্কিত নথিতে বলা আছে, এই সংস্থার পরিচালনায় জামায়াতের প্রতি সহানুভূতিশীল ২০১৬ সালে অর্গানাইজেশন ফর পীস এ্যান্ড জাস্টিসের পক্ষে ক্যাসিডি এ্যান্ড এ্যাসোসিয়েটস নামের একটি বৃহৎ লবিং প্রতিষ্ঠান মৌখিক সমঝোতা করে ক্রোক রুম এ্যাডভাইজার্স নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। অবশ্য বিধান রয়েছে যে, অন্য দেশের কোন সরকার বা রাজনৈতিক দলের এজেন্ট হিসেবে কাজ করলে লবিস্ট প্রতিষ্ঠানকে এ সংক্রান্ত সব তথ্যের বিবরণ জমা দেয়ার । কিন্তু এ বিধান থাকলেও অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সেই বাধ্যবাধকতা নেই। জামায়াত সেই সুযোগ গ্রহণের জন্যই বেনামে লবিস্ট নিয়োগ করেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে জনমত তৈরি ও রাজনীতিকদের প্রভাবিত করার লক্ষ্যেই পেশাদার লবিস্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগিয়েছে। সেই লবিস্টকে তারা এখনও বাতিল করেনি। কামাল হোসেনের এসব অজানা নয়। কারণ তার জামাতা বার্গম্যানের জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে প্রচার চালিয়ে আদালত অবমাননার কাজও করেছিল।

পঁচাত্তর পরবর্তী ক্ষমতা দখলকারী সামরিক জান্তা জিয়া জামায়াতকে পুনর্বাসন করেন এবং রাজনীতি করার অধিকার প্রদান করেন। সে অর্থে তিনি দলটির নব্য জনকও । আর সে সুবাদে খালেদা-তারেক জামায়াতকে পরিবারের সদস্য হিসেবে মর্যাদা দিয়ে জামায়াতী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে আসছে। জামায়াতের বাহুলগ্ন হবার কারণে বিএনপির নিজস্ব রাজনীতি অনেক আগেই বিলীন হয়ে গেছে। তারা জামায়াতের রাজনীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে আসছে। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি এবং বিরোিধতা সত্ত্বেও ঐক্যফ্রন্টও বিএনপি-জামায়াতীদের পুনর্বাসনে ২৪ প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে এবং তাদের হাতে ধানের শীষ প্রতীক তুলে দিয়েছে। যে প্রতীক কামাল হোসেন গংয়েরও এখন। জিয়ার পর কামাল এখন জামায়াত রক্ষা ও পুনর্বাসনে সচেষ্ট। কামাল হোসেন এতদিনে নিশ্চয় জেনেছেন ক’দিন আগে মার্কিন কংগ্রেস জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে বিল পেশ করেছে। জামায়াত-শিবিরকে দেশের স্থিতিশীলতা ও ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের জন্য হুমকি বলে বিলে বলা হয়েছে। মার্কিন কংগ্রেস নিশ্চয় অবহিত, তাদের পছন্দের আইনজীবী কামাল হোসেন এখন জামায়াত রক্ষায় সবকিছু বাজি রেখেছেন। এই বিল পাঠের পরও কামাল হোসেন বিএনপি-জামায়াতের আদলে নিজেকে বেধে রেখে কী ফায়দা লাভ করবেন, এমন প্রশ্ন আসবেই। কিন্তু উত্তর তো জানা, শেখ হাসিনার বিনাশে তিনি যা পারেন, তাই করবেন। ভোটের হাওয়ায় নতুন হাওয়াভবন তৈরি করার জন্য কামাল হোসেন তারেক রহমানের প্রতি যে অনুগত্য দেখাচ্ছেন আজ, তা হাওয়াতেই মিলিয়ে যাবে ভোটের পর হতেই।

নির্বাচিত সংবাদ