১৯ জানুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আবারও জয় বাংলা ধর

  • অধ্যাপক মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)

১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে আমরা একটি স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জন করলেও সত্যিকারের মুক্ত চিন্তার অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। বরং ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট সপরিবারে জাতির পিতার হত্যাকা-ের মধ্য দিয়ে ঘড়ির কাঁটাকে উল্টে দেয়া হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার শীর্ষে ছিল বি-মুক্তিযুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া। রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী। বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে বাঙালী জাতিকে গেলানো হয়েছে চকলেট কোটিংয়ে জামায়াতের পচা পেস্ট্রি। আর এই অন্তহীন পৃষ্ঠপোষকতায় অর্জিত যে বিপুল বৈভব, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি বিনা বাধায় তা ব্যবহার করেছে এবং করছে আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করার কাজে। এত কিছুর পরও নেভেনি স্বাধীনতার ‘শিখা চিরন্তন’। বাংলাদেশে স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তির রেজোরেকশন হয়েছে। ক্ষমতায় আবারও ফিরে এসেছেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের উত্তরসূরিরা। আর এই ফলাফলটাও স্পষ্ট। গত দশটি বছরে এদেশে উন্নয়নের ইনডিকেটারগুলো শুধু ছুটেনি, ছুটেছে উর্ধশ্বাসে। একই অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছিল স্বাধীনতার পরপরই বঙ্গবন্ধু যখন ক্ষমতায়। বঙ্গবন্ধুর স্বল্পমেয়াদী সরকারের সময়েই বাংলাদেশ অর্জন করেছিল স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা আর প্রথমবারের মতো দেশের বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি ছাড়িয়ে গিয়েছিল সাত শতাংশ আবারও অর্জন করতে আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে শেখ হাসিনার ক্ষমতায় আসা পর্যন্ত।

স্বাধীনতার বিপক্ষীয়, প্রতিক্রিয়াশীল, মৌলবাদী শক্তি যখই সময় পেয়েছে ঝাঁপিয়ে পড়েছে স্বাধীনতার সপক্ষের লোকগুলোর ওপর। তাই প্রতিবারই যখন দেশে জাতীয় নির্বাচন এসেছে কিংবা চক্রান্তের চোরাগলিতে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি-জামায়াত চক্র তখনই আমরা দেখেছি মানুষ কতটা বীভৎস হয়ে উঠতে পারে। তারা ধরেই নিয়েছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিঃশর্ত সমর্থন বরাবরই পেয়ে এসেছে স্বাধীনতার ঘরানার লোকগুলো। আর তাই আওয়ামী লীগ আর বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বরাবরই তাদের নির্বিচার নিপীড়নের শিকার হয়েছে। সে কারণেই জাতীয় নির্বাচনের আগে-পরে আমরা জ্বলতে দেখেছি অসংখ্য মালোপাড়া, শুনেছি অনেক পূর্ণিমার কান্না।

স্বাধীনতাবিরোধী আর প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি জানে আগামী ত্রিশ ডিসেম্বর তাদের বাঁচা-মরার দিন। তথাকথিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্রের বক্তব্যেও সম্প্রতি শোনা গেছে এই বক্তব্যের অনুরণন। আগামী ত্রিশ ডিসেম্বর তাই শুধু আরেকটি জাতীয় নির্বাচনের দিন নয়, এদিন বাংলাদেশ সিদ্ধান্ত নেবে, ‘এই বাংলাদেশ ওদের না আমাদের’! বাংলাদেশের বিজয় রথকে থামিয়ে দেয়ার এটাই ওদের শেষ সুযোগ। হয় এই বার, না হয় সম্ভবত কখনই নয়।

সঙ্গত কারণেই আগামী নির্বাচন নিয়ে আমাদের মাঝে শঙ্কা অনেক। এবার যে খালি চক্রান্ত হচ্ছে তা-ই নয়, এবারের চক্রান্ত বহুমাত্রিক। এবার তারা উদ্যোগ নিয়েছে আমাদের বিভ্রান্ত করার। আমাদের ভিতর ঘাপটি মেরে থাকা লোকগুলো একে একে স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করছে। এমন অনেক লোককেও আমরা বিপরীত শিবিরে দেখছি যাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা প্রশ্নাতীত। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর যারা প্রতিবাদী হয়েছিলেন তাদের কেউ-কেউ যোগ দিয়েছেন বিভ্রান্তির এই মিছিলে। মুজিব কোট গায়ে তারা স্লোগান ধরছেন, ‘জয় বাংলা, জয় ধানের শীষ’। আর বঙ্গীয় ভূখন্ডের বীর খেতাবধারী একজন, যার শপথ ছিল বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ের বিচার না হওয়া পর্যন্ত মাংস ছুবেন না, তিনি এখন উঠে-পড়ে লেগেছের বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকারীদের হাড়-মাংস চিবিয়ে খেতে। বিভ্রান্তির কাতারে আছেন জাতির পতাকার প্রথম উত্তোলনকারীও। বঙ্গবন্ধুর সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ আর দেশকে অস্থিতিশীল করায় মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বিভ্রান্তির এই ফেরিওয়ালা আর তার সহযোগীদের ভূমিকা ছিল অনেকখানি। তার সেদিনকার অনেক সহযোগীই আজ ভুল বুঝে সত্য আর সঠিকের পথের অভিযাত্রী। কিন্তু ভ্রম সংশোধন হয়নি তার। ১৯৮৮ সালে গৃহপালিত বিরোধী দলের নেতা হয়ে চেষ্টা করেছিলেন স্বৈরাচারকে বৈধতা দেয়ার আর আজ বিএনপি-জামায়াতের আঁতাতে সরাসরি যোগ দিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করে পিছনে টেনে ধরার চূড়ান্ত লড়াইয়ে শামিল হয়েছেন।

যেমনটা বলছিলাম, এবারের ষড়যন্ত্র বহুমাত্রিক। যে কারণে পিতার খুনীর সঙ্গে আঁতাত করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রীধারীও। নামের শেষে তার ডিগ্রীর বহর দেখে বিশ্বাস করতে চাইতাম বিচার-বিবেচনায় তিনি আমাদের অগ্রজ। তিনি আমার সেই ভুল ভেঙ্গে দিয়েছেন। অথচ উল্টোদিকে দেখুন। চিহ্নিত-দন্ডি যুদ্ধাপরাধীদের সন্তানরা কিন্তু ঠিকই একাট্টা। ওদের নিজেদের প্রতি আনুগত্যে ঘাটতি নেই এতটুকুও। তবে এতকিছুর মাঝেও স্বস্তি অনেক। সন্তুষ্টির সঙ্গে লক্ষ্য করছি ঘরের বেশকিছু ছেলে ঘরে ফিরে গেছেন। একাত্তরের নয়টি মাসে যিনি রেডিও পাকিস্তান চট্টগ্রাম থেকে তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের তার ভাষায় পাকিস্তানের পতাকাতলে ফিরে আসার দাওয়াত দিতেন, পরবর্তীতে প্রগতিশীলতার এই নেতা ফিরে গেছেন নিজ খোয়াড়ে। মুখোশ খুলেছেন একজন প্রবীণ চিকিৎসকও। একসময় আইয়ুব খানের দেয়া স্কলারশিপে ইংল্যান্ডে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন। স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধুর দেয়া জমিতে, বঙ্গবন্ধুর দেয়া নামে প্রতিষ্ঠান গড়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন নিজ সাম্্রাজ্য। তারপরও ঢাকার পার্শ্ববর্তী সমৃদ্ধ জনপদটি তিনিই সবচাইতে বড় ভূমিদস্যু। তারপরও আরো চাই। যেমন চাওয়ার শেষ নেই প্রবীণ একজন আইনজ্ঞেরও। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপের প্রধান মেজর জেনারেল মিঠ্ঠা খানের ভাষ্যে জানা যায়, পাকিস্তানী স্ত্রীর আত্মীয়তার সূত্র ধরে এই জেনারেলের সহায়তায় তিনি একাত্তরের এপ্রিলের প্রথম দিকে পিআইএ-র কার্গো ফ্লাইটে চেপে পাকিস্তানে পাড়ি জমিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন পুরোটা সময়ে নামজাদা উকিল শ্বশুরের জুনিয়র হিসেবে পাকিস্তানের আইন পেশায় ব্যস্ত ছিলেন। এখন দাবি করেন তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানের প্রণেতা। ভুলেও বলেন না যে তিনি একমাত্র নন, বরং চৌত্রিশ জন সংবিধান প্রণেতার অন্যতম। এর নাম দেশপ্রেম? এর নাম নৈতিকতা?

এদের উদ্দেশ্য কিন্তু পরিষ্কার। এর এবার শুধু জ্বালাও-পোড়াও এর অভিযাত্রায় নামেনি। এরা এবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেই বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টায় মেতেছে। যে কারণে জামায়াত-বিএনপির জনসভায় জয়বাংলার স্লোগান জুতার বদলে হাততালি পাচ্ছে। আমরা বুঝে পাচ্ছি না হাসব না কাঁদব। ওরা কিন্তু শুধুই হাসছে আর ভাসছে সুখ-স্বপ্নে। ত্রিশ তারিখ আমাদের দায়িত্ব ওদের এই হাসিহাসি মুখগুলো পাকাপাকিভাবে গুঁড়িয়ে দেয়া। সত্যি আর মিথ্যা, সাদা আর কালো, আসল আর নকল সবকিছু এখন মিলেমিশে কেমন যেন গুবলেট পাকিয়ে গেছে। আসুন, সত্যিকারের যারা বঙ্গবন্ধুপ্রেমী, স্বাধীনতার সপক্ষীয় শক্তি, হাতে হাত ধরে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চিৎকার করে বলি, ‘আবারও জয় বাংলা স্লোগান ধর’।

লেখক : চিকিৎসক ও গবেষক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়