২২ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অধিকার আদায়ে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ পরিমিতিবোধ

 অধিকার আদায়ে সব  থেকে গুরুত্বপূর্ণ পরিমিতিবোধ
  • রোকেয়া পদক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পিতা-মাতাকে বিশেষ করে তাদের সন্তানদের বেগম রোকেয়ার আদর্শে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে অধিক যত্নবান হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, আমরা চাই আমাদের নারীরা সুশিক্ষিত হবে এবং নিজের সন্তানকে উপযুক্ত নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে। জঙ্গীবাদ, সন্ত্রাস এবং মাদক থেকে ছেলেমেয়েরা যেন দূরে থাকে সেজন্য মায়েদের বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। আর নারীদের তাদের অধিকার আদায় করে নিতে হবে; তবে তা করতে গিয়ে যেন পরিবারে কোন অশান্তি না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে রবিবার বেগম রোকেয়া দিবস ও বেগম রোকেয়া পদক-২০১৮ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলে গেছেন, ‘নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার কেন নাহি দিবে অধিকার হে বিধাতা?’ তবে এ কান্না আমরা কাঁদতে চাই না। অধিকার আদায় করে নিতে হয়। অধিকার অর্জন করে নিতে হয়। সঙ্গে সঙ্গে এইটুকু বলব অধিকার আদায় করতে গিয়ে সংসারে যেন ঝামেলা না হয়, অশান্তি না হয়। সেটাও দেখতে হবে। এখানেই সবারই একটা দায়িত্ব থাকবে। পরিবারেরও দায়িত্ব আছে। সমাজের প্রতিও দায়িত্ব রয়েছে। সেই দায়িত্বটা থাকতে হবে। পরিমিতিবোধটা থাকতে হবে। সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ পরিমিতিবোধ, সেটা আমি মনে করি।

প্রধানমন্ত্রী ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কোন দূরত্ব না রেখে বরং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য মায়েদের পরামর্শ দিয়ে বলেন, যাতে করে কোন সমস্যা হলেই ছেলেমেয়েরা তাদের নিজেদের মনের কথা মাকে বলতে পারে। কারণ মা-বাবাই হচ্ছে সন্তানের সব থেকে বড় বন্ধু। কাজেই সেই ধরনের একটা পরিবেশ সৃষ্টির উদ্যোগ মাকেই নিতে হবে। কেউ কাউকে জায়গা দেয় না মন্তব্য করে তিনি বরেন, জায়গা করে দিতে হবে, সুযোগ করে দিতে হবে, আর সুযোগের সদ্ব্যবহারটাও করতে হবে। আজ নারীরা দেশের উন্নয়নে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে সবক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মন্ত্রণালয়ের সচিব নাসিমা বেগম স্বাগত বক্তৃতা করেন। এ বছর নারীর ক্ষমতায়নে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশের বিশিষ্ট ৫ মহিলাকে বেগম রোকেয়া পদক-২০১৮ তে ভূষিত করা হয়। পদকপ্রাপ্তরা হলেনÑ সাবেক প্রতিমন্ত্রী জেবুন্নেসা তালুকদার, কুমিল্লা মহিলা কলেজের সাবেক শিক্ষয়িত্রী অধ্যাপিকা জোহরা আনিস, সুনামগঞ্জের বিশিষ্ট সমাজ ও সাংস্কৃতিক কর্মী শিলা চৌধুরী, বিশিষ্ট লেখিকা এবং সমাজকর্মী রমা চৌধুরী এবং ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার লেখিকা ও সমাজকর্মী রোকেয়া বেগম। এরমধ্যে সাবেক প্রতিমন্ত্রী জেবুন্নেসা তালুকদার অনুষ্ঠানে পদক বিজয়ীদের পক্ষে নিজস্ব অনুভূতি ব্যক্ত করে বক্তৃতা করেন।

প্রধানমন্ত্রী বেগম রোকেয়াকে নারী জাগরণের অগ্রদূত এবং সত্যিকারের প্রগতিশীল ব্যক্তিত্ব আখ্যায়িত করে বলেন, বেগম রোকেয়া আমাদের যে শিক্ষা দিয়ে গেছেন এবং তার যে স্বপ্ন ছিল আজকে কিন্তু পৃথিবী সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশকে এইদিকে আমরা অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছি। তিনি এ সময় নারী জাগরণে বেগম রোকেয়ার একটি বাণী প্রণিধানযোগ্য উল্লেখ করে বলেন, ‘পুরুষের সক্ষমতা লাভের জন্য আমাদের যাহা করিতে হয় তাহাই করিব। যদি এখন স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জন করিলে স্বাধীনতা লাভ হয় তবে তাহাই করিব।’ তিনি বলেন, কাজেই তার এই কথাটা আমাদের মনে রাখতে হবে এবং আজকে যদি আমরা বাংলাদেশের দিকে তাকাই তাহলে আমরা দেখব তার এই আহ্বানটা বৃথা যায়নি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তার মা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের ভূমিকা তুলে ধরে বলেন, আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য আমার বাবা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন সংগ্রাম করেছেন, তেমনি পাশে থেকে তাকে প্রেরণা যুগিয়েছেন আমার মা শেখ ফজিলাতুন্নেছা। মা তার জীবনে যে আত্মত্যাগ করেছেন বড় সন্তান হিসেবে আমি তা জানি। তাই, আজ তার কথা বারবার মনে পড়ছে। আজকে স্বাধীনতা অর্জনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমার মায়ের অবদান রয়েছে। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আব্বাতো বেশির ভাগ সময় জেলেই কাটাতেন। কাজেই আমার মা একদিকে যেমন আমাদের মানুষ করেছেন, আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করে দলের লোকজন কেউ যদি অসুস্থ হতো বা নেতাকর্মীরা যারা জেলে থাকত সে রকম প্রত্যেকটি পরিবারকে তিনি সহযোগিতা করতেন। পাশাপাশি দলকে সংগঠিত করা এবং দলকে নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলা এবং আমার বাবার মামলা-মোকাদ্দমাগুলোর তদারকি করা, তিনি একাধারে সব কাজ করে যেতেন। আমার বাবার রাজনৈতিক জীবনে আমার মা ছিলেন একজন উপযুক্ত সঙ্গী। যিনি সব সময় বাবার পাশে থেকে তাকে প্রেরণা যুগিয়ে গেছেন।’

সংসারের কোন রকম অভাব অনটন কিংবা কোন অসুবিধার কথা জাতির পিতার কাছে মাকে কখনও বলতে শুনিনি উল্লেখ করে আবেগজড়িত কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি জীবনেও শুনিনি আমার মাকে এসব নিয়ে অভিযোগ করতে। উপরন্তু মা সব সময়ই বলতেন তুমি তোমার কাজ করে যাও, ঘর-সংসার নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। এই যে পাশে থেকে প্রেরণা দেয়া যার জন্য আজকে আমরা স্বাধীন জাতি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পেরেছি।

জাতিসংঘের ইউনেস্কোর প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃত বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের প্রাক্কালে তার মায়ের বলিষ্ঠ ভূমিকার উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এই ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে কতজন কত রকম কথা বলেছে (পরামর্শ দিয়েছে)। আমার মা’ বঙ্গবন্ধুকে শুধু বলেছেন, তোমার মনে যেটা আছে তুমি সেটাই বলবা, কারও কথা শোনার দরকার নাই।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইউনেস্কো ৭ মার্চের ভাষণকে সারাবিশ্বের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার সংবাদটি যখন পেলাম তখন কেবলই আমার মায়ের কথাই বার বার মনে পড়েছে। কারণ, সবসময় দেখেছি মায়ের সেই দৃঢ় মনোভাব বাংলাদেশকে মুক্ত করতে হবে, স্বাধীন করতে হবে। সেই চিন্তা-চেতনা সবসময় তার মাঝে জাগ্রত ছিল। তিনি বলেন, আমাদের দেশের কিছু কিছু জায়গায় এখনও কূপম-ুকতা রয়েছে। কিন্তু সবকিছুর সঙ্গেই একটি আর্থিক সংশ্লিষ্টতা থাকে। নারীরা যখন অর্থ উপার্জন করতে পারে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে তখন সমাজে তাদের একটা জায়গা হয়, যে কথাটা জাতির পিতা সবসময় বলতেন।

জাতির পিতার বক্তব্য ‘মেয়েরা যদি কামাই করে ১০টা টাকা আঁচলে বেঁধে ঘরে আনে তাহলে ওই সমাজ বা সংসারে তার একটা জায়গা থাকে, কথা বলার সুযোগ থাকে’- উদ্ধৃত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আর নারীরা তা করতে না পারলে তার অবস্থান সমাজ কিংবা সংসার কোথাও থাকে না। আর এটাই হচ্ছে প্রকৃত বাস্তবতা। সেইদিকে লক্ষ্য রেখেই তার সরকার চাকরিসহ সবক্ষেত্রে যে সুযোগটা করেছে তার সুফল নারী সমাজ ভোগ করছে।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় দেশে নারীর ক্ষমতায়নের চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, এদেশের প্রধানমন্ত্রী, স্পীকার, বিরোধী দলের নেতা এবং সংসদ উপনেতা এই চারটি পদেই নারীরা আসীন, যার নজির বিশ্বে বিরল। আজ বাংলাদেশে রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, আইন প্রণয়ন, নীতি নির্ধারণ, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চপর্যায়, অর্থনীতি, সাংবাদিকতা, ক্রীড়া, তথ্য-প্রযুক্তি, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং খেলাধুলাসহ পেশাভিত্তিক সব স্তরে নারীদের গর্বিত পদচারণা রয়েছে। তিনি বলেন, এভারেস্ট বিজয় থেকে শুরু করে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের কর্মকা-ে নারীরা সাফল্যের সঙ্গে ভূমিকা রাখছেন। অর্জন করছেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সম্মাননা। আজ বিমানের পাইলটও রয়েছেন নারীরা।

প্রধানমন্ত্রী দেশে নারী জাগরণে বেগম রোকেয়ার অবদানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে বলেন, আজকে যতটুকু আমরা এগোতে পেরেছি তার পথ দেখিয়েছেন বেগম রোকেয়া। কারণ, তিনি নারী সমাজকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে এসেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী এ সময় জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১, নারী উন্নয়নে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ২০১৩-২০২৫, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ এবং এই সংক্রান্ত বিধিমালা-২০১৩ প্রণয়ন এবং নারীদের সুরক্ষা প্রদানে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, তার সরকার মাতৃত্বকালীন ছুটির মেয়াদ ৬ মাসে বর্ধিত করেছে, সন্তানের পরিচয়ের ক্ষেত্রে মায়ের নাম লেখা বাধ্যতামূলক করেছে এবং ইউনিয়ন, উপজেলা ও পৌরসভায় সংরক্ষিত নারী আসন এক-তৃতীয়াংশে উন্নীত করেছে। জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যের আসন সংখ্যা বৃদ্ধি করে ৫০ করা, মহিলা উদ্যোক্তাদের কম সুদে ঋণ প্রদান এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে আড়াই লাখ ল্যাকটেটিং মা ও ৭ লাখ গর্ভবতী দরিদ্র মায়ের ভাতার পরিমাণ ৫০০ টাকার পরিবর্তে ৮০০ টাকা করার কথাও উল্লেথ করেন প্রধানমন্ত্রী। সেইসঙ্গে ন্যাশনাল হেল্পলাইন সেন্টার ১০৯ চালু, ৩ দফা বাড়িয়ে পোশাক শ্রমিকদের বেতন ৮ হাজার টাকায় উন্নীত করা, কর্মজীবী মহিলাদের জন্য হোস্টেল নির্মাণ এবং ৪ হাজার ৮৮৩টি কিশোর-কিশোরী ক্লাব স্থাপনের মধ্য দিয়ে কিশোর-কিশোরীকে বিভিন্ন সৃজনশীল, গঠনমূলক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্যোগও তুলে ধরেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতার শেষ দিকে এই ৯ ডিসেম্বর দিনটি তার কন্যা এবং বিশ্ব অটিজম আন্দোলনের অগ্রসেনানী সায়মা হোসেনের জন্মদিন উল্লেখ করে তার জন্য সকলের কাছে দোয়া কামনা করেন।