২২ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রবাসী আয়

অর্থবছরের মাঝামাঝি দুটো অর্থনৈতিক সুসংবাদ পাওয়া গেছে বাংলাদেশের জন্য। একটি সুসংবাদ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক, অন্যটি দিয়েছে ইউএস ডিপার্টমেন্ট এ্যান্ড কমার্সের আওতাধীন অফিস অব দ্য টেক্সটাইল এ্যান্ড এ্যাপারেল। শনিবার বিশ্বব্যাংকের মাইগ্রেশন এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ব্রিফ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশও রেমিটেন্স আয়ে ডবল ডিজিট অর্জন করেছে। এর পরিমাণ প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার, টাকার অঙ্কে প্রায় ১৬০০ কোটি টাকা। বিশ্বব্যাংকের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধিসহ যুক্তরাষ্ট্র ও ধনী দেশগুলোর শক্ত অবস্থানের কারণেই রেমিটেন্সের প্রবাহ বেড়েছে। তবে প্রতিবেদনে এই বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে আর্থিক সংযম এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে অভিবাসনের গতি কমে যাওয়ায় প্রবাসী আয় কমে যেতে পারে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাক রফতানিতে বেশ ভালভাবেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। শুল্কমুক্ত সুবিধা না পেলেও চলতি বছরের প্রথম দশ মাসে সে দেশে তৈরি পোশাক রফতানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রফতানি করেছে ৪৬৪ কোটি মার্কিন ডলারের, দেশীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ ৩৯ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। উদ্যোক্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের এই রফতানি প্রবৃদ্ধি। অতিরিক্ত শুল্কের হাত থেকে বাঁচতে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ক্রেতা চীনের পরিবর্তে ঝুঁকে পড়েছে বাংলাদেশের দিকে। আগামীতেও এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। উল্লেখ্য, এ দুটো খাতই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

এও সত্য যে, প্রবাসী আয়ের এই অবস্থা আর বেশিদিন থাকবে না। কেননা উন্নত বিশ্বে দক্ষ ও প্রযুক্তিভিত্তিক জনশক্তির চাহিদা বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে উন্নত বিশ্বে শিল্প-কারখানাগুলোতে শ্রমিকের স্থান দখল করে নিচ্ছে রোবট ও কম্পিউটার। সেই পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশকে যথাযথ প্রস্তুতি নিতে হবে এখনই। দেশেই তৈরি করতে হবে দক্ষ মানবসম্পদ।

উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ তৈরিতে চাই দক্ষ মানবসম্পদ। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, বর্তমানে দেশে দক্ষ মানবসম্পদের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। গত কয়েক বছরে শিক্ষার হার জ্যামিতিক হারে বাড়লেও সেই অনুপাতে দক্ষ ও যোগ্য মানবসম্পদ তৈরি হয়নি। ১৬ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত একটি দেশে যেই পরিমাণ প্রকৌশলী, ডাক্তার, নার্স, প্রযুক্তিবিদ, আইটি বিশেষজ্ঞ, এমনকি বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক প্রয়োজন, সেই পরিমাণে বিশেষজ্ঞ নিদেনপক্ষে দক্ষ মানবসম্পদ নেই। গত কয়েক বছরে প্রায় এক কোটি বাংলাদেশী নাগরিক সারা বিশ্বে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছেন চাকরি-বাকরি অথবা শ্রম বিক্রির উদ্দেশ্যে। তাদের মধ্যে যে দক্ষ মানবসম্পদ আছে এমন কথা বলা যাবে না কিছুতেই। বরং অধিকাংশই অদক্ষ, বড় জোর আধাদক্ষ শ্রমিক। অনেকে এমনকি ‘অড জবে’ জড়িত। বিদেশে চাকরি জীবন শেষ হলে দেশে ফিরেও তারা তেমন কিছু করতে পারেন না। বিদেশের শ্রমবাজারও বর্তমানে যেমন সঙ্কুচিত হয়ে আসছে, তেমনি কমবে প্রবাসী আয়। সে অবস্থায় টেকসই উন্নয়নে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপর সবিশেষ জোর দেয়া ও গুরুত্বারোপ করা দরকার। বর্তমান সরকারও দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজিয়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানবসম্পদ তৈরির জন্য দেশব্যাপী ডিপ্লোমা শিক্ষা তথা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট তৈরিসহ একাধিক কারিগরি বোর্ড স্থাপনে সবিশেষ আগ্রহী। বৈশ্বিক শ্রমবাজার সঙ্কুুচিত হওয়ার পাশাপাশি আগামীতে প্রবাসী আয় কমে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে দেশেই দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির বিষয়টি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশই বিনিয়োগের জন্য সর্বাধিক উত্তম ও উপযোগী। দেশে বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতি বেশ ভাল, প্রায় ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সরকারী-বেসরকারী ব্যাংকগুলোতে প্রচুর অলস অর্থ পড়ে আছে। ব্যবসায়ী সংগঠনের পক্ষ থেকে সুদহার কমানোর কথাও বলা হচ্ছে। সে অবস্থায় সরকারকে একটি নমনীয় সুদহার নির্ধারণ করে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হবে। বিদ্যুতের সমস্যা অনেকটাই মিটেছে। পদ্মা সেতুর অগ্রগতিও আশাব্যঞ্জক। অতঃপর চাই অবকাঠামো উন্নয়ন। সেটি করা সম্ভব হলে এবং বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা গেলে বাংলাদেশী দক্ষ ও আধাদক্ষ শ্রমজীবীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আর বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন পড়বে না।