২১ জানুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চার মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রি ১৭ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ চলতি অর্থবছরের প্রথম থেকে ব্যাংক আমানতের সুদ কমে গেছে। আবার শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করেও খুব বেশি ভরসা পাচ্ছেন না বিনিয়োগকারীরা। এ বাজারের সূচক একদিন বাড়ে তো পরের দিন কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগই এখন মানুষ নিরাপদ মনে করছেন। ফলে ব্যাপকভাবে বাড়ছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি। চলতি অর্থবছরের (২০১৮-১৯) প্রথম চার মাসেই পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার ৬৮ শতাংশ বিক্রি হয়ে গেছে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাস জুলাই থেকে অক্টোবর সময়ে সঞ্চয়পত্রে বড় ধরনের বিনিয়োগ এসেছে। এ চার মাসে সঞ্চয়পত্রে মোট জমা হয়েছে ১৭ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা। যা পুরো বছরের মোট বিক্রির লক্ষ্যমাত্রার ৬৮ শতাংশ। সরকার চলতি অর্থবছরের ১২ মাসে সঞ্চয়পত্র থেকে ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরেছিল। গত অর্থবছরের প্রথম চার মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ ছিল ১৮ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৫১৪ কোটি টাকা বেশি বিক্রি হয়েছে। জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, বিদায়ী ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়ায় ৪৬ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা। যা ঘাটতি বাজেট অর্থায়নে সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা (সংশোধিত) থেকেও দুই হাজার ৫৩০ কোটি টাকা বেশি। বিদায়ী অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে জাতীয় সঞ্চয়স্কিমসহ সব ধরনের সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৪ হাজার কোটি টাকা।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত কয়েক বছর ধরেই সরকার ঘাটতি বাজেট অর্থায়নে সঞ্চয়পত্রের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। গত অর্থবছর সঞ্চয়পত্র থেকে মোট ৪৬ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা নেয় সরকার। এর আগের অর্থবছরে এ খাত থেকে সরকার ঋণ নেয় ৫২ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে গত অক্টোবর পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৫৫ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা।

এদিকে সঞ্চয়পত্রে জনসাধারণের বিনিয়োগ বেড়ে যাওয়ার ফলে মুদ্রা বাজারে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা দেখা দিয়েছে বলে মনে করে মুদ্রাবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। সংস্থাটির মতে, সুদহার বেশি হওয়ায় সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের বড় অংশই আসছে এ খাত থেকে। এতে বাজারে সুদহার কমানো যেমন সহজ হচ্ছে না, তেমনি সরকারের বেশি সুদবাহী দায় বাড়ছে। অন্যদিকে বন্ড মার্কেট উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত তারল্য জমছে, যা সামলাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিল বিক্রি করে বাজার থেকে টাকা তুলে নিচ্ছে। এতে পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় সঞ্চয়পত্রের সুদহার যৌক্তিকীকরণে সরকার উদ্যোগ নিতে পারে। সঞ্চয়পত্রে সুদের হার পুনর্নির্ধারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরামর্শ ও ব্যাংক পরিচালকসহ বিভিন্ন মহলের চাপ থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনের আগে বহুল আলোচিত সঞ্চয়পত্রের সুদহার না কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের তথ্য মতে, বর্তমানে পরিবার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ। পাঁচ বছর মেয়াদী বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ০৪ শতাংশ, পেনশনার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। ২০১৫ সালের ২৩ মে’র পর থেকে এ হার কার্যকর আছে। এর আগে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ছিল ১৩ শতাংশেরও বেশি।

সঞ্চয়পত্র থেকে চলতি অর্থবছরে ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। অক্টোবর পর্যন্ত চার মাসে বিক্রি হয়েছে ১৭ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের বাজেটে ৩০ হাজার ১৫০ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে অক্টোবর পর্যন্ত বিক্রি হয় ১৭ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা। এ হিসাবে এবারে বিক্রি বেশি হয়েছে ৫১৪ কোটি টাকা। গত অর্থবছর সঞ্চয়পত্র থেকে মোট ৪৬ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা নেয় সরকার। এর আগের অর্থবছরে এ খাত থেকে সরকার ঋণ নেয় ৫২ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে সঞ্চয়পত্রে গত অক্টোবর পর্যন্ত সরকারের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫৫ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। ব্যাংক ব্যবস্থায় যেখানে মোট ঋণ রয়েছে ৯৩ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা। সঞ্চয়পত্র থেকে বিপুল ঋণের ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খুব একটা ব্যাংক ঋণের প্রয়োজন দেখা যায় না। তবে নির্বাচনের আগে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে।

সঞ্চয়পত্রের পাশাপাশি ব্যাংক থেকেও সরকারকে ঋণ নিতে হচ্ছে। গত জুলাই থেকে ২৬ নবেম্বর পর্যন্ত সরকার নিট ৫ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে ব্যাংক থেকে। গত অর্থবছরের একই সময়ে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ কমে যায় ১২ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা। অবশ্য বর্তমানে সাড়ে ৩ থেকে ৮ শতাংশ সুদে ব্যাংক ঋণ পেলেও বাধ্যবাধকতার কারণে সঞ্চয়পত্র থেকেই বেশি ঋণ নিতে হচ্ছে। আর এ কারণে সরকারের বাজেটের বার্ষিক ব্যয়ের সবচেয়ে বড় খাত হয়ে উঠেছে এখন সুদ পরিশোধ। সঞ্চয়পত্রে সুদহার কমানোর জন্য ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে জোরালো দাবি রয়েছে। তবে ভোটের আগে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও বিভিন্ন সময়ে সুদহার কমানোর ইঙ্গিত দেন। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া হবে না বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

উল্লেখ্য, এখন সঞ্চয়পত্র ভাঙানো ও মুনাফা সংগ্রহ করা অনেক সহজ হয়ে গেছে। সঞ্চয়পত্রের টাকার জন্য বই জমা দিয়ে টোকেন নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না। মাস শেষে মুনাফার টাকা ও মেয়াদ শেষে আসল টাকা সরাসরি গ্রাহকের ব্যাংক এ্যাকাউন্টে জমা হয়। আর টাকা জমা হওয়ার সঙ্গে গ্রাহকের মোবাইল শর্ট মেসেজ সার্ভিস (এসএমএস) ও ই-মেইল করে জানিয়ে দেয়া হয়। সময়, অর্থের সাশ্রয় ও ভোগান্তি দূর করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ইএফটি (ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার) নামে গতবছর সফটওয়্যার চালু করে। এ সফটওয়্যারের মাধ্যমেই গ্রাহকরা এ সুবিধা পাচ্ছেন।

নির্বাচিত সংবাদ