১১ ডিসেম্বর ২০১৮

পরিবার এবং নারী

রবিবার বেগম রোকেয়া দিবস উদযাপন এবং রোকেয়া পদক-২০১৮ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিছু তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেন, যা নারী সমাজের জন্য ইতিবাচক ও দিকনির্দেশনামূলক বলে অভিহিত করা যায়। সমাজের মৌলিক সংগঠন হলো পরিবার। সেই পরিবার গঠন এবং তার ভিত মজবুত রাখা গুরুত্বর্পূর্ণ বিষয়। সংসারে স্বামী ও স্ত্রীর নিজ নিজ ভূমিকা রয়েছে, রয়েছে স্বতন্ত্র ও সম্মিলিত দায়িত্ব। সেখানে সংঘাত নয়, সমঝোতা, সম্প্রীতি ও সদ্ব্যবহারই যে মূল পরিচালনশক্তিÑ পরোক্ষভাবে সেদিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে প্রদত্ত বক্তব্যে। প্রধানমন্ত্রী নিজের বাবা-মায়ের প্রসঙ্গ এনেছেন উদাহরণ দিতে গিয়ে। বলেছেনÑ ‘আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য আমার বাবা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন সংগ্রাম করেছেন, তেমনি পাশে থেকে তাকে প্রেরণা যুগিয়েছেন আমার মা শেখ ফজিলাতুন্নেছা। মা তার জীবনে যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, বড় সন্তান হিসেবে আমি তা জানি। তাই, আজ তাঁর কথা বারবার মনে পড়ছে। স্বাধীনতা অর্জনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমার মায়ের অবদান রয়েছে। ’

বর্তমান সময়ে দেশে নারীর ক্ষমতায়নের এক অনন্য দৃষ্টান্ত বিরাজমান। এদেশের প্রধানমন্ত্রী, স্পীকার, বিরোধী দলের নেতা এবং সংসদ উপনেতা এই চারটি পদেই নারী আসীন, যার নজির বিশ্বে বিরল। এটাও আনন্দের বিষয় যে, আজ বাংলাদেশে রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, আইন প্রণয়ন, নীতি নির্ধারণ, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চপর্যায়, অর্থনীতি, সাংবাদিকতা, ক্রীড়া, তথ্য-প্রযুক্তি, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং খেলাধুলাসহ পেশাভিত্তিক সব স্তরে নারীর গর্বিত পদচারণা রয়েছে। এভারেস্ট বিজয় থেকে শুরু করে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের কর্মকা-ে নারী সাফল্যের সঙ্গে ভূমিকা রাখছেন।

প্রাসঙ্গিক কারণেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সন্ত্রাস, জঙ্গীবাদ ও মাদক নির্মূলে মায়েদের সচেতন হওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। সেজন্য সন্তানের ওপর মায়ের বিশেষ নজর রাখার কথা বলেছেন। ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে মায়ের ভাল সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। যাতে মায়ের কাছে সন্তানরা তাদের মনের কথা জানাতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারীর অধিকার অর্জনের প্রসঙ্গ। তিনি গূঢ়ার্থে বলেছেন, নারীদেরকে তাদের অধিকার আদায় করে নিতে হবে; তবে তা করতে গিয়ে যেন পরিবারে কোন অশান্তি না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। অর্থাৎ পরিবার সুসংহত রাখা এবং শান্তি বিনষ্ট না হওয়ার তাগিদই উঠে এসেছে তাঁর বক্তব্যে।

নারীর অগ্রযাত্রার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি, অন্যায্যভাবে নারীর ওপর আধিপত্য বিস্তার কিংবা কর্তৃত্বপরায়ণতা এবং নারীকে পণ্য করে তোলার মানসিকতা, সম্পত্তি হিসেবে পরিগণিত করা- এসবই নারীর প্রগতির পরিপন্থী। প্রগতিশীল পুরুষরাও এর বিরোধিতাই করবেন। কিন্তু নারীর অধিকার আদায়ে কাজ করতে গিয়ে ঢালাওভাবে সব পুরুষকে দোষারোপ এবং তাদেরকে প্রবল প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা সুস্থ মনোভাব নয়। অনেক সংসারে এখনও ঘরের নারীর মতামতের গুরুত্ব দেয়া হয় না। এটি প্রকৃত শিক্ষার অভাবে ঘটে। সংসারে শান্তি বজায় রাখাটাই মূল বিবেচ্য। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে গভীর বন্ধন এবং পারস্পরিক সহযাগিতার মনোভাব লালন করা, সেটি কিছুতেই বিনষ্ট হতে দেয়া সমীচীন নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজের অগ্রগতি সাধিত হচ্ছে। সংসারে নারীর মর্যাদা সর্বক্ষেত্রে সমমাত্রিক না হলেও ক্রমান্বয়ে যে বাড়ছে, এ সত্য অস্বীকার করার কিছু নেই। সংসারে সহাবস্থানের জন্য ভারসাম্য বজায় রাখাই বিচক্ষণতার লক্ষণ। বলপ্রয়োগে কিছু অর্জিত হয় না। পুরুষের সীমাবদ্ধতার দিকগুলো আলোচনার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট করে তোলা যায়। তার বোধোদয় ঘটানো যায়।

প্রধানমন্ত্রী নারীর অধিকার সচেতনতা ও অবস্থানের উন্নতিকল্পে যে ইঙ্গিতধর্মী ও তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন, তার অন্তর্নিহিত শোভনতা ও ভারসাম্যমূলক বাস্তবানুগ সুপরামর্শ অনুধাবনে সবাই সক্ষম হবেন এটাই প্রত্যাশা।