২২ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইয়েলো ভেস্ট

ইয়েলো ভেস্ট শব্দটি আন্দোলনের ইতিহাসে নতুন হলেও এর ব্যাপকতা যে ভয়াবহ হতে পারে তার নিদর্শন ফ্রান্স। তুমুল বিক্ষোভ-সহিংসতার মুখে বিপর্যস্ত প্রায় ফ্রান্স। এই ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে পার্শ্ববর্তী দেশ বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসে। পরিস্থিতির ঘটছে ক্রমাবনতি। ফ্রান্স এখন তার সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সামাজিক আন্দোলনের মুখোমুখি। চার সপ্তাহ ধরে এই আন্দোলন চলছে, যা দেশটির সামাজিক সমস্যা, অভিজাত বিরোধী মনোভাব ও ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের বিষয়গুলো উন্মোচন করেছে। আন্দোলনকারীরা এখন সামাজিক ন্যায়বিচার চাইছে। গত ১৭ নবেম্বর শুরু হওয়া এই আন্দোলন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর ভর করে পুরো ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সহিংসতা দমনে সফল হতে পারছে না। এই আন্দোলন সরকারবিরোধী রাজনৈতিক পরিম-লেও বেশ গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ বিক্ষোভ থেকে সহিংসতায় রূপান্তরিত হয়ে সারাদেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার প্রয়াস পাচ্ছে। আন্দোলনের চাপে সরকার জ্বালানির ওপর বাড়তি করের প্রস্তাব বাতিলের ঘোষণা দিলেও আন্দোলনকারীদের শান্ত করা যায়নি। শীত মৌসুমে গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির যে পরিকল্পনা ছিল, তা-ও স্থগিত করেছে সরকার। কিন্তু আন্দোলন এখন আর কেবল জ্বালানির বাড়তি কর কমানোর দাবিতেই আটকে নেই। ফ্রান্সের অনেক স্থানে বেতন বৃদ্ধি, কর কমানো, পেনশন বৃদ্ধি, বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ বাড়ানোর দাবিও উঠেছে। আন্দোলনকারীদের অনেকে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর পদত্যাগও দাবি করেছেন। তাঁকে কেউ কেউ ‘বিত্তবানদের প্রেসিডেন্ট’ হিসেবেও আখ্যায়িত করছেন। এক জনমত জরিপে আন্দোলনের প্রতি ৬৬ শতাংশ মানুষের সমর্থন রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অপরদিকে প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা কমেছে ২৩ শতাংশ।

গত ১৭ নবেম্বর শুরু হওয়া আন্দোলনে ট্যাক্সি চালকদের ব্যবহৃত হলুদ জ্যাকেট পরে প্রতিবাদকারীরা অংশ নেয়ায় এই আন্দোলনের নাম দেয়া হয় ‘ইয়োলো ভেস্ট’ বা ‘হলুদ জ্যাকেট’ আন্দোলন। আন্দোলনকারীদের সহিংসতায় এ পর্যন্ত বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছেন। এছাড়া দেশজুড়ে সহিংসতা, লুটতরাজ এবং বেশ কয়েকটি স্থাপনা ও ভাস্কর্য ভাঙ্গা হয়েছে।

এখন পর্যন্ত এই আন্দোলনের কোন ঘোষিত নেতা বা নেত্রী নেই। তৃণমূল এ্যাক্টিভিস্টরা কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আন্দোলনকে জড়াতে রাজি নয়। প্রচলিত রাজনৈতিক দল বা প্রতিষ্ঠানের ওপর ন্যূনতম আস্থা নেই আন্দোলনকারীদের। এমনকি মিডিয়ার প্রতি যে আস্থা নেই, তাও স্পষ্ট হয় ফেসবুক, টুইটার, অনলাইনে ভিডিও পোস্টের প্রাধান্য থেকে। সাম্প্রতিককালে ফরাসী অর্থনীতি প্রচুর সম্পদ সৃষ্টি করেছে। ফরাসী ধনীদের সম্পদ বিপুল পরিমাণে বেড়েছে। কিন্তু একই সময়ে এখানে বেকারত্ব, সামাজিক অনিরাপত্তা ও দারিদ্র্য ব্যাপক বেড়েছে। ফলে এক নতুন অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক, ভৌগোলিক এলাকা বিভাজিত হয়েছে। কর্মসংস্থান এবং সম্পদ বেশি হারে মেট্রোপলিটন শহরগুলোয় ঘনীভূত হয়েছে। ফ্রান্সের যেখানে শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে পড়েছে এমন সব অঞ্চল, ছোট ও মধ্যম আকারের শহর এবং গ্রামাঞ্চল ক্রমান্বয়ে গতিশীলতা হারিয়েছে। এসব অঞ্চলে এখন আর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় না। প্রান্তিক ফরাসীদের সঙ্গে মেট্রোপলিটন ফ্রান্সের বৈষম্য যত বেড়েছে ততই বেড়েছে অসন্তোষ, ক্ষোভ, সন্দেহ, অবিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক দূরত্ব। চলমান বিক্ষোভ প্রাথমিকভাবে যদিও অন্যান্য কর ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, তা সত্ত্বেও বিক্ষোভকারীরা এই অবস্থার আশু পরিবর্তন চায়। হলুদ জ্যাকেট আন্দোলন প্রশমিত হওয়ার পর তা সারাদেশে ছড়িয়ে প্রতিবেশী দেশেও সম্প্রসারিত হয়েছে। বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসের বিক্ষোভ থেকে দেশটির প্রধানমন্ত্রী চার্লস মাইকেলকে পদত্যাগের দাবি উঠেছে। পুলিশ তা দমনে সচেষ্ট। নেদারল্যান্ডস সরকারও জ্বালানির ওপর করারোপের প্রস্তাব করেছে। এতে ফুঁসে উঠছে জনগণ। ফ্রান্সের অর্থনৈতিক বৈষম্যকে কেন্দ্র করে যেভাবে ক্ষোভ-বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে, তা সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে তাদেরই।