২১ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ডিজিটাল বাংলাদেশ ॥ একটি প্রেরণাদায়ী অঙ্গীকারের স্বীকৃতি

  • জুয়েনা আজিজ

আজ ১২ ডিসেম্বর ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবস। গত বছরের মতো এবারও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের উদ্যোগে দিবসটি সারাদেশে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হচ্ছে। ২৭ নবেম্বর, ২০১৭ সালে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে ১২ ডিসেম্বর জাতীয়ভাবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি দিবস উদ্যাপনের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। ঐ একই বছর দেশে প্রথম বারের মতো জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি দিবস নামে দিনটি পালিত হলেও এবার পালিত হচ্ছে নতুন নামে। ২৬ নবেম্বর, ২০১৮ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদের সভায় দিবসটির নতুন নামকরণ করা হয় ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবস। তাই এখন থেকে ১২ ডিসেম্বর দিনটি প্রতি বছর এ নামেই পালিত হবে। আমার কাছে নামকরণটি যথার্থ মনে হয়েছে। কারণ, এটি ডিজিটাল বাংলাদেশের সঙ্গে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ।

অনেকেই প্রশ্ন করেন বাংলাদেশের অনেক দিবস আছে, কিন্তু ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবস পালনের কি যৌক্তিকতা থাকতে পারে? এ প্রশ্নের একটা সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দেয়া যেতে পারে। প্রত্যেকটি জাতীয় দিবসের মতো ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবসেরও আলাদা প্রেক্ষাপট ও তাৎপর্য রয়েছে। ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বরের আগে ডিজিটাল বাংলাদেশ নামক শব্দ দুটির সঙ্গে দেশের মানুষের তেমন কোন পরিচয় ছিল না। এ বিষয়টি মানুষ প্রথম জানতে পারে ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে যখন শেখ হাসিনা দিনবদলের সনদ রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন। এ রূপকল্পের মূল উপজীব্যই হচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশ। অর্থাৎ বাংলাদেশের মানুষের কাছে প্রেরণাদায়ী ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের ঘোষণাটি আসে ১২ ডিসেম্বর। এর মূল লক্ষ্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে ২০২১ সালের মধ্যে একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা ও ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলা। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের এ ঘোষণা আসলে একটি দূরদর্শী চিন্তার ফসল। উন্নয়নের গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই বিশ্বের যে দেশ তথ্যপ্রযুক্তিতে অগ্রগামী, তারাই উন্নয়নের ঝড় তুলেছে। সেদিক থেকে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ আমাদের উন্নত দেশে পরিণত হবার অসাধারণ এক উন্নয়ন দর্শন।

২০০৯ সাল থেকে শুরু হয় ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের অভিযাত্রা। ১২ ডিসেম্বর, ২০১৮ ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের প্রায় এক দশক পূর্ণ হতে মাত্র এক মাস বাকি। এক দশকের এ পথযাত্রায় ডিজিটাল বাংলাদেশ আজ আর কোন স্বপ্ন নয়, এটা এক দৃশ্যমান বাস্তবতা। বাংলাদেশের মানুষের কাছে নতুন অথচ; আধুনিক একটি কর্মসূচীকে দৃশ্যমান বাস্তবতায় পরিণত করার জন্য ডিজিটাল বাংলাদেশের চার স্তম্ভ যথাক্রমে আইসিটি অবকাঠামো ও কানেক্টিভিটি তৈরি, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, ই-গভর্মেন্ট এবং আইসিটি শিল্প প্রমোশনের লক্ষ্যে গৃহীত অধিকাংশ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়। ফলে এ সময়কালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অভূতপূর্ব সম্প্রসারণ ঘটে। সব উপজেলা এবং অধিকাংশ ইউনিয়ন ব্রডব্যান্ড কানেক্টিভিটির আওতায় চলে এসেছে। ৯২২৪ ডিজিটাল সেন্টার এবং ২৫০০০ ওয়েবসাইটের জাতীয় তথ্য বাতায়ন থেকে ই-সেবা প্রদান করা হচ্ছে। ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তাগণ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নাগরিকদের বিনামূল্যে এবং ফিভিত্তিক সেবা যেমন ভূমি তথ্য রেকর্ড, জন্ম নিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, জাতীয় সনদ, সেবার ফরম, টেলিমেডিসিন, জীবন বীমা, বিদেশে চাকরির আবেদন এবং বেসরকারী সেবা যেমন মোবাইল ব্যাংকিং, মোবাইল রিচার্জ, সিম ক্রয়, প্রিন্টিং, স্ক্যানিং ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণ প্রদানসহ ১৫০+সরকারী-বেসরকারী সেবা প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া, বিভিন্ন ধরনের তথ্য ও সেবার মোবাইল এ্যাপের মাধ্যমেও মানুষকে সেবা দেয়া হচ্ছে।

আইসিটি অবকাঠামো গড়ে তোলার অংশ হিসেবে সারাদেশে ২৮টি হাই-টেক পার্ক নির্মাণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে যশোর শেখ হাসিনা সফট্ওয়্যার টেকনোলজি পার্ক নির্মাণ করা হয়েছে। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বঙ্গবন্ধু হাই-টেক পার্ক, রাজশাহী বঙ্গবন্ধু হাই-টেক সিটি, সিলেট ইলেক্ট্রনিক সিটির নির্মাণ কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।

ডিজিটাল সমাজ গড়ে তোলার জন্য ই-শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। এ জন্য যষ্ঠ শ্রেণী থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত আইসিটি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শিক্ষায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসসহ ল্যাব, ইনকিউবেটর সেন্টার তৈরি করা হয়েছে। তাছাড়া দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মানসম্মত পাঠদানের জন্য ডিজিটাল পাঠ সহায়িকা চালু করা হয়েছে। যেখানে ঘরে বসে শিক্ষার্থীরা দেশের নামকরা শিক্ষকদের পাঠদান উপভোগ করতে পারবেন। কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ প্রায় সব কিছুতেই তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।

আইসিটি শিল্পের বিকাশে নানা উদ্যোগের বাস্তবায়ন করছে সরকার। লক্ষ্য আগামী ২০২১ সাল নাগাদ আইসিটি রফতানি ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করা। সে লক্ষ্যে আইসিটিতে বিনিয়োগে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ইন্ডাস্ট্রি প্রেমশনের জন্য বোস্টন কনসালটিং গ্রুপকে (বিসিজি) নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

তথ্য প্রযুক্তিতে দক্ষ মানব সম্পদ গড়ে তোলা আমাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে ২০২১ সাল নাগাদ আইটি পেশাজীবীর সংখ্যা ২০ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্যে দেশের শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। এলআইসিটি, হাই-টেক পার্ক এবং লার্নিং এ্যান্ড আর্নিং প্রকল্পসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে উন্নত প্রশিক্ষণে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা হচ্ছে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে আমাদের অর্জন কোন অংশে কম নয়। এ খাতে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নের স্বীকৃতিস্বরূপ আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ বাংলাদেশের জন্য বয়ে এনেছে অনন্য সম্মান। বিগত বছরগুলোতে তথ্যপ্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ওয়াচডগ হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পুরস্কার পেয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘ সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড, সাউথ সাউথ কো-অপারেশন ভিশনারী অ্যাওয়ার্ড, একাধিকবার ওয়ার্ল্ড সামিট অন ইনফরমেশন সোসাইটি (ডব্লিউএসআইএস) পুরস্কার, এ্যাসিসিও এ্যাওয়ার্ড, আইসিটি সাসটেনেবল ডেভেলপমেন্ট এ্যাওয়ার্ড অর্জন আমাদের জন্য শুধু গৌরবের নয়, ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের অভিযাত্রায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সাফল্য ও কাজের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

তাই ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রগতি ও সাফল্যের কথা উঠলেই মনে হবে ১২ ডিসেম্বরের কথা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রেরণা জাগানো ঘোষণার কথা। প্রতি বছর ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবস শুধু আমাদের এ অনন্য দিনটির কথা স্মরণ করিয়েই দেবে না; আগামী প্রজন্মের কাছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ ও ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলায় ক্ষেত্রে নিজেদের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করবে।

দিবসটি পালন উপলক্ষে গত বছর র‌্যালি, সোস্যাল মিডিয়া প্যারেড, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় এবং শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাবে ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রগতি বিষয়ক ভিডিও প্রদর্শন করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রচনা প্রতিযোগিতা, ঢাকা ও বিভাগীয় শহরে ‘কনসার্ট ফর আইসিটি’র আয়োজন, সকল ডিজিটাল সেন্টারে আইসিটি দিবসের ওপর ভিডিও প্রদর্শনসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। কেন্দ্র্রীয়ভাবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের উদ্যোগে জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি দিবসের ওপর আলোচনা ও র‌্যালিসহ ‘জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি পুরস্কার’, আইসিটিভিত্তিক এ্যাপ ও সফট্ওয়্যারের উদ্বোধন করা হয়। এবারও নানা আয়োজনে দিবসটি পালিত হচ্ছে। আমি মনে করি, দিবসটি পালনের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি হবে। একটি জ্ঞান ও মেধানির্ভর সমাজ গড়ায় শিক্ষার্থী, তরুণ-তরুণীদের অংশগ্রহণ আরও বৃদ্ধি পাবে।

লেখক : সচিব, তথ্য ও যোগাযোগ

প্রযুক্তি বিভাগ