২১ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আগামীর স্বপ্ন বুকে আগে বাড়ো...

  • অধ্যাপক মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)

সম্প্রতি দৈনিক জনকণ্ঠের প্রথম পাতায় বক্স করা খবরটা পরে কলম না ধরাটা অন্যায় মনে হচ্ছিল। যদিও বিষয়টি আলোচনায় বেশ কিছুদিন ধরেই, আর লেখালেখিও হয়েছে বেশ। লেখা হয়েছে পত্রিকায়, অনলাইনে, বক্তব্য আসছে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় আর টকশোতে। এবারের সংসদ নির্বাচনে সাতজন বিচার বা তদন্তাধীন যুদ্ধাপরাধী ধানের শীষ প্রতীক পেয়েছে। এদের মধ্যে হুলিয়া মাথায় নিয়ে বিদেশে পলাতক একজন যুদ্ধাপরাধীও রয়েছে। এখানেই শেষ নয়। ধানের শীষ পেয়েছে দন্ডপ্রাপ্ত, এমনকি মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় আর এমনকি সন্তানরাও। তালিকায় আরও আছে স্বাধীন দেশে যারা মানবতাবিরোধী অপরাধের দোষে দোষী এমনি অনেকেই। আছে বাংলা ভাইয়ের পৃষ্ঠপোষকরাও।

ঘটনাপ্রবাহের ধারাবাহিকতায় আলোচনায় এসেছে বিএনপির একজন বড় নেতার সাম্প্রতিক একটি বক্তব্য। সাংবাদিকদের সামনে, অনরেকর্ড তিনি বলেছেন এবারের নির্বাচনে কোন যুদ্ধাপরাধী ধানের শীষ প্রতীক পাবে না। বাড়তি যোগ করেছেন, জামায়াতে নাকি মুক্তিযোদ্ধাও আছে। সমালোচনার ঝড় উঠেছে তার এই বক্তব্যে। সঙ্গত কারণেই সমালোচনায় যোগ দিয়েছেন শহীদ পরিবার, সুশীল সমাজ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সবাই।

আমি অবশ্য এই নেতার বক্তব্যকে দেখি অন্য আঙ্গিকে। ধরুন, একাত্তরে আমরা জিতিনি। ত্রিশ লাখ শহীদের বলিদান আর তিন লাখ বীরাঙ্গনার সম্ভ্রমহানিও আমাদের হাতে স্বাধীনতার সূর্য্য তুলে দিতে পারেনি। বৃথা হয়ে গেছে মুক্তিযোদ্ধাদের সব আত্মত্যাগ। কেমন হতো তাহলে? আমাদের অগ্রজরা তাহলে হয়ে যেত রাজাকার। আর এই যে আজকে আমরা যাদের যুদ্ধাপরাধের জন্য বিচার করছি তারাই তো হতো পাকিস্তানের জাতীয় বীর, তাই নয় কি? আমি তাই ঐ নেতার কথায় মোটেও অবাক হইনি। ধানের শীষের ছায়াতলে এত এত প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ যুদ্ধাপরাধী আর যুদ্ধাপরাধীদের বেনিফিশিয়ারীদের সমাবেশ আমাকে আর নাড়া দেয় না। আমার কাছে বরং এটাই প্রত্যাশিত। আমি ওদের কাছে এর বেশি কিছু প্রত্যাশাও করি না। আমি বরং অবাক হতাম যদি দেখতাম ওদের অবস্থান এর বিপরীতে। একজন চিকিৎসক হিসেবে ওদের মানসিক সুস্থতা নিয়ে তখন আমি চিন্তিত হতাম, কিন্তু এখন হই না।

ওরাতো স্বাধীন বাংলাদেশে পরাধীন। ওদের দমে দমে আর ওদের ধমনীতে প্রবহমান প্রতিটি রক্ত কণিকায় শুধুই ‘পেয়ারে পাকিস্তান’। ওদের কাছে আমরা ভারতের দালাল আর ওরা ইসলামের ধারক ও বাহক। ওদের কাছে মুক্তিযোদ্ধা কারা? সহজ উত্তর ‘ওরা’- কারণ ওরা একটা অখন্ড পাকিস্তানের স্বপ্ন পূরণের তাগিদেই সেদিন লাখো মা-বোনের সম্ভ্রম লুুটে নিয়েছিল আর মশার মতো মেরেছিল মানুষ। ওদের কাছে ওরা কিসের যুদ্ধাপরাধী, ওরাতো জাতীয় বীর! ওদের একটাকে ফাঁসিতে ঝুলালেই তাই পাকিস্তানের পার্লামেন্টে উঠে কান্নার রোল।

আমার কাছে এদের পরিচয় এরা পাকিস্তানী-বাংলাদেশী- এরা ‘বাংলাস্তানী’। এরা মনে প্রাণে পাকিস্তানী। বাংলাদেশের যে কোন অপ্রাপ্তিতেই এদের স্বর্গসুখ। এদের লক্ষ্য বাংলাদেশকে পিছন থেকে টেনে ধরা আর এই অসৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এরা যে কোন কিছু করতে পিছপা হবে না, হয় নাই-ও। এদের স্বরূপ আমরা স্বাধীন দেশে দেখেছি ২০০১, ২০১৩ আর ২০১৪ সালে। সামনে সুযোগ পেলে এরা আরও বড় অঘটন ঘটাবে। মানুষ যে কত অমানুষ হতে পারে আমরা তা একাত্তরেও দেখিনি। দেখব ২০১৯-এর জানুয়ারিতে যদি ৩০ ডিসেম্বর এতটুকুও ভুল করি।

ভাবছেন আপনাদের বিভ্রান্ত করতে চাচ্ছি, নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছি। বিশ্বাস করুন মোটেও না। যা বলছি তা বলছি দায়িত্ব নিয়েই, নিজের বিদ্যা-বুদ্ধি আর বিবেচনার সবটুকু প্রয়োগ করেই। বিশ্বাস না হলে প্রশ্ন করুন সিরাজগঞ্জের পূর্ণিমার মাকে, যিনি ধর্ষণকারীদের অনুরোধ করেছিলেন তার ছোট মেয়ের কাছে একে একে যাবার জন্য অথবা ঘুরে আসুন সাতক্ষীরার সরকার বাড়ি যেখানে গণধর্ষণ আর লুটপাটের পর বুলডোজার দিয়ে বাড়ি-ঘর গুঁড়িয়ে দিয়ে বানানো হয়েছিল খেলার মাঠ। যেতে পারেন ভোলার লালমোহনেও যেখানে নবনির্বাচিত এমপির উপস্থিতিতে সম্ভ্রম রক্ষায় পুকুরে ঝাঁপ দেয়া মহিলাদের বাধ্য করা হয়েছিল ধর্ষকদের হাতে ধরা দিতে কারণ না হলে তাদের ছোট-ছোট ছেলেমেয়েদের পুকুর পাড়েই সারি বেঁধে খুন করা হতো। এসব ঘটেছে এই বাংলাদেশে ২০০১-এর নির্বাচনের পর। অতএব আসুন শপথ নেই, ‘আর যাই কিছু করিনা কেন ভুল করব না ত্রিশে’। আর আসুন গলায় গলা মিলিয়ে কোরাসে গেয়ে উঠি, ‘... আগামীর স্বপ্ন বুকে আগে বাড়ো’।

লেখক : চিকিৎসক ও গবেষক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়