২১ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রোমাঞ্চকর ম্যাচ জিতে সেমিফাইনালে ব্রাদার্স

রুমেল খান ॥ খেলা শেষ। সৈয়দ নাইমউদ্দিন তার শিষ্যদের নিয়ে গেলেন মাঠের ঠিক মাঝখানে। তাদের বললেন সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে। খেলোয়াড়রা সবাই সিজদায় লুটিয়ে পড়ে সেটা করলেন। তখন তাদের শান্ত ভঙ্গি দেখে বোঝার উপায়ই ছিল না মাত্র কয়েক মুহূর্ত আগেই কি দারুণ ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছেন তারা, হারিয়ে দিয়েছেন চ্যাম্পিয়ন দলকে। এখন তারা স্বপ্ন দেখছেন একযুগ পর স্বাধীনতা কাপ ফুটবল আসরের ফাইনালে উঠে প্রথমবারের মতো অধরা শিরোপাটা জিততে। অথচ চলমান আসরে এই দলই কি না গ্রুপপর্বে কোন ম্যাচই না জিতে কোয়ার্টারে ওঠে, বিশ্বাস করা যায়!

স্বাধীনতা কাপ ফুটবলে মঙ্গলবার হয়ে গেল প্রথম কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটি। অনেকেই বলেছেন এই আসরের সেরা ম্যাচ ছিল এটি। এ রকম প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক, গতিশীল, শ্বাসরুদ্ধকর এবং উপভোগ্য ম্যাচ অনেকদিন পর দেখা গেল। যাতে টাইব্রেকারে (সাডেন ডেথে) ৪-৩ গোলে জয়ী হয়েছে গোপীবাগের দল ব্রাদার্স ইউনিয়ন লিমিটেড। নির্ধারিত ৯০ মিনিট এবং অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে উভয় দলই ৩-৩ গোলে ড্র করে। পেনাল্টি শূটআউটে ব্রাদার্সের হয়ে গোল করেন মান্নাফ রাব্বি, আশরাফুল করিম, মোয়ায়েদ খালিদ এবং খান মোঃ তারা। মিস করেন ভিয়েইরা লিমা ও এভারটন সান্তোস। আরামবাগের হয়ে গোল করেন রাজন মিয়া, আবু সুফিয়ান জাহিদ এবং এনকুরুমেহ কিংসলে। মিস করেন মোহাম্মদ রকি, রবিউল হাসান এবং চিনেদু ম্যাথিউ। ‘দ্য অরেঞ্জ ব্রিগেড’ খ্যাত ব্রাদার্স প্রথম সেমিফাইনালে মাঠে নামবে আগামী ১৯ ডিসেম্বর।

ব্রাদার্সের কৃতিত্ব হচ্ছে তারা দশজন নিয়ে খেলেও ম্যাচটি টাইব্রেকার পর্যন্ত নিয়ে যেতে পেরেছে। তবে শেষ পর্যন্ত হেরে গেলে নিশ্চিতভাবেই এরজন্য খলনায়ক বনে যেতে পারতেন ব্রাদার্সের পানামার ফরোয়ার্ড জ্যাক দানিয়েল। ৭৮ মিনিটে তৃতীয় গোল করে চমক দেখিয়ে লিড নেয় ২০০৫ আসরের রানার্সআপধারী ব্রাদার্স। ডানপ্রান্ত থেকে বক্সের বেশ দূর থেকে বাঁ পায়ের শটে গোল করেন দানিয়েল (৩-২)। গোল করেই জার্সি খুলে ফেলে উল্লাসে মেতে ওঠেন। কিন্তু এর মধ্যেই সতীর্থ এভারটন ছুটে এসে দানিয়েলকে ঘুষি মারতে থাকেন। সবাই হতভম্ব। রহস্য উন্মোচন হয় একটু পরেই, যখন রেফারি জালালউদ্দিন জার্সি খোলার অপরাধে হলুদ কার্ড এবং লালকার্ড দেখান দানিয়েলকে। লালকার্ড কেন? এর আগেই যে একটি হলুদ কার্ড ছিল তার। তাই দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় দানিয়েলকে। দশ জনের দলে পরিণত হয় ব্রাদার্স। আনন্দের মূহূর্তটাই বিষাদে পরিণত হয় তাদের। আসলে দানিয়েলের মনেই ছিল না প্রথম হলুদ কার্ডটির কথা। অতি আবেগে করে ফেলেন মহাভুল। এর চরম খেসারত দিতে পারতো ব্রাদার্স, হেরে গিয়ে। তখন কি নিজেকে ক্ষমা করতে পারতেন দানিয়েল? এই ম্যাচে কখনও আরামবাগ, কখনও ব্রাদার্স এগিয়ে গেছে গোল করে। খেলা দেখে সবারই একটিই মূল্যায়ন, ‘এটাই যেন ফাইনাল ম্যাচ। হোয়াট এ ম্যাচ।’ ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে ব্রাদার্স। ৫ মিনিটে বাঁপ্রান্ত থেকে ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড লিমা লিওনার্দোর পাসে বক্সে বল পেয়েও শট নিতে ব্যর্থ হন দানিয়েল। ৭ মিনিটে বাঁপ্রান্ত দিয়ে লিওনার্দোর শট বারের মাঝ বরাবর লেগে ওপর দিয়ে চলে না গেলে এগিয়ে যেতে পারতো গোপীবাগের দলটিই। কিন্তু ১৪ মিনিটে ম্যাচের ধারার বিপরীতে প্রথম গোল করে মারুফুল হকের আরামবাগ। একক প্রচেষ্টায় বাঁপ্রান্ত দিয়ে বল নিয়ে ব্রাদার্সের বক্সে ঢুকে পড়েন ক্যামেরুনের ফরোয়ার্ড পল এমিল। প্রতিপক্ষের তিন ফুটবলারকে কাটিয়ে দারুণভাবে বলটা বাড়িয়ে দেন সতীর্থর উদ্দেশে। ডান পায়ে ফাইনাল টাচ দিয়ে আরামবাগকে এগিয়ে দেন দলীয় অধিনায়ক-মিডফিল্ডার রবিউল হাসান (১-০)। ৪৪ মিনিটে অবশেষে সফল হয়েছেন লিমা লিওনার্দো। বাঁপ্রান্ত থেকে লেফট উইঙ্গার শফিকুল শাফির বাঁপায়ের উঁচু ক্রসে বক্সে লাফিয়ে উঠে হেড করেন লিমা। গোলরক্ষক হাত বাড়িয়েও বলের নাগাল পাননি। বল চলে যায় আরামবাগের জালে (১-১)। প্রথমার্ধ শেষ হয় সমতাতেই।

৫৪ মিনিটে ব্যবধান বাড়িয়েছে আরামবাগ। রবিউল ইসলাম মাঝ মাঠ থেকে বল দেন পল এমিলকে। কিন্তু তাকে বাধা দেন ব্রাদার্স ডিফেন্ডার। ব্যাকহিলে চমৎকার পাস দেন এমিল। বল পেয়ে বাঁপায়ের শটে ব্রাদার্সের জাল কাঁপান রবিউল (২-১)। ৬৫ মিনিটে গোল করে ব্রাদার্স আবারও সমতা আনে। লিমা লিওনার্দোর পাসে বল পেয়ে বক্সের বাঁপ্রান্ত থেকে শফিকুল ইসলাম শাফির ক্রসে চলন্ত বলে ডান পায়ের শটে গোল করেন মান্নাফ রাব্বি (২-২)।

এরপর তো ৭৮ মিনিটে দানিয়েলের সেই গোল ও লালকার্ডের কথা আগেই বলা হয়েছে। সেই সুযোগটা কাজে লাগাতে বিলম্ব করেনি বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। ৮৫ মিনিটে রবিউল হাসানের কর্নারে জটলাতে বল পেয়ে লাফিয়ে উঠে হেড করে আরামবাগকে আবার সমতায় ফেরান গত ম্যাচে হ্যাটট্রিক করা ফুটবলার পল এমিল (৩-৩)। এটা তার ব্যক্তিগত চতুর্থ গোল যা চলমান আসরে সর্বোচ্চ। টপকে যান চট্টগ্রাম আবাহনীর গাম্বিয়ান ফরোয়ার্ড মমোদৌ বাওকে (৩ গোল)।

নির্ধারিত ৯০ মিনিটে ফল অমীমাংসিত থাকায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে। ১২৭ মিনিটে দশ জনের দলে পরিণত হয় আরামবাগও। এবার লালকার্ড দেখেন নিপু। ১২৯ মিনিটে আরও একটা দারুণ সুযোগ হাতছাড়া হয় ব্রাদার্সের। এগিয়ে এসেছিলেন গোলরক্ষক। ফাঁকা পোস্ট পেয়ে বলটা জালে পাঠাতে পারেননি মান্নাফ রাব্বি। এরপরই সেই টাইব্রেকার নামের ভাগ্য পরীক্ষা। টাইব্রেকারের প্রথম পাঁচ শটেও ৩-৩ গোলে সমতা থাকে। এরপর পালা টাইব্রেকার পার্ট টু’ ‘সাডেন ডেথ’। ‘হঠাৎ মৃত্যু’র এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত বিজয়ীর হাসি হাসে ব্রাদার্স। আরামবাগের কিংসলের শট ঝাঁপিয়ে পড়ে ফিরিয়ে দিয়ে কমলা-শিবিরকে স্মরণীয় জয় এনে দেন গোলরক্ষক সুজন চৌধুরী।