২২ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইসলামের নিরিখে বিজয় বৈভব

  • অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম

কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে : নাস্্রুম্ মিনাল্লাহি ওয়া ফাত্হুন্ কারীব- আল্লাহ্র সাহায্য ও বিজয় আসন্ন। (সূরা সাফ্ফ : আয়াত ১৩)।

এই আয়াতে কারীমা থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, যখন আল্লাহ্ থেকে সাহায্য আসে তখন বিজয় অর্জিত হয়। সূরা নাসরে ইরশাদ হয়েছে : ইজা জাআ নাস্্রুল্লাহি ওয়া ফাত্্হু- যখন আসবে আল্লাহ্্র সাহায্য ও বিজয়।

প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে আল্লাহ্্ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন : ওয়ালাল্্ আখিরাতু খায়রুল লাকা মিনাল উলা- আপনার জন্য পরবর্তী সময় তো পূর্ববর্তী সময় অপেক্ষা শ্রেয়। (সূরা দুহা : আয়াত ৪)।

ইসলামের ইতিহাসের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়- আল্লাহর রহমত ও মদদে সকল বিজয় সাধিত হয়েছে। সত্য ও সুন্দরের বিজয় এসেছে, পরাজিত ও পরাভূত হয়েছে অপশক্তি। সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে জান কোরবান করতে হয়েছে। সেই কোরবানি গৌরবের মহিমায় সমুজ্জ্বল হয়েছে। শহীদানের মর্যাদা সমুন্নত হয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতে। কারবালার যুদ্ধে ইমাম হুসাইন রাদিআল্লাহ তা’আলা আন্্হুর শাহাদতের মধ্য দিয়ে ইসলামের বিজয় বারতা ঘোষিত হয়েছে।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের নয় মাস যুদ্ধ চলাকালে প্রবাস থেকে বাংলাদেশ সরকার যে সমস্ত প্রচারপত্র প্রচার করত তার কোন কোনটার শীর্ষে লেখা থাকত- আল্লাহু আকবর। ১৯৭১-এর ১৪ এপ্রিল প্রকাশিত স্বাধীন বাংলার সংগ্রামী জনগণের প্রতি বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশাবলী শীর্ষক বাংলাদেশ সরকারের এক প্রচারপত্রে বলা হয় : পাকিস্তানী শোষকগোষ্ঠী ও তাদের ভাড়াটিয়া হানাদার বাহিনী আজ বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি লোকের ওপর নগ্ন, পৈশাচিক বর্বরতা চালিয়ে যাচ্ছে। ...মানবতার বিরুদ্ধে হানাদার বাহিনী দানবীয় শক্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তাদের সহায় আধুনিক মারণাস্ত্র আর আমাদের সহায় পরম করুণাময় সর্বশক্তিমান আল্লাহ তা’আলার সাহায্য, বাংলাদেশের অটুট মনোবল, মুক্তিলাভের দৃঢ় সঙ্কল্প, শত্রু সংহারের অবিচল প্রতিজ্ঞা। এ সংগ্রাম আমাদের বাঁচার সংগ্রাম। সর্বশক্তিমান আল্লাহ তা’আলার ওপর বিশ্বাস রেখে ন্যায়ের সংগ্রামে অবিচল থাকুন। স্মরণ করুন, আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন : ‘অতীতের চেয়ে ভবিষ্যত নিশ্চয় সুখকর।’ বিশ্বাস রাখুন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় নিকটবর্তী (দ্রঃ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র : তৃতীয় খন্ড, প্রথম প্রকাশ ১৯৮২, পৃষ্ঠা ১৯, ২০, ২২)।

বাংলাদেশের মানুষ আল্লাহর রহমতে যে বিজয় অর্জন করে তা দিবালোকের মতো সত্য। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের আনন্দ বৈভব স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ভিত্তি সুদৃঢ় করে তোলে। বিশ্ব মানচিত্রে দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্রের মানচিত্র উদ্ভাসিত হয়।

ইসলামের ইতিহাসে নানামাত্রিক গৌরবময় অধ্যায় রয়েছে। এই ইতিহাসের যুদ্ধ সংক্রান্ত অধ্যায়সমূহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়- সে সব সর্বতোভাবে প্রতিরক্ষামূলক এবং অপশক্তির আগ্রাসন থেকে মুক্ত থাকার জন্য। ইসলামের সর্বপ্রথম সশস্ত্র লড়াইয়ের সূচনা হয় ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে অর্থাৎ দ্বিতীয় হিজরীর রমাদান মাসে। ৬১০ খ্রিস্টাব্দের রমাদান মাসের শেষ দশকের কোন এক বেজোড় রাতে অধিকাংশের মতে ২৭ রমাদান রাতে প্রথম ওহী লাভের প্রায় বারো বছর পর অর্থাৎ ৬২২ খ্রিস্টাব্দে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের মক্কা মুকাররমা থেকে মদিনা মনওয়ারায় হিজরত করে যাবারও প্রায় দেড় বছর পর যখন মক্কার কাফির মুশরিকরা মদিনার ইয়াহুদী ও মুনাফেকদের সঙ্গে জোট বেঁধে পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র সিরিয়া থেকে কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান সংগ্রহ করে এবং মদিনায় প্রতিষ্ঠিত আদর্শ কল্যাণ রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে শাশ্বত শান্তির জীবন ব্যবস্থা ইসলামকে উৎখাত করার তৎপরতায় মেতে ওঠে তখন আল্লাহ জাল্লা শানুহু কিতাল অর্থাৎ সশস্ত্র যুদ্ধের বিধান নাযিল করলেন। আল্লাহু জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন : উযিনা লিল্্লাযিনা ইউকাতালুনা বিআন্নাহুম্্ জুলিমু ওয়া ইন্নাল্লাহা ‘আলা নাস্ইরহিম্্ লা কাদীর- যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হলো তাদের জন্য যারা আক্রান্ত হয়েছে। কেননা তাদের ওপর অত্যাচার (জুলুম) করা হয়েছে, আর আল্লাহ তাদের সাহায্য করতে সর্বতোভাবে সক্ষম (সূরা হজ্জ : আয়াত ৩৯)।

আরও ইরশাদ হয়েছে : ওয়া কাতিলু ফী সাবিলিল্লাহিল্লাযীনা ইউকাতিলুনাকুম্ ওয়ালা তা’তাদু ইন্নাল্লাহ লা ইউহিব্বুল্্ মু’তাদীন- যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তোমরাও তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর; কিন্তু সীমা লঙ্ঘন কর না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমা লঙ্ঘনকারীদের ভালবাসেন না (সূরা বাকারা : আয়াত ১৯০)। সশস্ত্র যুদ্ধের নির্দেশ পেয়ে প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম মদিনা মনওয়ারা আক্রমণের পথে প্রতিরোধ সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নিলেন। ওই বছরেই আল্লাহর দেয়া সিয়াম বিধানানুযায়ী মুসলিমগণ সর্বপ্রথম রমাদানের সিয়াম পালন করছিলেন। এই অবস্থায় কিতাল বা সশস্ত্র যুদ্ধের আহ্বান এলো। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম মাত্র ৩১৩ জন সাহাবির সমন্বয়ে গঠিত মুজাহিদ বাহিনী নিয়ে মদিনা মনওয়ারা থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে ৮০ মাইল দূরে অবস্থিত বদর প্রান্তরে কাফির-মুশরিকদের সহস্রাধিক সৈন্যের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে বিজয় পতাকা উড্ডীন করলেন। এই যুদ্ধে শত্রুদের ৭০ জন নিহত হলো এবং ৭০ জন বন্দী হলো। মুজাহিদ বাহিনীর মধ্য থেকে ১৪ জন শহীদ হলেন। গাযওয়ায়ে বদর বা বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয় দ্বিতীয় হিজরীর ১৭ রমাদান।

এই যুদ্ধে বিজয়ের পর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম সেখানে কয়েকদিন অবস্থান করেন। তারপর বিজয়ী বেশে মদিনা মনওয়ারায় ফিরে আসেন। মদিনা মনওয়ারায় ফিরে আসার কয়েকদিন পর রমাদান মাসের শেষ দিন আসে। ঘোষিত হয় ‘ঈদ-উল-ফিতর বা সিয়াম ভাঙ্গার আনন্দ-উৎসব পালনের ঘোষণা। দিনের শেষে শাওয়ালের চাঁদ উদিত হলে বিজয়ের এক আনন্দ অনুভব জাগ্রত হয় সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে। সেই পহেলা শাওয়ালের দিনে পালিত হয় সর্বপ্রথম ‘ঈদ-উল-ফিতর।’

চলবে...

লেখক : পীর সাহেব, দ্বারিয়াপুর শরীফ