১৩ ডিসেম্বর ২০১৮

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের বিজয় উৎসব শুরু

 সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের বিজয় উৎসব শুরু

স্টাফ রিপোর্টার ॥ পেরিয়েছে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের চার দশক। তবে আজও অর্জিত হয়নি বঙ্গবন্ধুর কাক্সিক্ষত মানব মুক্তির স্বপ্নমাখা সেই সোনার বাংলা। তাই তো আবার অবতীর্ণ হতে হয় নতুন লড়াইয়ে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ জেগে ওঠে সংস্কৃতিকর্মীরা। অস্তিত্বসংলগ্ন পুরনো কথাটাই সুরের আশ্রয়ে উচ্চারিত হয়- ভয় নেই কোন ভয়/জয় বাংলার জয় ...। এমন অনেক গান, কবিতা, নৃত্যপরিবেশনা আর বিশিষ্টজনের বক্তৃতায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ বিনির্মাণের আকাক্সক্ষায় শুরু হলো সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের বিজয় উৎসব। ‘স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের দিন শেষ/মুুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এগিয়ে যাবেই বাংলাদেশ’ স্লোগানে উৎসবটি চলবে শহরের সাতটি মঞ্চে।

বৃহস্পতিবার বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ছিল সপ্তাহব্যাপী উৎসবের উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা। শহীদ মিনারে শুরু হওয়া উৎসবটি আগামী ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে রাজধানীর সাতটি মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে। এবারের উৎসবে দেড় শতাধিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রায় আড়াই হাজার শিল্পী সঙ্গীত, নৃত্য, আবৃত্তি, পথনাটক ও শিশুতোষ পরিবেশনায় অংশ নিচ্ছেন। স্বাধীনতা আন্দোলনসহ সকল শহীদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনে শহীদ বেদিতে পুস্পাঞ্জলি অর্পণের মাধ্যমে শুরু হয় অনুষ্ঠান। এরপর পালন করা হয় এক মিনিটের নীরবতা। মৌনতা শেষে ভেসে বেড়ায় ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে ছায়ানটের শিল্পীরা। জাতীয় পতাকার প্রতীকী রঙ লাল ও সবুজ রঙের বেলুন উড়িয়ে উৎসব উদ্বোধন করেন ভাষা সংগ্রামী সাংবাদিক কামাল লোহানী, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক সৈয়দ হাসান ইমাম ও আশরাফুল আলম, নাট্যজন ড. ইনামুল হক এবং আবৃত্তিশিল্পী ভাস্বর বন্দোপাধ্যায়।

উদ্বোধন শেষে উৎসবের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মোঃ আহ্্কাম উল্লাহ্। ঘোষণাপত্রে বলা হয়, আজ বাংলাদেশ নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এক সুপরিচিত মহল ঐক্যের নামে যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসিত করে বাংলাদেশকে একটি প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করার ঘৃণ্য আয়োজন প্রায় সমাপ্ত করে ফেলেছে। আমরা বাংলাদেশের সংস্কৃতি কর্মীরা মুক্তিযোদ্ধা ও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যের নামে যুদ্ধাপরাধী ও বিপথগামীদের এই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র বানচাল করতে বদ্ধপরিকর। আজ বিজয় উৎসবের এই ক্ষণে আমরা দেশের সর্বস্তরের জনগণকে আহ্বান জানাই, অতি সন্নিকটে দেশের ভাগ্য নির্ধারণে আপনারা নিশ্চিতভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পুনরায় অর্পণ করুন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দুর্নীতিমুক্ত আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার শপথ নিন।

পরিবেশনার সঙ্গে ফাঁকে বিশিষ্টজনে কথনে এগিয়ে যায় আয়োজন। উদ্বোধনী আলোচনায় বক্তব্য রাখেন কামাল লোহানী, ড. ইনামুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. মুহাম্মদ সামাদ, নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার, গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদের সভাপতি ফকির আলমগীর, কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী ও অভিনয়শিল্পী ঝুনা চৌধুরী। জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছের সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ।

কামাল লোহানী বলেন, একাত্তরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে কাজ করার সময় এই ১৩ ডিসেম্বর আমাদের মাঝে একটা শিহরণ বয়ে গিয়েছিল। লড়াইয়ে ক্লান্ত পাকবাহিনীকে লক্ষ্য সেদিন পূর্ব বাংলাজুড়ে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল একটি লিফলেট। সেই লিফলেটে উর্দুতে লেখা ছিল ‘হাতিয়ার ডাল দো’। আজও সেই ১৩ ডিসেম্বর একইরকম শিহরণ অনুভব করছি। অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ রক্ষায় নামতে হবে নতুন লড়াইয়ে। উৎসবের ঘোষণাপত্র থেকে স্পষ্ট হয়েছে, আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কি। এবারের বিজয় দিবসের উৎসব শুধু উৎসব নয়, এটাকে সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবে এগিয়ে নিতে হবে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত। আসন্ন নির্বাচনে অপশক্তিকে পরাজিত করে অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ বাস্তবায়ন করতে হবে। এমন সরকারকে ক্ষমতায় আনতে হবে যারা, সাম্প্রদায়িকতা দূর করে বাহাত্তরের সংবিধান পুনর্বহাল করবে।

সৈয়দ হাসান ইমাম বলেন, আমরা স্বাধীনতা পেলেও বঙ্গবন্ধু কাক্সিক্ষত মুক্তির কথা বলেছিল সেটা আজও পাইনি। সেই চেতনার বিপক্ষ গোষ্ঠী আজ জোট বেধেছে। তারা হাত মিলিয়েছে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি জামায়াতের সঙ্গে। এই অপশক্তিকে রুখে দিতে জাগ্রত হতে হবে নতুন প্রজন্মকে। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে প্রতিহত করতে হবে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিকে।

সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় ‘নোঙ্গর তোলো তোলো’ গানের সুরে নাচ করে স্পন্দনের শিল্পীরা। গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদের শিল্পীরা গেয়ে শোনান ‘ভয় নাই কোন ভয়, জয় বাংলার জয়’ ও ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রীস্টান, বাংলার মুসলমান/ আমরা সবাই বাঙালী’ শিরোনামের দুটি গান। মুহাম্মদ সামাদ পাঠ করেছেন সদ্য রচিত কবিতা ‘আমি তোমাদের কবি’। কবি তারিক সুজাতও করেছেন স্বরচিতা কবিতা। এছাড়া কবিতার শিল্পিত উচ্চারণে আবৃত্তি করেন সৈয়দ হাসান ইমাম, আশরাফুল আলম ও ভাস্বর বন্দোপাধ্যায়। সব শেষে পরিবেশিত হয় পথনাটক। দেশনাটক মঞ্চস্থ করে ‘রিসার্চ’। তপন দাসের রচনায় নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন শামসুল আলম বকুল।

শহীদ মিনার মঞ্চে বিজয় উৎসব অনুষ্ঠান চলবে ১৬ ডিসেম্বর, অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম ও প্রয়াত সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার উত্তরা মঞ্চে ১৫ থেকে ১৭ ডিসেম্বর, ভাষাসৈনিক হালিমা খাতুন ও মুক্তিযোদ্ধা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিনী রবীন্দ্র সরোবর মঞ্চে ১৪ থেকে ১৬ ডিসেম্বর, রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ মঞ্চে ১৪ থেকে ১৬ ডিসেম্বর, কবি বেলাল চৌধুরী ও আবৃত্তিশিল্পী রণজিৎ রক্ষিত মিরপুর মঞ্চে ১৪ থেকে ১৬ ডিসেম্বর, মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবি ও মেজর কামরুল হাসান ভূঁইয়া দনিয়া মঞ্চে ১৫ ও ১৬ ডিসেম্বর এবং বাহাদুরশাহ পার্ক মঞ্চে ১৭ ও ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত। প্রতিটি মঞ্চের অনুষ্ঠান শুরু হবে বিকেল চারটায়। এছাড়া ১৬ ডিসেম্বর সকাল ১০টায় শহীদ মিনার থেকে বের হবে বর্ণিল বিজয় শোভাযাত্রা।